পরদিন চিকন্দিতে কাজ ছিলো বলেও বটে, পরিচিত কণ্ঠস্বরটির অনুসন্ধানের জন্যও বটে, সুরতুন অত্যন্ত সকালে চিকন্দির পথ ধরেছিলো।
সুরতুন ঠিকই আন্দাজ করেছিলো, লোকটি টেপির মা-ই বটে। কিন্তু দিনের আলোয় এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার খটকা লাগছে। টেপির মা ঠোঁট টিপে না হাসলে বোধ হয় সে সাহস করে ডাকতেও পারতো না। টেপির মায়ের পরনে গেরুয়া রঙের ধুতি, তার সেই কদম ফুলের মতো করে ছাঁটা চুলগুলি যাতে সে পুরুষদের মতো করে গামছা জড়াতে সেগুলি বেড়ে বেড়ে কাঁধের উপরে থলোথলো হয়ে লুটোচ্ছে। নাকের উপরে রসকলি। সুরতুন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। শুধু বেশভূষায় নয়, টেপির মা দেহের দিকেও যেন নারীত্বের পানে কয়েক পা ফিরে এসেছে।
টেপির মা বললো, এই গাঁয়ে থাকিস? দিঘায় আসছিলাম, সেখানে শুনলাম মচ্ছোবের কথা।
একাই আলে?
না। গোঁসাইও আইছে।
গোঁসাই?
টেপির ধম্মবাপ।
এবার মনে পড়লো সুরতুনের, কথায় কথায় টেপি এমনি একটা সংবাদ দিয়েছিলো বটে। ওরা কথা বলতে বলতে টেপির ধর্মপিতা বেরিয়ে এলো। পিঠের উপরে মাঝারি গোছের কন্থা ঝোলা, হাতে গোপীযন্ত্র, পায়ে পিতলের ঘুঙুর। অত্যন্ত কৌতূহলে যেটুকু সাহস হয় তারই সাহায্যে সুরতুন গোঁসাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে দেখলো। একমুখ কাঁচাপাকা লম্বা দাড়ি, সেগুলি চিবুকের নিচে একটা গ্রন্থিতে আবদ্ধ হয়ে দুলছে। মাথার চুলগুলি চূড়া করে বাঁধা। মুখের দৃশ্যমান অংশ বসন্তের চিহ্নলাঞ্ছিত। সে যখন কথা বললো, দেখা গেলো তার মুখের সম্মুখে একটা দাঁত নেই।
গোঁসাই এলে টেপির মা বললো, ভালোই হলো দেখা হলো। আমরা এখন আবার হাঁটতে লাগবো। সানিকদিয়ার যাবো।
দিঘায় ফিরবা না?
কাল এমন বেলায়।
বুধেভাঙা হয়ে যাবা? তাইলে তাই যায়গা, ফতেমার সঙ্গেও দেখা হবি।
সেদিনটার প্রায় সমস্তক্ষণই সুরতুন চিন্তা করলো। সন্ধ্যার পর ফতেমার সঙ্গে টেপিকে নিয়ে আলোচনা করলো। ফতেমাও বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে শুনলো। তারপর তারা দুজনে মিলে টেপির মায়ের প্রকৃত বয়স কত হতে পারে তাই নিয়ে আলোচনা করলো।
রাত্রিতে বিছানায় শুয়ে অবশেষে সুরতুন বললো, কে ভাবি–
কী কস?
চলো না কে, টেপির মায়ের সঙ্গে আবার দিঘায় যাই।
দিঘার পথ কি তোমার অজানা?
গাঁয়ে থাকেই বা কী করি?
যাও তাইলে।
পরদিন সকালে টেপির মা তার গোঁসাইকে নিয়ে বুধেভাঙার পথ দিয়ে যাচ্ছিলো, সুরতুন দেখতে পেয়ে তাদের ডেকে আনলো ফতেমার বাড়িতে। সেখানে পারস্পরিক কুশল প্রশ্নের ছলে কিছুটা কথাবার্তা হলো। একসময়ে ফতেমা হেসে হেসে গোঁসাইয়ের কাছে গান শুনতে চাইলো। একতারা বাজিয়ে নাচের ভঙ্গিতে উর্ধ্বাঙ্গ গতিশীল করে গোঁসাই গান শোনালো। দেহতত্ত্বের গান। অর্থ সবটুকু বোঝা যায় না, কিন্তু শুনলে লজ্জার মতো বোধ হয়।
ফতেমার কাছেবিদায় নিয়ে টেপির মা যখন দিঘায় যাবার জন্য প্রস্তুত হলো সুরতুন বললো, দাঁড়াও, আমি আসি।
গোঁসাই আগে আগে, পিছনে পাশাপাশি টেপির মা আর সুরতুন। মাধাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে প্রথম ধাক্কাটায় টেপির মায়ের পিছনে আত্মগোপন করা যাবে এ সময়ে এই কি ভেবেছিলো সুরতুন?
খানিকটা চলার পর টেপির মা জিজ্ঞাসা করলো, সুরো, আমার গোঁসাইয়েক দেখলা, পছন্দ হয়?
ভালোই হইছে, তুমি কি আগেই চিনতা ওনাক?
না। ও তো মোকামের লোক। চালের মোকামে এক আখড়ায় থাকতো। একদিন পথে আলাপ হইছিলো। তারপর মোকামে একদিন জ্বর হইছিলো আমার। জ্বর নিয়ে গাছতলায় শুয়ে আছি, দেখি ও যায় পথ দিয়ে। কলাম বাবাজি, শোনেন একটু, দিঘার গাড়িতে বসায়ে দিবেন?
তারপরই তোমার হলো? তাতে কি হয়। তারপর যখন দেখা হলো, দেখা কবেহবি ঠিকঠাক করে রাখছিলাম। ততদিনে নিজেও ঠিক হলাম। গিরিমাটি কিনছিলাম, কাপড় রাঙালাম। চুল কাটলাম না, তেল দিয়ে জল দিয়ে আট পয়সার এক কাকই কিনে পাট পাট করলাম। তারপর দেখা হলো।
দিঘার কাছাকাছি এসে সুরতুন ভাবলো মাধাইয়ের সঙ্গে দেখা না হয় এমনি একটা পথ দিয়ে চলা উচিত, কিন্তু কীভাবে প্রস্তাবটা উত্থাপন করা যায় ভেবে পেলো না। টেপির মা বললো, চলো, সুরো, টেপিক দেখে যাই।
এটা এমন এক পল্লী যেখানে অন্য শ্রেণীর মেয়েরা আসে না। গেরুয়াপরা বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী দেখে মেয়েরা বেরিয়ে এসে ভিক্ষাও দিতে চাইলো। তখন টেপির মা টেপির কথা জিজ্ঞাসা করলো। টেপির কথা শুনে টেপির পরিচিত দু’একজন আগ্রহ করে কাছে এসেদাঁড়ালো। একজন বলেই ফেলো, তাইলে তোমরা টেপির খোঁজে আসছো?
সে কনে গেছে, এখানেই তো থাকতো।
পালাইছে।
সে কী! কনে গেলো?
কোথায় গেলো পালিয়ে এ যদি বলাই যাবে তবে আর পালানো হলো কী।
মেয়ের খবর না পেয়ে টেপির মায়ের মনটা ভার হয়েছিলো, সে আবার হাঁটতে লাগলো। কিন্তু পল্লীর একটা অপেক্ষাকৃত কমবয়সী মেয়ে দোকানে যাওয়ার ছল করে এদের পিছন পিছন
আসছিলো। মোড়ের দোকানটার সম্মুখে দাঁড়িয়ে মেয়েটি টেপির মাকে ডাকলো।
শোনো!
কিছু বলবা?
মেয়েটি চারিদিকে চেয়ে দেখে ফিসফিস করে বললো, সেই চেকারবাবুই টেপিক গাড়িতে উঠায়ে নিছে।
সেই চেকারবাবুর সঙ্গেই গিছে তাইলে?
মনে কয়। সেই চেকারবাবুর বউ নাকি মরছে। এক ছাওয়াল আছে, তাক মানুষ করতে হবি।
এত জানো তবে আগে কও নাই কেন?
টেপি কয়ে গেছে, মাকে কয়য়া, আর কাউকে কয়োনা। তাই দেখলাম তোমারা তার আপন লোক কিনা।
