লোকটি একটা বিড়ি ধরিয়ে চিন্তা করার মতো মুখ করে বসে থেকে থেকে অবশেষে বললো, এ বাড়ি গ্লোমার? এই জমি-জিরাতও তোমার?
না।
তবে পরের বিষয় পাহারা দেও?
তাও না।
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ করে থেকে লোকটি বললো, তাইলে এক কাম করা যাক। হারমনি আর ঝোলা ঝক্কর ঘরে থাক। ইস্টিশনে যাই, কাল পরভাতে আসবো।
লোকটি বিদায় নিলে সুরতুন শুতে যাবে এমন সময়ে মনে পড়লো তার শাড়িটার দু-এক জায়গায় সেলাই করা দরকার। কুপিটার পলতে বাড়িয়ে দিয়ে সূচ-সুতো নিয়ে বসলো সে। কয়েক মুহূর্ত পরে পায়ের শব্দে সে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালো। সে তত গোঁসাই নয় যে বলবে-দরজা খোলা আছে, মানুষ হও এসো।
জাগে আছো? পথ চিনে ইস্টিশনে যাবো এমন ভরসা পালাম না। চাঁদের আলোয় পথঘাট সব সমান দেখাতিছে।
হারমোনিয়ামওয়ালা ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়িয়ে বললো, ভাবলাম কপালে যা আছে, ফিরে যাওয়াই লাগবি।
কাছাকাছি দাঁড়িয়ে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে সুরতুনের মনে হলো, ঝাকড়া চুল আর মুখের লাবণ্যহীনতায় লোকটিকে যত বয়স্কই মনে হোক এই হাল্কা-পলকা লোকটি প্রকৃতপক্ষে ইয়াজদের বয়সীহবে, অন্তত সে সুরতুনের নিজের চাইতে বয়সে ছোটো হবে এতে আর সন্দেহ নেই। লোকটি যেন ভয়ে হাঁপাচ্ছে।
ভয় পাইছো?
না, ভয় আর কী? নতুন জায়গা, গা ছমছম করে।
এখন আর কোন কাজই বা আছে, বসে বসে গান করো।
লোকটি গান ধরলো কিন্তু গাইতে পারলো না, তার গলা কেঁপে কেঁপে যেতে লাগলো। থেমে গেলো সে।
কী হলো?
হয় না।
কেন্? এখনো ভয়?
জান্নে।
অনেকদিন যাত্রা করেছে লোকটি। নিজের কথা না বলে, কিংবা নিজের কথা কী করে বলা যায় তা বুঝতে না পেরে, সে নায়িকা সেজে দাঁড়ালে তাকে লক্ষ্য করে অন্য কেউ হয়তো যা বলেছে, সে কথা কয়টি সে বলে ফেলো, প্রাণ পুড়ে যায়, পাদপদ্ম বিনে শীতল হয় না।
এও যেন আর একটি গান, তেমনি ভাষা। সুরতুন বললো, পাদপদ্ম কী?
সে বললো, কন্যে, তোমার বিহনে আহারে আমার রুচি নাই।
সুরতুন খিলখিল করে হেসে উঠলো।
এরকম অনুভব সুরতুনের জীবনু কখনো হয়নি। হারমোনিয়ামওয়ালার অবাস্তব ভাষা, অবাস্তব ভঙ্গি, তার ভয়, তার রোগা-পল্ক চেহারা, তার বয়স সম্বন্ধে সুরতুনের নিজের ধারণা সুরতুনকে এক ধরনের সাহস যুগিয়ে দিলোগোঁসাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে টেপির মা যেমন টিপে টিপে হাসে তেমন অকুতোভয়তাতার ছেঅবিশ্বাস্য বোধহতো। কিন্তু তার নিজের মধ্যে কোথাও লুকনো ছিলো এমনি যেন তার এই সাহস সত্তার সাময়িক প্রকাশ। তার ইচ্ছা হলো সে টেপির মাকে অনুকরণ করবে। সে বললো, পেরাণের পোড়ানি কমছে?
হারমোনিয়ামওয়ালা কথাটায় প্রশ্রয় পেয়ে এগিয়ে এসে সুরতুনের একখানা হাত নিজের হাতে নিলো।
কালো রোগা রোগা হাতের উপর নিজের পুষ্ট হাতখানা লক্ষ্য করলো সুরতুন। সে বললো, আমার আঙুলগুলি কী হবি?
সুরতুন, কও, তুমি আমাক দয়া করবা?
সুরতুন খিলখিল করে হাসতে হাসতে বাইরে এসে দাঁড়ালো। চাঁদের আলোয় চরাচর আচ্ছন্ন। সে নিজের অভূতপূর্ব অনুভবটাকে নির্ণয় করার চেষ্টা করতে লাগলো। একেই কি সাহস বলে! তার সঙ্গীরা কি এর অভাবকেই তার মধ্যে আবিষ্কার করে আলোচনা করতো। এর অভাবেই কি সে মাধাইয়ের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছে?
আমি আসবো?
আসো না কেন, কে আটকায়। সুরতুন হাসলো।
কাছে এসে লোকটি বললো, সুন্দরি, আজকের এই চান্দের আলোয়—
সুরতুন বললো, একটুক জল খাবো, গরম লাগতিছে। পুকুরের থিকে জল আনে দেও।
হারমোনিয়ামওয়ালা বললো, কলস নিয়ে যাতে পারি যদি পথ দেখাও।
তা দেখাবো।
দুপুররাত্রিতে পুকুর থেকে জল আনতে যাচ্ছে লোকটি, সুরতুন আগে আগে যাচ্ছে। পথে খানা-খন্দ ঝোঁপঝাড়। লোকটি একবার হোঁচট খেয়ে বললো, বাবা, ই কী পথ!
পথের যে জায়গাটায় সবচাইতে বেশি জঙ্গল সেখানে হঠাৎ সুরতুন অদৃশ্য হয়ে গেলো। হারমোনিয়ামওয়ালা দেখলো, সে যে-জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে তার চারদিকেই আশশেওড়ার ঝোঁপ, আর সেগুলির মধ্যে মধ্যে সরু সরু পথ। ঝোঁপগুলি যেমন প্রত্যেকটি অন্যটির মতো দেখতে, তেমনি সেই সরু পথগুলি।
কোথায় গেলা, সুরতুন? পুকুরের পথ কোন দিকে?
সাড়া না পেয়ে লোকটি ভাবলো সুরতুন এগিয়ে গেছে। সে তাড়াতাড়ি খানিকটা ছুটে গিয়ে দেখলো.যে পথ ধরে সে চলেছে সেটার প্রান্ত একটা বড়ো ঝোঁপড়া জঙ্গলে গিয়ে শেষ হয়েছে।
থমকে দাঁড়িয়ে হারমোনিয়ামওয়ালা ডাকলো, সুরৎ!
কে যেন খিলখিল করে হেসে উঠলো।
সে ভাবলো, পাশের ছোটো ঝোঁপটা ডিঙিয়ে যেতে পারলে সুরতুনের কাছে পৌঁছনো যাবে। বলপ্রয়োগ করে ঝোঁপ সরিয়ে চলতে গিয়ে পাঁচ-ছটা কিংবা তারও বেশি কাঁটা তার হাতেপায়ে বিধে গেলো। ইস্ উস্ করে ঝোঁপটা থেকে বেরিয়ে এসে সে বললো, তুমি হাসো, সুরতুন,
আমার পরাণ যায়।
কেন, কী হলো?
স্বরটা যেন তার বাঁ দিক থেকে এলো। সে দিকটা অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার। অনেকটা দূর ঘাসে ঢাকা মাঠ দেখা যাচ্ছে। হারমোনিয়ামওয়ালা দৌড়ে খোলা জায়গাটা পার হতে হতে বললো, এইবার তোমাক ধরছি।
অনেক দূরে বড়ো জঙ্গলটার মাথায় মাথায় কয়েকটা পাখি কবা কবাক্ করে উঠলো।
পিছনে ফিরে সে দেখবার চেষ্টা করলো কুঁড়েঘরগুলি কোথায়। ঘরগুলি অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে, সেগুলি সহজেই চোখে পড়লো। হারমোনিয়ামওয়ালা কলসি মাটিতে রেখে কর্তব্য চিন্তা করলো। সে শুনেছে এর আগে এমন নির্জন মাঠে এমনি ঘটনা ঘটেছে। দিশেহারা মানুষ সারারাত পথে-বিপথে ছুটে সকালের দিকে কোনো মজাপুকুরে কিংবা দ’য়ে ডুবে প্রাণ হারায়। ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাকে সে দেখেছিলো সে হয়তো সুরতুন নয়। হয়তোবা সুরতুন ঘরে ফিরে এতক্ষণ ঘুমোচ্ছে। ঘরের দিকে ছুটতে ছুটতে তার মনে হলো–তা না হলে এমন রূপ, এমন হাসি!
