কথা শুধু কথাই নয়। জয়হরিকে বললো মাধাই, সে কাশী যাবে, অন্য কাউকে বললো মাসির বাড়িতে যাচ্ছে। তীর্থযাত্রার কথা পূর্বাহে প্রকাশ করলে ফলশূন্য হয় পরিক্রমা, এরকম একটা কথা সে কখনো কারো কাছে শুনে থাকবে, তাই এত ছলনা। প্রকৃতপক্ষে সে মনিহারিঘাটে যাওয়াই স্থির করলো। গ্রামে থাকতে সে শুনেছিলো পিতৃপুরুষের অস্থি বিসর্জনের পক্ষে মনিহারিঘাটই প্রশস্ত। তা যদি হয় তবে তার চাইতে পবিত্র কে?
মাধাই সত্যি ছুটি নিলো, সত্যিই একদিন ট্রেনে চেপে বসলো। সে-সময়ে সুরতুনকে একবার দেখার লোভ হলো তার।
.
সুরতুন লক্ষ্য করে দেখলো, সেজীবনের একটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। যতদিন মোকামের দর আর এখানকার দরের পার্থক্য লাভজনক থাকবে ততদিন গোঁসাইয়ের এই কুটিরেই সে বাস করবে। অত্যন্ত পরিশ্রমসাপেক্ষ, তবু দুবেলা আহারের নিশ্চিত সুযোগ। স্বাবলম্বনের তৃপ্তিটাও যেন উপভোগ করা যাচ্ছে।
একদিন বন্দরের দোকানগুলির সম্মুখ দিয়ে চলতে চলতে সে হাসি হাসি মুখে থেমে দাঁড়ালো। একটা বিড়ি কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ব্যাপার। একজন বয়স্ক লোক মাথায় লালপাগড়ি বেঁধে, গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে আর পায়ে ঘুঙুর বেঁধে গান করছে, নাচের ভঙ্গিতে পা ঠুকে ঠুকে ঘুঙুর বাজাচ্ছে। আর দুটি ছেলে রাধাকৃষ্ণ কিংবা রাজারানী সেজে দাঁড়িয়ে আছে।
তখন বেলা হয়েছে। গান বাজনা বেশিক্ষণ আর চললো না। মূল গায়ক গলা থেকে। হারমোনিয়াম খুলে কাছের একটা চায়ের দোকানে বসলো। রানীও তার কাছে রইলো, কিন্তু রাজা চঞ্চল চোখে এদিক-ওদিক চাইতে চাইতে সুরতুন যেখানে বসে চাল বিক্রি করছিলো তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
আমাক চিনছো?
হয়, চিনলাম। রানী কি তবে জয়নুল? কবে আসছিস?
পেরায় চারদিন।
ইয়াজ কনে?
তা কী জানি।
সোভান তাদের মাস দু-একের ইতিহাস গলগল করে বলে গেলো। তার সারমর্ম এই : কিছুদিন ভিক্ষা করার পর তারা অবশেষে মোকামের দিকে এক শহরে এক বিড়ির কারখানায় চাকরি নিয়েছে। বিড়ি বাঁধতে পারে না, দিনে দশ-বারো ঘণ্টা একটা টিনের পাতের মাপে বিড়ির পাতা কাটাই তাদের কাজ। দু’বেলা হোটেলে খায়, রাত্রিতে সেখানকার স্টেশনে শোয়। এখন তারা সফরে বেরিয়েছে, ফিরে গিয়ে সেই কাজই করবে আবার।
যাবার সময় সোভান বললো, যাওয়ার আগে তোমার হাতের রান্না খায়ে যাবো।
চার-পাঁচ দিন পরে এক সন্ধ্যায় টেপির মায়ের ঘরের কাছাকাছি এসে সুরতুন জয়নুল, সোভান আর তাদের সঙ্গীহারমোনিয়ামওয়ালাকে আবিষ্কার করলো। কি রে, তোরা আসছিস?
আলাম, রাঁধে খাওয়াও। এনাকেও ধরে আনছি। কিন্তু অপরিচিত বয়স্ক একজন লোককে সে কী করে সমাদর করবে? সুরতুন একটু ইতস্তত করে বললো, তোদের দুইজনেক না হয় রাধে দিলাম, কিন্তুক ওনাক কী রাঁধে দিবো? রাঁধে দিলেও কি খান?
লোকটি এই প্রথম কথা বললো, বাবরি চুল দুলিয়ে সে বললো, বেহুলা যদি রাঁধে, খায় না কে? যদি কও, সুন্দরি, হাটবাজার করে আনি।
সোভান লোকটির ভুল ধরিয়ে দিলো, ওর নাম সুরেরা, সুন্দরি না। এখন না হয় আমরা মাসি কবো।
লোকটি বললো, তা ধরো যে সুরৎ আর সুন্দর একই হলো।
সুরতুনের নীরবতায় সম্মতি পেয়ে যেন লোকটা বাজারে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো।
সুরতুন বললো, তাইলে কলাপাতা, আনাজ, তেল আর ঝাল মসলা আনবেন।
সে রাতটি শুক্লপক্ষের ছিলো, কাজেই পরিচ্ছন্ন উঠোনটা চাঁদের আলোয় ধৰ্ধকরছিলো। জয়নুল সারাদিনের ক্লান্তিতে উঠোনে গামছা পেতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো, সোভান বয়স্কদের ভঙ্গিতে বসে বিড়ি টানছে। রান্নাঘরে কাজ করতে করতে সুরতুন দেখতে পেলোলোকটি হাঁ করে আকাশের দিকে চেয়ে আছে।
সুরতুন তাকে বললো, যেমন করে গ্রামের মেয়েরা ফকিরবাউলকে বলে, আর একটা গান করেন।
লোকটি কিছু বললো না। কিন্তু সুরতুন রান্না করতে করতে শুনতে পেলো, একটা গান ধরেছে। লোকটি।
গোঁসাই গান করে। তখন তার হাসি হাসি মুখের দিকে চাইলে সুরের চাইতে কথা, এবং কথার চাইতে গায়ককে বেশি ভালো লাগে। কিন্তু এ লোকটির গানের তুলনায় গোঁসাইয়ের গানকে নিষ্প্রভ মনে হয়।বহুদিন সে যাত্রার দলে সখী সেজে গান করেছে, এবং এখন যে গানটি করছে সেটা পানোন্মত্ত কোনো রাজার নৃত্যশালার দৃশ্য থেকে আহরণ করা। সুরতুন না জেনে ভালো করেছিলো।
এদের রাত্রির ট্রেন ধরে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু আহারাদির পর প্রথমে জয়নুল এবং পরে সোভান বিশ্রাম করতে চাইলো। লোকটিও রাজী হতে পেরে খুশি হয়ে বললো, কাল সকালের ট্রেনে গেলিও যাওয়াই হবি!
জয়নুল ঘরের হদিশ জানতো। সে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লো। সোেভান নিজের বয়সের মর্যাদা দেখানোর জন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে জয়নুলকে অনুসরণ করলো। সারাদিনের রোদ লেগেছে গায়ে, নেচে নেচে পথ চলেছে তারা–এমন নিশ্চিন্ত মায়ের কোলের মতো আশ্রয় পায়নি তাকে দিন। সোভান আর জয়নুল দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লো।
রান্নাঘরের কাজ শেষ করে এসে সুরতুন এইবার চরম বিব্রত হয়ে পড়লো। ঘরে ঢুকে দেখলো জয়নুল ও সোভান দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবরিওয়ালা লোকটি উঠোনে তার হারমোনিয়ামের পাশে বসে আছে। এখন সে কী বলবে, কী করবে, এই হলো সুরতুনের চিন্তা।
ছাওয়ালরা ঘুমালো?
তা ঘুমালো।
তারপরই আবার দুজনেই থেমে গেলো।
