পিছন থেকে কে যেন খিলখিল করে হাসলো, মিঠিয়ে মিঠিয়ে বললো, পালাও কেন?
তাকে থমকে দাঁড়াতে হলো। পথের মাঝখানে সুরতুন দাঁড়িয়ে।
হারমোনিয়ামওয়ালা বললো, ঘরে চলো, জল আনবের আমি পারবো না।
আমার কলস কোথায়?
হারাইছে।
ঘরে ফিরে এসে হারমোনিয়ামওয়ালা সোভান-জয়নুলকে ডেকে তুলো, রাত ভোর হয়, ট্রেন ধরবের হবি নে?
ঘুমন্ত ছেলে দুটিকে ঠেলতে ঠেলতে খানিকটা দূর অত্যন্ত দ্রুত হেঁটে একসময়ে সাহসের ভাব নিয়ে হারমোনিয়ামওয়ালা পথের উপরে দাঁড়ালো। ইতস্তত করে জয়নুলকে সে বললো, আচ্ছা, তোরা কস, এখানে তোরা আগেও আসছিস।কখনো রাত করে পুকুর থিকে জল আনতে কেউ কইছে?
না। তা কবি কে?
হারমোনিয়ামওয়ালা কী ভাবলো, তারপর মাথা দুলিয়ে বললো, সেবয়স তোদের হয় নাই।
পানীয় জলের খোঁজে সুরতুন রান্নাঘরে গেলো। ততক্ষণে কুপির তেল নিঃশেষে পুড়ে গেছে। হাতড়িয়ে টেপির মায়ের কলসটি সে বার করলো। চাঁদের আলোয় নিয়ে দেখলো কলসের তলায় জল চকচক করছে। পোকামাকড় থাকতে পারে এই ভেবে নিজের পরনের শাড়ির আঁচলটায় কলসের মুখ ঢেকে সেই কাপড়ে মুখ রেখে চুষে চুষে অনেকক্ষণ ধরে জলটা খেলো সুরতুন।
শরীরটা কিছু স্নিগ্ধ হয়েছিলো। সে ভাবলো, এখুনি ঘুম এসে যাবে।
সকালে ঘুম ভাঙলেও অনেকটা বেলা পর্যন্ত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে গড়িয়ে গড়িয়ে একসময়ে সে উঠে বসলো। স্বগতোক্তি করলো রাত-বিরেতে এমন ছুটোছুটি করলে গায়ে ব্যথা হয়। সে মোকামে গেলো না। তখন কেউ যদি সুরতুনের মুখ দেখতো তবে তার মনে হতে পারতো তার চাহনির পরিবর্তন হয়েছে, চোখের কোণ দুটি চঞ্চল হয়েছে।
.
একদিন ট্রেনে উঠতে গিয়ে সুরতুন নিঃশব্দে সরে এলো। গাড়ির কামরার সামনে মাধাই। দাঁড়িয়ে।
সে ট্রেনেই উঠলো না সুরতুন।
মাধাইকে আজ অন্যরকম দেখিয়েছে। রেলের বোতাম বসানো শাদা একটা কোট পরেছে মাধাই বাবুদের মতো। খাকির পোশাকে নেই বলেই কি এমন দেখিয়েছে? তাকে বলশালী বলে বোধ হলো না।
নিজের হাসি সবসময়ে দেখা যায় না, কিন্তু সুরতুন আজ মাধাইয়ের কথা ভাবতে মিঠিয়ে মিঠিয়ে হাসলো একবার।
এক দুপুরে বসে বসে সে নিজের টাকার হিসেব নিলো। গেজে ও আঁচলে ভাগ করে রাখা টাকা-পয়সা নোট গুনে-গেঁথে দেখলো, তেরো টাকায় পরিণত হয়েছে তার মূলধন।
টাকাপয়সা সব আঁচলে বেঁধে সে বেরিয়ে পড়লো।
দিঘা বন্দরের দোকানের পথ এখন তার অপরিচিত নয়।
বাজারের ঠিক মাঝখানে একটা কাপড়ের দোকানের সম্মুখে গিয়ে সুরতুন দাঁড়ালো।
কী চাই?
শাড়ি।
দোকানদার তাকে দু-একখানা শাদা শাড়ি দেখালো।
সুরতুন বললো, রঙিন নাই?
দেখেশুনে একটি শাড়ি সে পছন্দ করলো, কালো জমিতে লাল চওড়া দাঁত-দেওয়া পাড়। কিন্তু দাম দিতে গিয়ে সে বিপন্ন বোধ করলো। দশ টাকায় একখানা কাপড়! কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাড়িটা কিনলো সে।
শেষ সম্বল অবশিষ্ট তিনটি টাকা শক্ত করে আঁচলে বেঁধে বাজারের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ালো সে।
হঠাৎ তার চোখে লাগলো, তিনজোড়া রেশমি চুড়ি কিনলো সে।
বাজার থেকে বেরুনোর পথে তার চোখ পড়লো একটা ইরানীর দোকানে।
ইরানী বললো, সুর্মা লেবে?
কতকে?
দো-আনা শিশি।
দেও একটা। ওটা কী, সাপান?
দো-আনা।
দেও একটা।
এই সময়ে দোকানের এক অংশে সুরতুনের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। লাল মোটা কাঁচের বড়ো বড়ো পুঁতির তৈরি একটা মটরমালা। মটরের মধ্যে মধ্যে আবার কাঠি পরানো। সুরতুন মালাটা চেয়ে নিয়ে হাতে করে ওজন দেখলো। সুতোয় গাঁথা নয়, পেতলের তারে বসানো, লক্ষ্য করলো। তারপর সে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছিলো, তখন ইরানী নিজে উঠে এসে মালাটা তাকে পরিয়ে দিলো। ঠাণ্ডা কাঁচ গায়ে লেগে সুরতুনের গা হিম হয়ে গেলো।
অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে সে জিজ্ঞেস করলো, কতকে?
ইরানী বললো, তিন রুপেয়া।
সুরতুন হারটিকে খুলবার জন্য আঁকুপাঁকু করতে লাগলো। সে বললো, তিন টাকা নাই।
কত আছে?
দুই টাকা। তা আমার খাতে আট আনা লাগবি।
ইরানী ভঙ্গি করলো, মিথ্যা বললো, অবশেষে বললো, খানেমে চার আনা রাখো।
সুরতুন চার আনা পয়সা রেখে আর সব দোকানদারের হাতে তুলে দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো।
সুরতুন প্রথমে স্থির করলো বাঁধের ডোবায় স্নান করতে যাবে। তেমনি করে বিসর্জন দেবে পুরনো কাপড় যেমন একবার দিয়েছিলো। মাথা ঘষবে, হাতেপায়ে সাবান দেবে। আয়না? মানে যাওয়ার পথে অবশিষ্ট সম্বল সিকিটা দিয়ে একটা চিরুনি, একটা খুব ছোটো আয়না হয় কিনা দেখতে হবে।
কিন্তু কোথা থেকে এক লজ্জা এসে বাধা দিতে লাগলো। বাঁধে যাওয়া হলো না। বিকেলের আলো যখন পড়ে এসেছে পুকুর থেকে সে স্নান করে এলো। মাথা ঘষা হলো না কিন্তু শুধু জল দিয়ে চুলের ময়লা যতদূর সম্ভব উঠিয়ে দিলো।
সন্ধ্যার অন্ধকারে নতুন শাড়ি পরে সুরতুন দিঘার পথ ধরলো।
মাধাইয়ের কোয়ার্টার্সের অনতিদূরে তাকে একবার থামতে হলো। ঘরের ভিতরে যেন মানুষ চলার শব্দ হচ্ছে, আর সে শব্দ তার নিজের বুকের মধ্যে গিয়ে ঘা দিচ্ছে। বুকের নিচে তার অন্তরদেশ থরথর করে কেঁপে কেঁপে উঠছে। বারান্দায় উঠে দাঁড়িয়ে সে একটা খুঁটি চেপে ধরলো। পা টাল খাচ্ছে, সেটা সামলাতে হবে, পালানোর প্রবল ইচ্ছাটাকেও বাধা দিতে হবে।
খোলা জানলায় চোখ পড়তে সে বিস্মিত হলো, বিস্ময়ের টানে এগিয়ে গেলো। মাধাই ঘরে নেই, এমনকী তার শয্যা-উপকরণ, জামাকাপড় কিছু নেই। সে কি ঘর ভুল করেছে? বারান্দা থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে ঘরখানিকে চিনবার চেষ্টা করলো।
