এরপরে এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে তর্কের মতো শোনাবে মনে করে সুমিতি নীরব হয়ে রইলো, কিন্তু চিন্তা করলো–পাঁচশ বছর আগে জনমানসের আত্মপ্রকাশের যা অবলম্বন ছিলো আজও সেটাকেই অনুরূপভাবে গ্রহণ করা যায় কিনা! এই আজগুবির দেশ ভারতবর্ষে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে বিতাড়িত হয়ে এসে দেবতা রাষ্ট্রশক্তির পরিচালক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। মনসা যেমন প্রবঞ্চিত, সেটা কি তেমন আর একটি প্রবঞ্চনাই মাত্র!
কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মনসার চোখেমুখে তার সদাচঞ্চল প্রাণের ছায়া পড়লো; সে বললো, ভাই বউদি, ওদের তৈরি মালপোয়া খেতে খুব লোভ হচ্ছে যে।
সে কী! এ সময়ে এমন লোভ তো ভালো নয়। কাউকে পাঠিয়ে দেবো?
মনসা যেন প্রস্তাবটার সবদিকে চিন্তা করলো এমন ভান করে সে বললো, না, ভাই। তারা আবার তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ, এসব বাবোমিশেলি বারোয়ারি ব্যাপার পছন্দ করেন না। তার চাইতে রায়ের জঙ্গলে একটা চড়ুইভাতির ব্যবস্থা করো। আর তা যদি তোমার পছন্দ না হয় বিলমহলে চলো।
একটা শর্ত আছে, আমার ননদাইকে যদি আনিয়ে নাও।
সে ভদ্রলোক শিকারী হিসেবে ভালো বটে, কিন্তু বিনা নিমন্ত্রণে শ্বশুরবাড়ি আসতে পারছেন না।
তুমি একজন লোক ঠিক করে দিয়ো, আমন্ত্রণ নিয়ে যাবে। কিন্তু একটা আশ্চর্য ব্যাপার প্রত্যক্ষ করো। এরা করে মহোৎসব, যার প্রাণ হচ্ছে নামকীর্তন, আর তোমাদের বেলায় প্রাণীহত্যা আর জলক্রীড়া।
কী সর্বনাশ! কপট ত্রাসে বললো মনসা, এই পাদরির রোগ হলো তোমার, এ যে বড়ো ছোঁয়াচে।
সুমিতি গাম্ভীর্য রাখতে পারলো না। সে বললো, তোমার চড়ুইভাতির অনুপ্রেরণা যে মালপোর সুপ্ত লোভ, এ জানতে পারলে কি তোমার শাক্ত পুরুষটি রাজী হবেন?
তা ওঁরা হন। সুরা এবং অন্যান্য কী কী ব্যাপারে নাম পালটে দিলে ওঁদের আপত্তি থাকে না।
খানিকটা হাসাহাসির পরে মনসা বিদায় নিলো।
সে চলে গেলে সুমিতি চৈতন্যের সময়ের আরও কিছু খবর নেবার জন্য সদানন্দর কাছে বই চেয়ে পাঠালো। একসময়ে সে চিন্তা করলো, চৈতন্যের পরেও দেখা গেছে, যে আবহাওয়া শিবাজীকে সৃষ্টি করে, সেটাই আবার রামদাস স্বামীকে উদ্বুদ্ধ করে। রাজা রামমোহন কেন মোহনদাস গান্ধি হলেন না, এটা শুধু কালকে বিশ্লেষণ করলেই কি জানা যাবে?
কিন্তু জীবন্ত মানুষের দাবি ঐতিহাসিক প্রাণীদের চাইতে বলশালী। সুমিতি সেইদিনই অন্য আর-এক সময়ে চিন্তা করলো মনসার কথা। সে এই প্রাসাদের বহু আশ্রিতের ভিড়ে হারিয়ে যায়নি, এখন সে শীর্ষস্থানীয়দের একজন, অনসূয়ার কন্যার অধিক। সান্যালমশাইয়ের পুঁথিঘর এবং সদানন্দ মাস্টারের সঞ্চিত জ্ঞান থেকে মনসা নিজের খেয়ালখুশি মতো যা আহরণ করেছে তার পরিমাণ কমনয়। মনসার এই পরিবর্তনে তার মনীষা কতটা সাহায্য করেছে তা ভেবে দেখার মতো।
বিস্মিত হতে হয় এই ভেবে যে, তার জীবনের গতি কোথাও আবর্তসংকুল হয়ে ওঠেনি, যদিও তেমনটি ঘটবার যোগ ছিলো। তার নিজের ভাষায় তার জীবনে একসময়ে উত্তাপের সঞ্চার হয়েছিলো।
কী পেলো মনসা এই জীবনে–পাব্ৰিত্য? তার মতো একটি রমণীর হৃদয়ের একটি কোণ একটি সাধারণ পুরুষের পক্ষে নিখিলভুবন। আত্মত্যাগের মহিমা?দূর করো। ঋণাত্মক কিছু নিয়ে যে নিজেকে ধন্য মনে করে তার চোখ দুটিতে অত বিদ্যুজ্জ্বালা থাকে না।
তখন সুমিতির মনেহলো গড় শ্রীখণ্ডর এই পরিবেশ, যাতে পঞ্চদশ শতক ক্ষণকালের জন্যও স্বপ্রতিষ্ঠ হতে পারে যে-কোনো একটি সাধারণ দিনে, এর সঙ্গে মনসার যেন কোথায় একটি ঐক্য আছে।
কিংবা, সুমিতি ভাবলো, গগ্যার তুলনায় কি মনসার নিজের জীবনও বোঝা যায়। সে মেয়েদের শরীর আর মনের বিপ্লবের কথা বলেছিলো বটে।শহর থেকে দূরে বলে যাকে অন্ধকার মনে হয় তেমন এক গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে কি সে সৃষ্টিশীল কিছু করছে গর্গার মতো! তা হলে তো তার জীবনটাকেই একটা কাব্য বলতে হয়, যে কাব্য দুঃখ, সুখ, ভালোবাসা, অপ্রেমের দ্বন্দ্বে সংঘাতে তারই রচনা।
১৯. সুরতুন পথের ধুলোয় বসে
সুরতুন পথের ধুলোয় বসে মুঠি মুঠি ধুলো তুলে মাথায় দেয়নি, শাড়ির পাড় ছিঁড়ে ফেলে তাকে যোগিনী সাজতেও হয়নি। মাধাইয়ের কাছ থেকে পালিয়ে আসার একমাস কালের মধ্যে স্নানের অভাবে, বস্ত্রের অভাবে, মাটির আরও কাছাকাছি সুরতুন আর-দশজন ভূমিজার সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে।
এমন একসময় ছিলো যখন বর্তমানের ক্ষুধার দংশন এত সন্নিকট ও প্রবল ছিলো যে, ভবিষ্যতের চিন্তা করা একরকমের অর্থহীন কল্পনাবিলাস বলে বোধ হতো। তার সেসব দিনের তুলনায় তার চালের কারবারের দিনকে সুদিনই বলতে হবে। এখন সে ভাবতে শিখেছে। কাজেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাধাই-ত্রাসটা কমে গেলে তার মনে প্রশ্ন উঠলো, এরপরে সে কী করবে। আউস উঠেছে। ধানভানার কাজে সে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু চিকন্দির চাষীরা আগের তুলনায় হিসেবী বেশি হয়েছে, তাদের আহ্বাদী বউ-ঝিরাও এবার নিজেরাই ধান ভানছে। এর জন্য চৈতন্য সাহার ঋণের বোঝা কতখানি দায়ী তা অবশ্য সুরতুনের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
তার ফলে তার সঞ্চিত টাকায় হাত পড়েছে, এবং এ ব্যাপারটাই তাকে অস্থির করে তুলো আবার। দু’একদিন গাঁইগুই করে একদিন সে ফতেমাকে স্পষ্ট করে বলে ফেলো, ভাবি, তুমি যেন, গাছের মতো শিকড় ছাড়ে দিছে; মোকাম কাক কয় জানো? গাড়িতে আবার কোনোদিন চড়বা কি চড়বা না?
