টেপিদের পল্লী থেকে বেরিয়ে টেপির মা বললো, সুরো, তুমি কোথাও যাবা?
কনে যাই? মাধাই-পূর্ণ দিঘায় নিঃসঙ্গ হবার ভয়ে সুরতুনের মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেলো।
আজই মোকামে না যায়ে চলে না কেন আমাদের গাঁয়ে। একসাথে খাওয়াদাওয়া করবঅনে। রাত কাটায়ে তারপর যা করবের হয় কোরো।
নিমন্ত্রণ পেয়ে সুরতুন বেঁচে গেলো।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে উঁচুনিচু পথে অনেকটা সময় হেঁটে গভীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন টেপির মায়ের বাড়িতে অবশেষে পৌঁছনো যায়। একটা ছোটো শোবার ঘর, ততোধিক ছোটো একটা রান্নাঘর নিয়ে বাড়ি। তার বেশিকিছু অন্ধকারে ঠাহর হলো না।
ঘরে ঢুকে গোঁসাই দেশলাই জ্বাললো, একটা কুপি ধরিয়ে নিলো। এমন হয় যে, দিনের পর দিন দুজনের একজনও থাকে না বাড়িতে। কাছেই ছ্যাচড়া চোরের চোখে পড়তে পারে এমন কোনো সংসার করার উপাদান ঘরে নেই। শোবার ঘরের দুপাশে দুটি বাঁশের মাচা। বাঁশের খুঁটির গায়ে ঝোলা টাঙিয়ে রাখার আড়। সেই আড়ের উপরে দুখানা চট ঝুলছে। ঘরে ঢুকে টেপির মা চট টেনে নিয়ে দুটি মাচাতেই পেতে দিলো। সুরতুনকে বসতে বলে সে গোঁসাইকে বললো, তুমি ঝোলা থিকে কথা কাপড় সব বার করে বিছানা পাতো দুইখান, আমি জল নিয়ে আসি।
গোঁসাই এতক্ষণ কথা বলেনি, জল আনার প্রস্তাবে বললো, আমি থাকতি তুমি এই আন্ধারে জল আনতে যাবা, লক্ষ্মী?
যাবো আর আসবো। এই আন্ধারে তোমাকে একলা ছাড়ে দিবের পারি?
গোঁসাই আর পীড়াপীড়ি করলো না। ঝোলা থেকে দু-একখানা কথা বার করে সে মাচার উপরে বিছানো চট দুখানা যতদূর সম্ভব ঢেকে দিলো।
জল নিয়ে ফিরে এসে টেপির মা বললো, আমার দুইবার রাঁধা লাগবি, ততক্ষণ তোমরা গান করো, গল্প করো।
গোঁসাইয়ের ঝোলা থেকে বেরুলো দুটি মালসা, একটা ছোটো হাতা, চাল, ডালের একটি মোড়ক, কয়েকটি আলু-বেগুন, একটা তেলের শিশি, তরকারি কোটার ছুরি–অর্থাৎ সংসার বলতে যত কিছু সব।
সুরতুন হেসে বললো, দুনিয়া নিয়ে বেড়ান দেখি।
এরকম সংসার করায় টেপির মা যে অত্যন্ত পটু তত বোঝা গেলো। রান্নাঘরে প্রদীপের মৃদু আলোয় রান্নার জোগাড় করে নিয়ে সে ফিরে এলো। বললো, গোঁসাই, একটু কষ্ট দিবো যে। কয়খানা কলাপাতা কাটতে হবি। চলো যাই।
তুমি যাবা? সেই জঙ্গলে তোমাকে আমি যাতে দিতে পারবো না। এবার সে একটু দৃঢ়স্বরে বললো।
লোকটি ঘোর অন্ধকারে বেরিয়ে গেলো। সেই নিঃশব্দ গভীর অন্ধকারে পৃথিবীর সবই প্রায় অবলুপ্ত, তার অন্যান্য অধিবাসীরা এখানে স্মৃতিমাত্র। জোনাকির আঁকগুলি কোনো অজ্ঞাত কারণে মাটির দিকে নামছে, আবার উপরে উঠে যাচ্ছে।
গোঁসাই পাতা নিয়ে ফিরে এলে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সুরতুন বললো, সাপখোপের ভয় নাই আপনার?
সব সাপ কামড়ায় না; আর কালসাপের কথা–সে লোহার বাসরেও কামড়ায়। এরই মধ্যে একসময়ে টেপির মা এসে বললো, একটুক দেরি আছে পাকের, ততক্ষণে গোঁসাই একটা গান ধরো। গান শুনতে শুনতে কাম করি।
কিন্তু সুরতুনের অন্যরকম ইচ্ছা ছিলো, সে বললো, গোঁসাই, আপনেরা যখন দুইজনেই চলে যান তখন এ বাড়িঘর দেখে কে?
ভগোমান। কিন্তু দেখার কী বা থাকে?
তা ঠিক। যা আছে দুনিয়ায় তা আছে ঝোলায়। আপনেও কি চালের মোকামে যান?
ও কারবার আমি করি না।
টেপির মা বুঝি একা যায়?
না তো। তাক যাতে দিবের পারি কই? মনে হয় হারায়ে যাবি।
কুপির স্নান আলোয় গোঁসাইয়ের মুখের চেহারা বোঝা গেলো না।
সুরতুন বললো, সংসার তো চালাতে হয়?
পথে পথে হাঁটি। লোকে চাল দেয়, দু-একটা পয়সাও দেয়। দুজনে ভিক্ষাশিক্ষা করি। গাছতলায় চাল ফুটায়ে নিই।
তাতে কি সুখ হয়?
ছার সুখ! গোঁসাই একটা পদ সুরেলা করে আবৃত্তি করলো :
দু-দিকে দুই পাহাড়। যশোমতী পাহাড়ে শীতল বরফ, ডানদিকে ধনোবতী পাহাড়ে বাঘ ভাকোর বাস। মাঝে উপত্যকা। চাষী, জমি চাষ করতে করতে পাহাড়ে চায়ো না। কত পণ্ডিত যশোমতী পাহাড়ে বরফ-পাথর হলো, কত চাঁদবেনে ধনোবতী পাহাড়ে সাপের বিষে মরেছে। বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করো, সে যুগল পাহাড়ের সন্ধান দিবি, যুগল স্বর্ণপাহাড়। সেই পাহাড়ের মাঝে সুখ বাস করে। . সুরতুন বললো, আপনের কথা আমি বুঝবের পারি না, শুনবের ভালো লাগে। টেপির মা আহারের আয়োজন শেষ করে এদের ডাকতে এসেছিলো, সে হাসিমুখে বললো, এই দ্যাখো, তোমারও ভালো লাগতি লাগলো!
খুব সকালে উঠেও সুরতুন দেখলো টেপির মায়ের অর্ধেক কাজ শেষ হয়ে গেছে। রান্নাঘরের সামান্য দু-একখানি বাসন মেজে-ঘষে শুকোতে দিয়ে সে তখন রান্নাঘর ও উঠোন নিকোচ্ছে। টেপির মা বললো, চান করবা? পুকুরে চলো যাই।
দুজনে একসঙ্গে স্নান করে এসে সুরতুন দেখতে পেলো গোঁসাইয়ের আলখাল্লা পরা হয়ে গেছে। ভিজে চুলগুলো চূড়া করে বেঁধে তখন সে দাড়িতে গ্রন্থি দেওয়ার ব্যবস্থা করছে।
ঘরের মধ্যে তার দ্বিতীয় কাপড়টি ও একটা চটের থলি ছিলো, সেগুলির অনুসন্ধানে ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে সুরতুন দেখলো মাচা দুটি ছাড়া ঘরের মধ্যে আর কিছু নেই।
গোঁসাই বললো, এই যে বুনডি, তোমার থলে এখানে।
সুরতুন দেখলো বৈষ্ণবীর কথা ঝোলা ও গোপীযন্ত্রের পাশে তার থলিটাও গুছিয়ে রেখেছে গোঁসাই।
টেপির মাও সাজসজ্জা করে নিলো। গোঁসাইয়ের ঝোলা থেকে ছোটো একটা আয়না বের করে উঠোনের মাটিতে জল দিয়ে সামান্য একটু কাদা করে রসকলি আঁকলো সে। সুনিদ্রিত, সদ্যস্নাত প্রসন্ন টেপির মায়ের দিকে চেয়ে সুরতুনের আবার মনে হলো, এ যেন টেপিই অন্য এক সজ্জায় এখানে বসে আছে, শুধু গায়ের রংটা টেপির চাইতে মলিন আর ত্বকের এখানে সেখানে দু-একটা আঁচিল চোখে পড়ে, টেপির যা নেই।
