খানিকটা সাধাসাধির পর চায়ে হাত দিলো মাধাই।
কিন্তু মুখ নিচু করে চা খেয়ে মাধাই যখন চোখ তুলো ততক্ষণে টেপির সাজ-পোশাকের পরিবর্তন হয়ে গেছে। চোখে চশমা নেই, গলায় সেই ঝুটা মুক্তার মালা নেই। এ যেন খানিকটা নাগালের মধ্যে একজন।
মাধই বলল–টেপি, মানুষ আসার সময় হলো?
–না। বোসো। আজ মানুষ আসেনা। আমাক তোমার মনের কথা কও। এমন হলো কেন্? কী হইছে?
–এখানে আসছো কেন্?
মাধাই হাসবার একটা করুণ চেষ্টা করলো।
তখন টেপি বললো–তোমার কষ্ট সওয়া যায় না। দাদা, তুমি শুধু সুরতুন আর ফতেমাকে বাঁচাও নাই। তুমি জানো না, কতবার কত জায়গায় ধরা পড়ে আমি কইছি মাধাইয়ের বুন হই আমি।
হঠাৎ মাধাইয়ের মন ভাষা পেলো–কেন রে, দুনিয়ার সব মিয়েমানুষ কি আমার বুন হবি?
সে যেন একটা পরম কৌতুকবোধে হো হো করে হেসে উঠলো।
মাধাই উঠে দাঁড়ালো। টেপির মনে হলো এমন অদ্ভুত কথা কেউ কোনোদিন বলেনি।
সে বললো–তুমি তো জানোই আমাক ঘরে নিয়ে সুখী হওয়ার পথ আর নাই।
একটু তিক্ত হেসে মাধাই বললো–বুন হবা বলো, বুনই ভালো।
কিন্তু টেপির পল্লীর বাইরে পৃথিবী বহুবিস্তৃত। পাঁচ-সাতদিন ঊর্ধ্বশ্বাসে জীবন নিয়ে ছুটোছুটি করে মাধাই রেল কলোনীর একান্তে চাঁদমালাকে আবিষ্কার করলো।
এমন সময়ে আবার দেখা দিলো সুরতুন। দু-তিন মাসের ব্যবধানেই সুরতুন তার ধূলিমলিন স্বাভাবিক রূপে ফিরে গেছে। তার কথা ভাবতে ভাবতে মাধাইয়ের মন উদাস হয়ে গেলো। দু-চারদিন আগে এক গোঁসাইয়ের মুখে সে একটা গান শুনেছে : শাদা-শাদা পায়রা তোমার উঠোন থেকে মটর খেয়ে যায়। যদি তুমি চাও যে সে পায়রা থাকবে তবে ধরতে যেয়ো না। এই জীবনের কথা, ভাই মানুষ, শোনন, এই অবসরে বলা হলো। সুখকে ফাঁদ পেতে ধরা যায় না।
পায়রা উড়ে গেছে, সুখের পায়রা, তাই সুখও গেছে। ধরতে গিয়েই তো এই বিড়ম্বনা।
.
স্কুলের সেই মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে আজকাল নিয়মিত সপ্তাহে একদিন দেখা হয়। বাঁধা রুটিনে মাধাই রেলশ্রমিক সংঘের অবৈতনিক সহ-সংগঠন-সম্পাদক হিসেবে সভাপতি মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি যায়। রিপোর্ট দেয়। এবং রুটিন রিপোর্টের দস্তুরমতো তাতে আজকাল যথেষ্ট মিথ্যাও থাকে।
কিন্তু গোঁসাইয়ের গানের পরিসীমায় নিজের মনকে আবদ্ধ করে রাখতে পারলোনা মাধাই। সামান্য একটা ঘটনাকে অবলম্বন করে সে একটা আকস্মিক ধর্মঘট আহ্বান করে বসলো। খবর পেয়ে তার সংঘের অন্যান্য মন্ত্রী ও সভাপতি ছুটে এলো। ব্যাপার কী, মাধাই? কিছুই নয়। ব্যাপারটা একটা বড়ো রকমের ঘটনায় পর্যবসিত হতে পারতো, কিন্তু হয়নি;কারণ তার আগেই মাস্টারমশাই ও স্টেশনমাস্টারের মধ্যে আলাপ আলোচনা হলো, একটা সমাধানের সূত্র আবিষ্কার করা গেলো। ঘণ্টাতিনেক বিলম্ব করে গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। মাস্টারমশাই জনান্তিকে মাধাইকে মৃদু তিরস্কার করে বললেন, শক্তির অকারণ খরচ করলে, মাধাই।
কিন্তু মাধাইয়ের কাছে এ সবই মূল্যহীন। স্টেশনের সব কর্মচারী যখন ইউনুস ফিটারের অপমানের কথা, যা ধর্মঘটের মূল কারণ, এবং তার প্রবল শক্তিশালী কিন্তু অনির্দিষ্ট বন্ধুকে নিয়ে আলোচনা করছে, তখন সেই বন্ধু মাধাই বাসায় ফিরে ভাবলো : ইস্টিমবোঝাই এঞ্জিন, মনে কয়, দুনিয়া বাঁধে দ্যাও ল্যাজে,দুনিয়া নিয়ে ছুটবি, ক্যানিস্তার-টিন-বাঁধা কুকুর যেমন পাগল হয়ে ছোটে। কিন্তুক আজ দিলাম বন্ধ করে। ল্যাও, গলায় দড়ি বাঁধা কুকর, কত ছুট ছোটো।
মেয়েটির নাম চাঁদমালা, কিন্তু আশ্চর্য এই যে সে নিজেও জানে না তার নাম এটা। সে বলে চঁদমালা তার নাম নয়, আসলে সে চন্দ্রাবলী। মাধাই বললো, চন্দ্রাবলী, একপদ গান করো।
আপনে বড়ো বাজে কথা কন্।
কী আর বাজে কথা কলাম। আজ যা করছি শুনলে তুমি বুঝবা আমি কে। রেলগাড়ি দেখছো? ফোটিন ডাউন? কলকেতা শহরে যায় মাছ আর ঘি, দই আর ছানা নিয়ে। কলাম–যাবিনে আজ গাড়ি। গেলো না।
চাঁদমালা তার বোকা বোকা কাজল-আঁকা চোখে তাকিয়ে রইলো। ঘরের এক কোণে চাঁদমালার নীলের বড়োনাদাটা, তার পাশে একটা নেবানো উনুনের উপরে ইস্ত্রি দুটি। তার পাশে মাধাইয়ের আনা লাইন-দেখা আলো জ্বলছে। চাঁদমালা অত্যন্ত কালো, কিন্তু পালোয়ানি স্বাস্থ্য তার দেহে। দূর থেকে এই স্বাস্থ্যই আকর্ষণ করে। একটু পরিচিত হতেই মাধাই লক্ষ্য করেছে চাঁদমালা কল্পনাতীত বোকা।কাপড়-জামা হিসেব করে ফেরত দিতে পারে বটে, পয়সা আদায়টা ঠিক ঠিক করতে পারেনা। পশ্চিমা সেই ধোবাটির মৃত্যুর পর থেকে চাঁদমালা মাধাইয়ের মতোই নিঃসঙ্গ।
কিন্তু চন্দ্রাবলী, গান না হয় না করো, নাচো একটু।
কী জ্বালা!
চন্দ্রাবলী, মদ খাবা?
রোজই তো কন্ একদিনও খাওয়ান না।
আচ্ছা, শনিবার আবার আসবো, সেদিন আনবো। সিগ্রেট খাবা?
মাধাই একটা সিগারেট ধরিয়ে কয়েকটা টান দিয়ে চাঁদমালার হাতে দিলো। চন্দ্রাবলী ভঙ্গি ভরে বিছানায় বসে সিগারেট নিলো।
আচ্ছা, চাঁদমালা, আগে তোমার ঘরে সোডার সোঁদা-সোঁদা গন্ধ থাকতো, আজ যে নাই। কাম ছাড়ে দিলা, দিন চলবে কেমন করে?
দুই সপ্তাহ হলো কাপড় আনি নাই। লোকেক কইছি কোমরীবাত।
খালে কী? তোমার মাংস খাওয়ার খরচই তো দিন একটাকা।
মাংস খাওয়া ছাড়ে দিছি। আপনে সেইদিন দুই টাকা দিয়ে গিছিলেন, তাতেই এ কয়দিন চালালাম কষ্টেসেষ্টে।
