নিমন্ত্রণ ভোজ প্রভৃতির তুলনা দিয়ে ব্যাপারটাকে বোঝা যাবেনা, এ আহার নয়। একটি উদ্দাম জীবনভোগ বললে কাছাকাছি বলা হয়। ডাল ভাত দিতে দিতে ছিদাম-মুঙ্লাদের গাল বেয়ে যখন ঘাম পড়ছে তখন বেরুলো তরকারির ঘর থেকে লোক, তাদের পেছনে দিগন্তে রামচন্দ্রর খবরদারিতে মালপোয়া আর পায়েসের দল।
ওদিকে কীর্তনও উদ্বেল হয়ে উঠলো। কেষ্টদাসের গলায় ফুলের মালা, মাথায় ফুলের মালা, সে নবাগত কীর্তনের দলগুলিকে বিষ্ণুপূজার নির্মাল্য বিতরণ করছে।
দুপুর একটু গড়িয়ে যেতে লোকারণ্যে বাগিচার গাছগুলির কাণ্ড অদৃশ্য হয়ে গেলো। সহস্র কণ্ঠে উৎসারিত নামকীর্তন কালবৈশাখীর গর্জনকে ডুবিয়ে দেওয়ার পক্ষেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে উঠলো। তবু নতুন নতুন লোক আসছে। কণ্ঠের বালাই নেই, সুর-তান-লয় এই প্রবল স্বননে অর্থহীন। যেন কোনো এক নতুন জগৎ থেকে নিশ্বাস নেওয়ার নতুন বাতাস এসেছে, প্রাণপণে সে দুর্লভ্যকে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছে প্রত্যেকে।
ভোজের মহল্লাতে আনন্দের উচ্ছ্বাস সমুদ্রতরঙ্গের মতো ভেঙে ভেঙে পড়ছে। প্রত্যেকটি ভোজ্যদ্রব্য যেন এক-একটি রাজ্যলাভ। পরিবেশকরা হুংকার দিচ্ছে পরিবেশন করতে করতে, যারা খেতে বসেছে তারা জ’কার দিয়ে উঠছে।
বিকেলের দিকে সান্যালমশাই এলেন। রামচন্দ্র তাঁকে দেখতে পেয়ে পরিবেশনের মাঝখানে থেমে গর্জন করে উঠলো, রাজো রাজোধিরাজ। সহস্রাধিক কণ্ঠে বজ্রের মতো ফেটে পড়লো, জয়!
সান্যালমশাই ফিরে দাঁড়ালেন হাসিমুখে, তার চোখের কোনায় কোনায় জল এসে গেলো। কিন্তু কীর্তনের আসরে পৌঁছুতে বেগ পেতে হলো তাকে। চৈতন্য সাহা পথ করে দেওয়ার চেষ্টা করছিলো, কেষ্টদাসও তাকে দেখতে পেয়ে যত্ন করে রাখা নির্মাল্যের মালাগাছি পৌঁছে দিতে গেলো। কিন্তু চৈতন্য সাহা জনসমুদ্রে তলিয়ে গেলো, কেষ্টদাসও তার দিকে এগিয়ে যেতে পারলো না, বাইরের চাপে আবার কীর্তনের আসরেই পৌঁছে গেলো।
মহোৎসবের স্বরূপটা রূপুর জানা ছিলো না। তার পড়ার ঘরের ব্যালকনি থেকে দেখা না গেলেও পুরনো মহলের আলসে-দেওয়া ছাদে দাঁড়িয়ে বাগানটা দেখা যায়। কোলাহলের দিকটা আন্দাজ করে সে ছাদে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলো এবং মনসা ও সুমিতিকে ডেকে এনেছিলো। সুমিতিও এর আগে এ ব্যাপার কোনোদিন দ্যাখেনি।
মনসা বললো, ভালো কথায় একে মহোৎসব বলার চেষ্টা করতে পারে বটে, এর প্রকৃত নাম কিন্তু মচ্ছোব। লক্ষ্য করে দ্যাখো এখানে এদের অস্পৃশ্যতা বলে কিছু নেই। শ্রীক্ষেত্রে নাকি
সব জাত এক হয়ে যায়; এখানে একটা সাময়িক শ্রীক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
রূপু বললো, দিদি, এদের দেখে মনে হচ্ছে, রোগ-তাপ অভাব-অভিযোগ কারো কিছু নেই।
তাই হচ্ছে। তুই এখন বড়ো হয়েছিস, নিচে গিয়ে দেখে আয়। দাদা থাকলে দেখতিস পরিবেশনে লেগে গেছেন।
রূপু তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো।
মনসা বললো, এ যে দেখছি, জ্যাঠামশাই! ওই দ্যাখো বউদি, যাবে নাকি?
কিন্তু মনসার প্রস্তাবটা শেষ হবার আগেই জনতার জয়নাদে চতুর্দিক কাঁপতে লাগলো।
সুমিতি ভীতকণ্ঠে বললো, কী হলো, মনসা?
মনসা বললো, হুংকার দিচ্ছে।
দুজনে নীরবে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা অনুভব করতে লাগলো।
সুমিতি বললো, মণি, এমন উদ্দাম সংগঠন, সমবায় কাজের এমন প্রয়াস যদি ঠিক পথে চালিত হতো, কত কী না সম্ভব ছিলো এদের পক্ষে!
তুমি কি রাজনীতির কথা বলছো?
রাজনীতি কিংবা অর্থনীতি যা-ই বলো।
কিন্তু এইবা মন্দ পথ কী? সহসা মনসার কণ্ঠস্বর গম্ভীর হলো। সে বললো, তুমি নিশ্চয়ই আমার চাইতে বেশি জানো, বউদি, এমন একটি কীর্তনমুখর জনতার চাপে পড়ে চাঁদকাজি তার অত্যাচারের পথ ছেড়ে এসেছিলো। আমি কিছু জানি না, মাস্টারমশাইয়ের মুখে শুনেছি সে কালটার গর্ভে নিষিক্ত ছিলো গণসংযোগের বীজ। তারপরও মনসা যা বলে গেলো তার মর্ম উদ্ধার করলে এইরকম শোনায় : বাংলার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের আবহাওয়ায় পড়ে যুদ্ধ-শিশুদের মতো জাতিগোত্রহীন হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিত্বশালী কেউ যদি শিবের উপাসনা করতে চেয়েছে তার মধুকর গেছে তলিয়ে, লোহার বাসরে কালনাগ প্রবেশ করেছে। বিশ্বজননীর রূপকঙ্কালময়ী। ভালো না বাসো, ভক্তি না করো, ভয়ে মাথা লুটিয়ে রাখো, এই যেন সেকালের দাবি। কিন্তু মানুষ কখনো অন্য কারো মনের খাঁচায় দীর্ঘকাল আবদ্ধ থাকতে পারে না। সমাজমানসের অতি ধীর পরিবর্তন যা অনন্তশয্যায় পার্শ্ব-পরিবর্তনের মতো অদৃশ্য কিন্তু অনিবার্য, তারই লক্ষণ দেখা দিতে লাগলো। নির্ভীক সাধারণ মানুষের ভয়ের মোহ দূর করার জন্য বহু চিন্তাধারার ঘাত-প্রতিঘাতে ও প্রতিযোগিতায় সৃষ্ট একটি প্রতিযোগিতার-অতীত অসাধারণ মানসের প্রয়োজন ছিলো। শ্রীচৈতন্য এলেন।
সুমিতি চুপ করে ছিলো। তার নীরবতায় লজ্জিত হয়ে মনসা থেমে গেলো। তার চোখ দুটি একটা নীরব হাসিতে টলটল করে উঠলো, সে বললো, খুব বকিয়ে নিলে, বউদি।
সুমিতি বললো, কিন্তু সে যুগের অত আয়োজন যদি অন্য পথে যেতে বাঙালির রাজনৈতিক জীবন হয়তোবা মার খেতো না।
মনসা বললো, বউদি, সেযুগে অন্য কিছু একটা ছিলো। দেখতে পাচ্ছো না, যদুরা জালালুদ্দিনের রূপ নিচ্ছে! নিমাই চৈতন্য থেকে গেলো, অন্যদিকে হুসেন শার সৃষ্টি হলো, সেই কি ভালো নয়! এবং এটাই একটা প্রমাণ যেন হুসেন শা কিছুটাবা প্রজা-নির্বাচিত। তোমার কথায় এখন মনে হচ্ছে, হুসেন শা যদি তখনকার বাংলার সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের তাগিদের সঙ্গে পানা-মিলিয়ে চলতো, যেমন হয়েছিলো তা না-হয়ে, হয়তোবা কৃষ্ণের কংসনিসূদন মূর্তি প্রকাশ পেতো।
