রোগা দেখালো মাধাইকে। চুলগুলো তেমন পাট করা নয়। পোশাক-পরিচ্ছদ যেন কেমন ঝুলঝুলে। রোগা দেখালো মাধাইকে!
সুরতুনের বসবার জায়গাটা ঠিক হয়নি। নিকটতম যাত্রীটি অনবরত পা দোলাচ্ছিলো, আর যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে কখনো তার হাত কখনো তার হাঁটুটা সুরতুনের গায়ে লাগছিলো। সুরতুন উঠে গিয়ে একটা জানলার কাছে দাঁড়ালো। সেই জানলাটায় মলিন চেহারা ও ময়লা কাপড়পরা চার-পাঁচটি মেয়ে নিশ্বাস নিচ্ছিলো।
ট্রেনের ভদ্ৰব্যক্তিরা সুরতুন এবং তার কাছে দাঁড়িয়ে-থাকা স্ত্রীলোককটিকে নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। তারা সকলেই এই এক বিষয়ে একমত যে এরা টিকিট কাটেনা, চালের চোরাচালান করে এবং এদের জন্য গাড়িতে চড়া আজকাল অসম্ভব হয়ে উঠেছে। চালের এমনি চালান উচিত কিংবা অন্যায়, এ নিয়েও তারা আলোচনা করলো। তারপর তারা আলোচনা শুরু করলো, একজন মেয়েছেলের পক্ষে কতটা চাল লুকিয়ে নেওয়া সম্ভব। এরপরে আলোচনাটা স্বাভাবিকভাবেই এদের অন্তর্বাসের গবেষণায় পরিণত হলো। এমন আলাপ প্রতিবারই যাত্রীরা করে, তবে এবার কল্পনার আতিশয্য দেখা দিয়েছে। বিব্রত হয়ে স্ত্রীলোক কটি যাত্রীদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালোলা।
মনটা একটু থিতুলে সুরতুন ভাবলো : টিকিট কেটে এ ব্যবসা চলে না। ভদ্রলোকরা ঠিকই বলেছে, টিকিটের টাকা চালের লাভ থেকে বাদ দিলে কিছুই থাকে না। গ্রামে বসে যখন মোকামে যাওয়ার কথা ভাবতো তখনই সে স্থির করেছিলো টিকিট কেটে যদি সে যাওয়া-আসা করে তবে বোধ হয় মাধাইয়ের সাহায্য ছাড়াও চলতে পারে। এই চিন্তাটাই প্রচ্ছন্ন থেকে তাকে টিকিট কিনিয়েছিলো। টিকিট কেটে গাড়িতে উঠে খানিকটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধও হচ্ছিলো। হিসাবের কথাটা উঠতে এখন সে বুঝতে পারলো টিকিট কেনাটা চলবে না।
সুরতুন তার পাশের মেয়েটিকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো, মোকামে চাল কত?
উনিশ।
এখানে কতকে?
পঁচিশ।
সুরতুন আঙুলে গুনে গুনে হিসাব করলো–উনিশে পঁচিশে ছয়। ছয় আধে তিন। পনেরো সেরে দুই টাকার কিছু উপরে। ভাড়ার টাকা ওঠে, খাবে কী?
পরের দিন সকালে, মোকাম থেকে চাল নিয়ে ফিরে সুরতুন তার পুরনো মহাজনের কাছে গেলো। চাল নিবা গো?
কতকে?
পঁচিশ।
দূর বিটি। মোকামে উনিশ, এখানে না হয় বাইশ হবি।
তাইলে খুচরা বেচবো।
সুরতুন দিঘার বাজারের একান্তে গামছা বিছিয়ে চাল বিক্রি করতে বসলো। কিন্তু আগেকার মতো লোকের যেন চালের উপরে টান নেই। সুরতুন খোঁজ করতে গিয়ে দেখলো গ্রামের দিক থেকেও চাল আসছে। লোকে সেই মোটা চালই সস্তায় নিচ্ছে।
চাল বিক্রি করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো, কিন্তু জেদ করে পঁচিশের এক পয়সা নিচে সে নামলো না। বাজারের কলে মাথাটা ধুয়ে আহারের চেষ্টায় এদিক ওদিক ঘুরতে লাগলো সে। মাধাই আর তার নেই যে সেখানে গিয়ে রান্না চাপাবে। কাল সারাদিন, আজ এখন পর্যন্ত ভাত খায়নি সে। ভাতের খোঁজে সে হোটেলে ঘুরলো, কিন্তু প্রায় সকলেই এমন দামের কথা বললো যে শুনে সে হাসবে কি কাদবে বুঝতে পারলো না। একটা বিহারি চা-ওয়ালার দোকান থেকে সেঁকা রুটি আর টকো ডাল খেয়ে আঁজলা পুরে পুরে জল পান করে সুরতুন স্টেশনের বাইরের মালগুদামের কাছে বসে পড়লো। এখন সে কী করবে? আশ্রয়?
স্টেশনে থাকা যায় সারাদিন সারারাত, কিন্তু তা শুধু জেগে থাকা, বসে থাকা, সতর্ক হয়ে। স্টেশনের উপরেই অনেকের অনেক বিপদ ঘটেছে। গত রাত্রিতে ঘুমনো হয়নি বলে ঘুমনোর জন্য আজ গ্রামে ফেরা যায় না। তাহলে ব্যবসা হয় না। আজও কি সে টেপির মায়ের বাড়িতে গিয়ে তাদের কাছে নির্লজ্জের মতো বলবে–আজও এলাম। তার চাইতে মাধাইয়ের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করা ভালো নয়? তুমি আমাকে আবার ঘরে থাকতে দাও, হয় হোক, যা হয় হোক–এই বলে মাধাইয়ের দুখানা পা জড়িয়ে ধরবে? গ্রামে থাকতে আর একদিন এমনি সাহসী হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা সে করেছিলো। এই সময়ে তার মনে হলো কত সস্নেহ ব্যবহারই না ছিলো মাধাইয়ের।
নিরুপায়ের মতো অন্ধকারে পথ ঠাহর করতে করতে টেপির মায়ের বাড়ির কাছাকাছি এসে সে লক্ষ্য করলো একটা আলো যেন জ্বলছে কিন্তু সেটা যে জোনাকি নয় তা নিশ্চিত বলা যায় না। সে দাঁড়িয়ে পড়লো, তাহলে সে কি ফিরে যাবে? পিছনের দিকে চাইলো সে। বিপদ যত পেছন থেকেই আসে। মুহূর্তে সেই নির্জনতা অসংখ্য অদৃশ্য অস্তিত্বে কিলবিল করে উঠলো। মহাবিপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য একদিন এক নির্জন কুটিরে রাত কাটিয়েছিলো সে; সে সময়ে তার মোহাবস্থা ছিলো। ভয়ে এখন তার গা ঘামতে শুরু করলো। একদা সে পতিত গোরস্তানের পথে যাওয়া-আসা করেছে, মনের সে অবস্থাও তার আর নেই। মাধাইয়ের ভয় যেন তার অর্জিত সাহসের মূল-দেশটাকেই শিথিল করে শৈশবের ভয়শীলতায় পৌঁছে দিয়েছে।
এখানে তবু একটা কুটির আছে এই মনে করে একদৌড়ে সে টেপির মায়ের আঙিনায় গিয়ে দাঁড়ালো।
শুকনো পাতায় পায়ের শব্দ হতেই গোঁসাই বললো, কে ভাই? মানুষ যদি তাহলি আসো। গোঁসাই যেন তারই প্রতীক্ষা করছিলো সুরতুকে দেখতে পেয়ে এমন ভঙ্গিতে সে স্বাগত করলো।
সুরতুন ঘরে ঢুকে দেখলো, এদিকে মাচায় বসে গোঁসাই তামাক খাওয়ার ব্যবস্থা করছে, ওদিকের মাচায় টেপির মা ঘুমুচ্ছে গুটিসুটি হয়ে। তার শোওয়ার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে সে যেন অত্যন্ত ছেলেমানুষ কেউ।
