মাধাই কিছুক্ষণ চিন্তা করলো। তারপর বললো, চন্দ্রাবলী, আফিং খাবা?
সে খায়ে তো মানুষ মরে।
তোমারও বাঁচে কী সুখ?
চাঁদমালা এক নিমেষে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, গাল পাড়েন আপনে, আপনে আর আসবেন না।
কেন্, তোমার আগের লোক নাকি আফিং খাতো।
আগেও লোক থাকার কথা যদি বিশ্বাস করেন তাইলে আপনে আর আসবেন না।
কিন্তুক আফিং-এ নিশাও হয়। খাবা একদিন?
তা দিয়েন।
তা দিবো। কোকিয়ান খাবা, চন্দ্রাবলী?
সে কি?
বড়ো নিশা।
আপনে কিছুই দেন না। খালি কন্।
মাধাই হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালো।
সে কী, চলে যান?
এই নেও, টাকাটা ধরো। আফিং আনতি যাই।
আর একটা সিগ্রেট দিবেন। আর আমার একখানা কাপড়ের দরকার। কিনে দিবেন?
তা-ও দিবো। বলে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা ছুঁড়ে দিলো মাধাই।
মাধাই সোজা স্টেশনে গিয়ে উপস্থিত হলো। একটা চায়ের দোকানে বসে সে বললো, ডবল ডিমের মামলেট দ্যাও, আর দুই পি রুটি। চা যে করবা ষাঁড়ের রক্ত হওয়া চাই।
চা-রুটিতে নৈশ আহার শেষ করে মাধাই দেয়ালঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো রাত এগারোটা পার হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের উপর দিয়ে চলতে চলতে সে দেখতে পেলো জয়হরি ডিউটিতে আসছে।
কী ভাই, ডিপটিতে আসলা?
আসলাম, কী করি কও? জয়হরি মুখ গম্ভীর করে বললো।
তোমার বড়ো ছাওয়ালডার তাড়াসে জ্বর শুনলাম।
এখানে বলা দরকার জয়হরির র্যাশান-কার্ডে একাধিক ছেলের হদিশ পাওয়া গেলেও তার সন্তান বলতে একটিমাত্র মেয়ে, এবং এ-খবর মাধাইয়ের জানা ছিলো।
না। অবাক হলো জয়হরি।
তবে?
বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হলো। জয়হরি মাধাইকে বুঝতে না পেরে সত্যি কথাটা বলে ফেলো।
মন কেমন করতেছে?
না। তেমন আর কী।
এরপর জয়হরিকে অবাক করে দিয়ে মাধাই প্রস্তাব করলো, তুমি বাড়ি যাও ভাই, বউয়ের পায়ে হাত রাখে মাপ চায়ে নিবা। আমি তোমার ডিপটি করে দিতেছি। জয়হরি ভেবেছিলো এটাও পরিহাস। কিন্তু ততক্ষণে মাধাই দক্ষিণের কেবিনের দিকে জয়হরির ডিউটি দিতে রওনা হয়ে গেছে।
বলা বাহুল্য, ডিউটি দিতে দিতে চাঁদমালার কথা মনে পড়লো না। মাধাই নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করলো–এটা ধরো বদূলির ব্যাপারের মতো। যার সঙ্গে খুব আলাপ হলো, রানিংরুমে বসে একসঙ্গে গালগল্প হাসিঠাট্টা করলাম সে বলি হয়ে গেলো একদিন। সম্বন্ধ পাতানো হয়েছিলো, মিটে গেলো। এই হচ্ছে সুরতুন।
কিন্তু মাধাই তখনো বুঝতে পারেনি যে যার সঙ্গে সম্বন্ধ নেই এটা বুঝতে চিন্তা করা দরকার, তাকে বিস্মৃত হওয়া যায় না।
তারপর সেই ঘটনাটা ঘটলো–সুরতুনের সঙ্গে তার দেখা হলো মিলিটারি ক্যান্টিনের সরু গলিতে। সজ্জিতানয় সুরতুন। একটু ক্লান্ত দেখালো তাকে, যেমন তাকে সাধারণত দেখায়। কিন্তু তার মুখের দিকে মুখ নামিয়ে অনেকটা সময় নীরবে চেয়ে ছিলো মাধাই। এত ঘনিষ্ঠ সে-দেখা যে সুরতুনের চোখের সূক্ষ্ম লাল শিরাগুলি তার চোখে পড়ছিলো, নিশ্বাসে নিশ্বাসে তার বুকের কাছে যে অস্পষ্ট নীল শিরাটা থরথর করে কাঁপছিলো সেটিও।
ঘরে ফিরে তার মনে পড়লো :সুরতুন তিরস্কারের এমন সুযোগ পেয়েও ছোটো একটি ভীত মেয়ের মতো নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন নিজের কোনো অপরাধের জন্য দুঃখপ্রকাশ করবে।
সে তখন ভাবলো–আচ্ছা বোকা আমি। তখন-তখনই সুরতুনকে ডেকে আনার জন্য সে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো; কিন্তু এগিয়ে যেতে পারলো না, খানিকটা সময় তার কোয়ার্টারের সম্মুখে অস্থিরভাবে পদচারণ করে বেড়াতে লাগলো।
মাধাই একদিন মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে গেলো।
কে, মাধব? এসো, এসো। এমন অসময়ে যে?
কথাটা পাড়া সহজসাধ্য নয়; সূত্র হিসাবে যতগুলি কথা মাধাই মনে মনে স্থির করলো কোনটিই তার পছন্দ হলো না। শেষ পর্যন্ত সে বলে ফেলো, আন জাতের মেয়ে বিয়ে করার নিয়ম কী?
মাস্টারমশাইয়ের কৌতুক বোধ হলো। সেটা দমন করে সে বললো, তুমি করবে নাকি?
যদি করি মন্তর পড়ার কী হবি, পূজার কী হবি?
ওসব করতেই হবে এমন কী কথা আছে?
ওছাড়া অন্য মিয়েমানুষ আর বউয়ে কি তফাৎ থাকে?
তারা যদি হিন্দু হয় তবে মন্ত্রপড়ার ব্যবস্থা করা যায়।
আর যদি হিন্দু না হয়?
মাধাই, বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে বিবাহসম্পর্ক স্থাপনের জন্যে সরকারি আইন আছে।
সেরকম বউ কি লোকে গণ্যমান্য করে?
তা করে বৈকি।
মাধাই মুখ নিচু করে বসে রইলো, তারপর হঠাৎ অভিমানের সুরে বললো, যুদ্ধের হুড় হাঙ্গামায় আমি যেন বুঝতে পারি নাই আমি কী চাই। আপনেরা ভদ্দরলোক হয়েও কেন ধরবের পারলেন না আমার কী দরকার। সংঘের কাজ-কামে তারপরেই লাগায়ে দিতে পারতেন।
বক্তব্যটিকে বিশদ হওয়ার সুযোগ না দিয়ে মাধাই উঠে পড়লো। সমগ্র দিনটি সে মাস্টারমশাই-এর কথাটা একটি মূল্যবান আহরণের মতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো। একসময়ে সে স্থির করলো কিন্তু তারও আগে নিজে পরিষ্কার হতে হবে। চাঁদমালার মলিন শয্যা পরিহার নয় শুধু, নিজের এতদিনের ব্যবহৃত পোশাক-পরিচ্ছদ, শয্যা, সবই যেন পরিহার্য।
রাত্রিতে বিছানায় শুয়ে চাঁদমালার কথা মনে হলো। তার প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা, তার বোকামির জন্য একটা সহানুভূতি অনুভব করতে লাগলো সে। তাহলে এটাই কি পাপ? কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে প্রতিভাস্ফুরণের মতো একটা কথা তার মনে হলো গঙ্গাস্নান করে পরিষ্কার হওয়া যায়। একদিনে হবি নে। দিন দশ-পনেরো গঙ্গার ধারে থাকে রোজ স্নান করা লাগবি।
