তারপর যাত্রা শুরু হলো। যাত্রার শুরুতে গোঁসাইয়ের হাতের গুপীযন্ত্র বুং বুং করে উঠলো দু-একবার। জয় শিবোদুর্গা রাধে।
তাদের পিছনে সকালের রোদ্দুরে ঝাঁপ টেনে খড়ের ঘর দুটি যেন প্রতীক্ষায় বসে রইলো।
কিছুদূর গিয়ে টেপির মা প্রশ্ন করলো, কও সুরো, আমাক কি ভালো দেখলা না?
সে যেন পিতৃকুলের কারো কাছে প্রশ্ন করে জানতে চায় নিজের শ্বশুরবাড়ি সম্বন্ধে মতামতটা।
রাত্রিতে যা চোখে পড়েনি এখন সুরতুন সেগুলি লক্ষ্য করলো। দুইটি শাখা রেলপথ সংযুক্ত হয়ে দিঘার কিছু দূরে যে কোণটি সৃষ্টি করেছে তার মধ্যে অবস্থিত সরকার থেকে খাস করা এবং পরে পরিত্যক্ত একটা গ্রাম এটা। গ্রামের যে অঞ্চলে বসতি ছিলো সেখানে এখন অগম্য জঙ্গল। সেই জঙ্গলে কিছু কিছু আম কাঁঠালের গাছ, কখনো দু-একটি নারকেল গাছ চোখে পড়ে। কেউ হয়তো কোনো কালে সখ করে লাগিয়েছিলো, এখন জঙ্গুলে হয়ে গেছে এমন কয়েক ঝাড় কলাগাছও দেখতে পাওয়া যায়। কলাগাছে মোচা হয়েছে, নারকেল গাছে ফল আছে। সেকালে এটা বোধ হয় গ্রামের একটা সড়ক ছিলো, এখন অনেকাংশই লতাগুল্মে আচ্ছন্ন। গ্রামের যে অংশে চাষের জমি ছিলো সেদিকে ভাটের আর বিছুটির জঙ্গল, এখানে-সেখানে ছড়ানো কয়েকটা বাবলা গাছ। এই বিস্তীর্ণ জায়গাটায় জনমানবের সাড়া নেই। দিনমানে পথটি ধরে হয়তো দু একজন লোক চলে, বিকেলের দিক থেকে নির্জন হয়ে যায়। এই নির্জনতায় টেপির মায়ের দুখানা নিচু কুঁড়ের বাড়ি।
যেতে যেতে সুরতুনের মনে হলো, কিন্তু ঘরে ছেলেপুলে থাকলে কি এরা এমন করে দুজনে বেরিয়ে পড়তে পারবে যন্ত্র হাতে করে? সে ভাবলো, যে বয়সে মেয়েরা প্রথম সন্তানবতী হয়, টেপির মায়ের সে বয়স নয় কিন্তু সন্তান ধারণের পক্ষে টেপির মাকে এখন অপটু বলেও মনে হচ্ছে না।
টেপির মা সঙ্গীকে নিয়ে অন্য গ্রামের পথ ধরলো। সুরতুন মোকামের ট্রেনের খোঁজ নেওয়ার জন্য স্টেশনের দিকে গেলো।
যে কথাটা সর্বক্ষণ মনে থাকে সেটা কিছুকালের জন্য আদৌ মনে ছিলো না কেন, ভাবলো সুরতুন। স্টেশনে যেতে তাকে কেউ বাধা দেবে না একথা ঠিক, তেমনি ঠিক যে, স্টেশনটি সরকারের, কিন্তু একথা ভুললে চলে কি করে সুরতুনের কাছে সমগ্র দিঘাটাই মাধাইয়ের। বুদ্ধি স্থির করতে তার সময় লাগলো। ওভারব্রিজটা অনেকটা উঁচু, তার রেলিংটাও মানুষকে আড়াল করে রাখে। সুরতুন স্থির করলো ওভারব্রিজ দিয়ে সে স্টেশনে ঢুকবে। তাহলে দূর থেকে মাধাইকে দেখতে পেয়ে সাবধান হওয়া যাবে।
ওভারব্রিজের তিনটে সিঁড়ি স্টেশনে নেমেছে। প্রথম সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে মাধাইকে দেখতে না পেয়ে সে যখন উৎসাহিত হয়ে নামতে যাচ্ছে স্টেশনে, ঠিক তখনই সে দেখতে পেলো রোদে পিঠ দিয়ে একটি প্যাকিং বাক্সর উপরে বসে আছে মাধাই। যেন বেড়াতে এসেছে স্টেশনের কাজকর্ম দেখতে, এমনি তার ভঙ্গি। দু-তিন ধাপ নেমেছিলো সুরতুন, মাধাইকে দেখতে পাওয়ামাত্র ফিরে দাঁড়িয়ে ওভারব্রিজের রেলিং-এর আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালো।
ঠিক এই সময়ে সুরতুনের মনে হলো–একে তো রেগে আছে মাধাই, তার উপরে এই ময়লা কাপড় আর ঝাকড়-মাকড় ময়লা চুল নিয়ে সামনে গেলে আর রক্ষা থাকবে না।
পরে ভেবেচিন্তে সে ঠিক করলো এই স্টেশন-ভর্তি লোকজনের মধ্যে মাধাই তাকে না বকতেও পারে এবং যদি গোপনে চলতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় তার চাইতে বরং মাধাইয়ের চোখের সম্মুখে চলাফেরা করাই ভালো। অন্তত সে ক্ষেত্রে সে বলতে পারবে–তোমার কাছেই তো যাচ্ছিলাম।
সুরতুন নিজের পরনের শাড়িটার আঁচল ঘুরিয়ে দু-ফেরতা করে গা ঢেকে নিলো। তারপর পা মেপে মেপে অগ্রসর হলো। মাধাইয়ের কাছাকাছি এসে সে এমন করে মাটির দিকে চাইলে যেন তার দৃষ্টি ফেরাতে হলে দু হাত দিয়ে তার মুখ তুলে ধরতে হবে। এ তো তার দৈহিক ভঙ্গি। তার মনে কিন্তু অপূর্ব একটা ব্যাপার ঘটলো। দূর থেকে যত কাছে সে যাচ্ছিলো ভয়ের ভাবটা তত বেশি পরিবর্তিত হচ্ছিলো। ব্যবধান যখন খুব বেশি নয় তখন হঠাৎ তার সেই রাত্রিটার কথা মনে পড়ে গেলো। তার সমস্ত গা রি-রি করে কেঁপে উঠলো। এবং অদ্ভুত একটা অনুভূতি এই হলো যে, মাধাইয়ে ডুবে যেতে পারলেই যেন সব ভয় এড়ানো যায়।
এই মেয়ে, তুমি কী চাও?
সুরতুন দেখলো টিকিটবাবু জানলার ওপার থেকে কথা বলছে। নিজেকেও সে লক্ষ্য করলো। টিকিট ঘরের লোহার রেলিং ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে। একখান টিকিট দেন বিরামপুরের।
কাঁপা কাঁপা আঙুলে টাকা-পয়সা গুনে মোকামের টিকিট নিয়ে সে কোনদিকে যাবে তা ভাবলো।
এবার যা সে করলো সেটা তার পূর্বতন চিন্তাধারার সমান্তরাল নয়, সমভূমিস্থ তো নয়ই। তার মনে হলো, মাধাই তাকে চিনতে পারেনি। তখন হঠাৎ তার একরকমের কষ্ট বোধ হলো। সে যা-ই হোক, ভাবলো সুরতুন, অনেকদিন পরে সে মোকামে যাচ্ছে, যাওয়ার আগে মাধাইয়ের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ানো তার কর্তব্য।
কিন্তু মাধাই সেই প্যাকিং বাক্সের উপর ছিলো না।
ট্রেন এলো। মোকামে যাওয়ার পরিচিত ট্রেন। সুরতুন একটা কামরায় উঠে যাত্রীদের পায়ের কাছে মেঝেতে বসলো। ট্রেন ছাড়লো।
ট্রেনটা যেখানে দিঘার দীর্ঘ প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে যায় সেখানে একজন লোক ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কখনো কখনো এই কাজটিতে মাধাইকে দেখা গেছে। সুরতুন জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে ছিলো। ট্রেন তখনো পুরো দমে ছুটতে শুরু করেনি। মাধাই-মাধাই। মাধাই গাড়ির দিকে চেয়ে ছিলো, তার মুখের উপরে সোজাসুজি সুরতুনের চোখ দুটি গিয়ে পড়লো। মুহূর্তের জন্য হলেও দৃষ্টি দুটি পরস্পরকে ধরার চেষ্টা করলো।
