সহজে ঘুম এলো না। একফালি চাঁদ উঠলো। ছ্যাঁচার বেড়ার ফাঁকে ফাঁকে আলো এসে পড়লো। তখন সুরতুন একটা বেপরোয়া মনোভাব অবলম্বনের চেষ্টা করতে লাগলো। নিজের মুখে সে যে কাঠিন্য ফুটিয়ে তুলো সেটা তার দেখতে পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না, কিন্তু নিজের সুগঠিত পেশল বাহু দুটিকে লক্ষ্য করলো, হাতের আঙুলগুলির শক্তি যাচাই করার জন্য দুহাত কয়েকবার মুষ্টিবদ্ধ করলো।
মনটা একটু জুড়োলে একদিন সেভাবলোইয়াজের কথা। তার কথায় একটি বিচিত্র অনুভূতি হলো তার। গোঁসাইয়ের কথা পুনরাবৃত্তি করে সে বললো, জীবন কী মজাদার দ্যাখো। ফতেমা নজের অর্থ ব্যয় করে জয়নুলদের খাওয়াতো। তখন সুরো এজন্য ফতেমাকে সমালোচনা করেছে। পাছে তাদের সঙ্গে আলাপ হলে সে নিজের তহবিলে খরচ করে বসে এই আশঙ্কা থেকে সে জয়নুল-সোভানদের দেখলে অনির্দিষ্টভাবে বিরক্ত হয়েই উঠতো। অথচ ইয়াজ এলো তারই চাছে আশ্রয় ভিক্ষা করতে।
ইতিমধ্যে একদিন সুরতুনের মনে পড়লো মাধাইকে শেষ যেদিন সে দেখে ছিলো ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে, রোগা-রোগা দেখিয়েছিলো তাকে।
আর-একদিন সুরতুন টেপির মাকে বললো যে সে মোকামে যাবে। কিন্তু গেলোনা। স্টেশনে পৗঁছে এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে মাধাইয়ের খোঁজ করে বেড়াতে লাগলো সে। সারা স্টেশনে খুঁজে এমনকী ওভারব্রিজে দাঁড়িয়েও মাধাইয়ের সন্ধান না পেয়ে স্থির করলো, সে ফিরে যাবে। ওভারব্রিজের সিঁড়িটা যেখানে প্রধান প্ল্যাটফর্মে নেমেছে তার কাছেই রেলের একটা অফিস এবং তার বিপরীত দিকে মিলিটারিদের স্থাপিত ক্যান্টিনের গুদামঘর। এই দুয়ের মাঝখানে দু হাত চওড়া একটা সরু গলিপথ। এ-পথে লোক চলাচল প্রায়ই নেই। সুরতুন এই পথ ধরে স্টেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো। ঠিক এমন সময়ে দেখা হয়ে গেলো সেই গলিটার মধ্যে মাধাইয়ের সঙ্গে। সুরতুনের সাহসটার কিছু আর অবশিষ্ট ছিলো না তখন। তার মনে হতে লাগলো সারাটা সকাল সে শুধু মাধাইকেই খুঁজেছে। সে একদিকের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়লো। মাধাই ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার হাতে ছোট একটা পুঁটুলি, সম্ভবত সে বাজার করে ফিরছিলো। সুরতুনের সামনে এসে সেদাঁড়িয়ে পড়লো। দেয়ালে নিজের দেহভার ছেড়ে দিয়ে মাধাইয়ের চোখের দিকে চোখ তুলে দাঁড়ালো সুরতুন। দেয়ালে দেহভার ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিলোনা তার। পা কাপছিলো, চোখের সম্মুখে দৃশ্য জগৎবর্ণহীন হয়ে আসছিলো। তার মনে হলো মাধাই হাত বাড়িয়ে না ধরলে সে পড়ে যাবে।
মাধাইয়ের ঠোঁট নড়লো; অবশেষে সে কথা বললো, সুরতুন্নেছা? ভালো আছো?
ভালো আছি। আপনে কেমন আছো, বায়েন?
তা ভালোই।
মাধাই চট করে চলে যেতে পারলো না। সুরতুনেরও সরে যাওয়ার ক্ষমতা ছিলো না। সে যেন মাধাইয়ের কালি-পড়া চোখের দৃষ্টিতে আবদ্ধ হয়ে গেছে। সে লক্ষ্য করলো মাধাইয়ের গালের হাড় উঁচু হয়ে উঠেছে, তার চোখের কোণে কালি পড়েছে। পাট-পাট করা বড়ো বড়ো চুল ছিলো মাথায়, কানের পাশে বাবরির মতো দেখাতো। এখন চুলগুলি যেন ছোটো ছোটো করে ছাঁটা, ঘাড়ের কাছে অনেক দূর তুলে কামানো। রুক্ষ দেখাচ্ছে তাকে।
কিন্তু কথা আর এগোলো না। মাধাই চলে গেলো।
চলতে শুরু করে সুরতুন স্থির করলো আজ আর সে মোকামে যাবে না। একবার তার মনে হলো হোটেল থেকে সে খেয়ে যাবে, কিন্তু পরক্ষণেই সে স্থির করলো–তাহলে তো চলবে না। রান্না যখন করতেই হবে আজ থেকে করলেই বা দোষ কী? ভয় ও অভিমানের আড়ালে একদিন কোথায় একটা প্রতীক্ষাও লুকিয়ে ছিলো। সেটা যেন আজ মুছে গেলো। পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে নেওয়াই ভালো, এই স্থির করলো সে। টেপির মা বা গোঁসাই আপত্তি করুক কিংবা না-ই করুক, তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের হেঁসেলে ঢুকতে সংকোচ বোধ হলো। সুরতুনের। একটা হাঁড়ি, একটা ছোটো কড়া, লোহার একটা হাতা কিনে নিয়ে সে আস্তানায় ফিরবে। চাল আছে। টেপির মায়ের বাড়ির পিছনে জঙ্গলে ধুদুল দেখে এসেছে সে।
রান্না চড়িয়ে সুরতুন তার ব্যবসায়ের হিসেব নিতে বসলো। এবার ব্যবসা করতে আসার সময়ে সে আট টাকা কয়েক আনা মূলধন নিয়ে বেরিয়েছিলো। কোমরের গেঁজে খুলে বার করে খুচরো পয়সা রেজগিতে গুনে দেখলো পাঁচটা জমেছে। আঁচল খুলে নোট বার করে গুনে দেখলো সেখানেও চারটে টাকা আছে। এ কয়েকদিনের ব্যবসায় তার মূলধন তাহলে কমেনি।
ধুঁদুল তেমন তেতো ছিলো না। অনেকদিন পরে নিজের রান্না নিজে করে খেতে ভালোই লাগছিলো। টাকার হিসেবেও সে ঠকেনি। সুরতুন একটা দিবানিদ্রার ব্যবস্থা করে নিলো।
কিন্তু ঘুমোতে গিয়ে তার মনে হলো, তখন মাধাই যদি তার হাতের পুঁটুলিটা তার হাতে দিয়ে বলতে চল, তাহলে সে কি না-গিয়ে পারতো? মাধাই কি তার নিজের প্রয়োজন বোঝে না? সে তো পড়ে যাচ্ছিলো, কেন মাধাই তবে তাকে তুলে নিলো না!
২০. প্ল্যাটফর্মে কাঠের বাক্সে
প্ল্যাটফর্মে কাঠের বাক্সে রোজই সে বসে থাকে, সব সময়ে তোকজনের সঙ্গ তার ভালো লাগে না। সেদিন তেমনি বসে ছিলো মাধাই। সুরতুন ধীরে ধীরে এলো। তার মনে হয়েছিলো কিছু একটা বলা উচিত কিন্তু কথা জোগালো না। ট্রেনকে ঝাণ্ডা দেখাতে গিয়ে আবার সে দেখতে পেলো সুরতুনকে।
যেদিন রাত্রিতে সুরতুন নিখোঁজ হয়েছিলো সে রাত্রির সব কথা আবার মনে পড়লো তার।
