প্রথমে সে অত্যন্ত লজ্জিত ও সংকুচিত বোধ করেছিলো। তারপর সেই সংকোচ থেকে আত্মাণ করতে গিয়ে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলো।
কিন্তু সে-ক্রোধ পরে একটা আশঙ্কায় রূপান্তরিত হলো। তখন সে একটা রেলের লণ্ঠন নিয়ে সুরতুনকে খুঁজতে শুরু করেছিলো। বাজার স্টেশন ইত্যাদি জায়গায় অনির্দিষ্টভাবে খুঁজে, প্রায় ভোর রাত পর্যন্ত হেঁটে, কখনো বসে একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার হেঁটে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে সে স্থির করেছিলো–কেউ যদি লুকিয়ে থাকতে চায় তবে বন্দর দিঘার মতো অত বড়ো জায়গায় একক চেষ্টায় তাকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে সে বাসায় ফিরেছিলো এবং ব্যর্থ খোঁজাখুঁজির চেষ্টায় নিজের উপরেই বিরক্ত হয়ে উঠলো। মনের এরকম অবস্থায় জাগরণক্লান্ত মস্তিষ্কে সে ভাবলো : যে সাজায়-গোছায় সে কী চায় তা বোঝো না? পরক্ষণেই তার মনে পড়লো, সাজানো-গোছানোর পিছনে সত্যি তার কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না। থাকলে বোধহয় সাজানো-গোছানোর ব্যাপারে এগিয়ে যাওয়ার আগে উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা ও চিন্তা করতে পারতো। এ যুক্তি যখন টিকলো না তখন অধিকতর ক্রুদ্ধ হয়ে সে স্বগতোক্তি করলো–মেয়েমানুষের সেই দুর্গতির দিনে যে আশ্রয় দিয়েছিলো তোমাদের, তার কি কিছুমাত্র দাবি নেই? রক্ষক যে ভক্ষক সে এই প্রবাদটা সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়লো। এ যুক্তিটাও বানচাল হয়ে গেলো। হাতের পিঠে একটা জ্বালা করছে, চিবুকেও। এতক্ষণে যেন সে লক্ষ্য করার সময় পেলো। অনেকটা জায়গা কেটে গেছে হাতের পিঠে, আরসিটা তুলে নিয়ে দেখলো চিবুকেও বিন্দু বিন্দু রক্ত জমে আছে। মাধাইয়ের ক্রোধটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলল, শালী বনবিলাই। আয়ডিন লাগাতে হবে।
এসব কিছুতেই সান্ত্বনা পায়নি সে। তার ঘরের বাইরে শুকনো পাতা খচমচ করে উঠতেই সে বলেছিলো, সুরো আসলি? আয়, নির্ভাবনায় আয়। এমনকী উঠে গিয়ে সে বাইরে দাঁড়িয়েছিলো।
পরদিন মাধাই কাজে যায়নি। সুরতুন এসে যদি তাকে না পায় এই আশঙ্কায় সারাদিন সে ঘরেই ছিলো। দিনের বেশিরভাগ সময়ে চিন্তা করেছিলো–ভয় পেয়েছে ও।
আজ সুরতুনকে দেখতে পেয়ে তার মনে একটি অনির্বচনীয় ভাব জমে উঠতে লাগলো। ইতিমধ্যে তার জীবনে অন্য একটি স্ত্রীলোক এসেছে। তার প্রতি যে কোনো মোহ জন্মেছে তা নয়, তবু যেন কিছুটা কৃতজ্ঞতাবোধ, সামান্য কিছু করুণা তার জন্য অনুভব করলো সে। সুরতুনকে গ্রহণ করা কিংবা তার সম্পর্কে উদাসীন হওয়া যেন এ ঘটনা থেকেই জটিল একটা ব্যাপার হয়ে উঠলো।
যে অনুতপ্ত তার অনুশোচনাকে মূল্য না দিলে অনেক ক্ষেত্রে সে-অনুতাপ চিরস্থায়ী বিদ্বেষেও পরিণত হতে পারে। সুরতুন চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরে বিদ্বেষ যখন তার সব চিন্তার মূল রস, তখন একদিন তার মনে পড়লো রমণী হিসাবে টেপি সুরতুনের তুলনায় কিছু কম তো নয়ই বরং অনেক দিক দিয়ে অনেক বেশি কাম্য। টেপিরও এক ধরনের রূপ আছে, অধিকন্তু সে রুচিসম্মত বেশভূষা ব্যবহার করতে জানে, সব চাইতে বড়ো কথা–সে কথা বলতে জানে, রসিকা সে। সাত-পাঁচ মাথামুণ্ডু ভাবতে ভাবতে মাধাই টেপিদের পল্লীতে গিয়ে পৌঁছেছিলো। তখনো সন্ধ্যা হতে কিছু দেরি আছে। মাধাই লক্ষ্য করলো সবগুলি বাড়ির দরজা খোলা, খোলা দরজার পাশে সজ্জিতা স্ত্রীলোক, কোথাও বা একাধিক। হঠাৎ যেন মাধাইয়ের ভয় ভয় করে উঠলো। সে কোনোদিকে না চেয়ে রাস্তাটা ধরে মুখ নিচু করে দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করলো।
টেপি ফিরছিলো সওদা করে। সে মাধাইকে এ পথে দেখে অবাক হলো। এ অবস্থায় মাধাইয়ের সঙ্গে কথা বলা উচিত হবে কিনা ভাবতে ভাবতে সে থেমে দাঁড়িয়েছিলো।
মাধাই বললো–তোমার কাছে আসছিলাম।
–আমার কাছে, কেন্?
ডুবন্ত মানুষ যেমন করে তুচ্ছকে অবলম্বন বলে আঁকড়ে ধরে তেমনি করে মাধাই টেপির মুখের দিকে চেয়ে রইলো।
টেপি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলো, তারপরে বললো–তুমি আসো আমার সঙ্গে।
মাধাই টেপির দিকে তাকিয়ে রইলো। চোখের চশমা থেকে পায়ের চটি পর্যন্ত সর্বত্র সুরুচির চিহ্ন। হাসি হাসি মুখে টেপি দাঁড়িয়ে আছে। টেপির ঠোঁট দুটিও লাল টুকটুক করছে রঙে।
যে-ভয়ে পালাচ্ছিলো মাধাই সেটা যেন দূর হলো। এমন সঙ্গিনী পেলে কোথাও ভয় থাকে না।
টেপির ঘরে এসে মাধাই হকচকিয়ে গেলো। ঘরটি খুব পরিচ্ছন্ন নয়। দেয়ালের চুনবালির আস্তর এখানে-সেখানে খসে পড়েছে। কিন্তু ঘরের সস্তা আসবাবপত্র ও শয্যা-উপকরণগুলি পরিচ্ছন্ন ও নতুন এবং সেজন্য মাধাইয়ের চোখে অপূর্ব সুন্দর বলে বোধ হলো।
মাধাইকে একটা চেয়ারে বসিয়ে টেপি বললো–চা করি?
–করো।
টেপি নিজে চা করতে গেলো না। হরিদাসী বলে একজন কাকে ডেকে জল ফুটিয়ে দিতে বললো। এরকম অবস্থায় চট করে কথা পাওয়া শক্ত। পথে দাঁড়িয়ে টেপির রূপে মনে যে ঔদার্য এবং সাহসএসেছিলো সেটা এই ঘরের সংকীর্ণ পরিসরের মধ্যে ক্রমশ ম্লান হয়ে যেতে লাগলো, সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তরে এ পল্লীর উদ্দেশ্যটা কালো হয়ে উঠতে লাগলো।
টেপির মনে হলো যদি দিনের কোনো কাজ হতো এতক্ষণে মাধাই বলে ফেলতো। মাধাই তা বলেনি।
হরিদাসী একটা কেটলি করে চায়ের জল দিয়ে গেলো। মাধাইয়ের সম্মুখে চা-বিস্কুট ধরে দিয়ে টেপি বললোচা খায়ে নেও, তারপর তোমার কথা শুনবো।
