এবার তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল সুখচরের চৌধুরীবাবুদের কাছারি-বাড়িতে।
বিধু সরকারের সঙ্গে গিয়েছিল মধুসূদন। তল্পী-তল্পার হিসেব রাখতে হবে। বোকা মাল নিয়ে গেলে চলবে না। আদায় পত্তোর কি যাকে তাকে দিয়ে হয়। বাবুরা না হয় যান না, তাদের সময় কোথায়? কিন্তু প্রজারা হলো জাত বদমাইস। হাজার থাকুক, কাছারিতে এসে কান্নাকাটি করা তাদের স্বভাব। এমন এমন বদ লোকও আছে যারা পেয়াদা পাঠালে কথাই বলে না। বলে— যাও যাও পেয়াদার পো, আমরা পাচ্ছিনে খেতে-জমিদার পুত্তরের বিয়েতে নজর পাঠাবো!!
বিধু সরকার ফিরে এসে বললে—সে সুখচর আর নেই হুজুর, হুজুরের ঘুমের ব্যাঘাত হবে বলে সেবার বেটারা রাত জেগে ডোবার ধারে সারা রাত ব্যাং তাড়িয়েছিল—মনে আছে আপনার?
আর সেই যেবার রাজাবাহাদুর গিয়েছিলেন দোলের সময়, মালোপাড়ার সর্দার নিজে এসে হুজুরের পা ধুইয়ে দিয়েছিল—শুনেছেন সব আপনি মেজবাবু—এখন বলে কিনা জমিদার হলো বাপের মতন, বিপদে আপদে না দেখলে তুমি আমার কিসের জমিদার–বাপ হলেও তো তেমন খেতে দেয় না ছেলেরা।
কথাগুলো মেজবাবুর ভালো লাগেনি।
ঠিক ছুটুকবাবুর বিয়ে না হলে ঘটনাটা অন্য রকম ভাবে মোড় নিতো।
কথাটা ছুটুকবাবুর কানেও গেল।
বাড়ি-বাড়ি নেমন্তন্ন করতে যাওয়ার সময় একটা করে ধুতি, আট পণ সুপুরি আর একথালা সন্দেশ—এই দেবার রীতি। চিরকাল ধরে এমনি চলে আসছে। পুরোনো খেরো খাতায় এর রেকর্ড আছে। রূপলাল ঠাকুরের কত পাওনা, দানসামগ্রী কত, চাকর-ঝিদের পাওনাগণ্ডা সমস্ত হিসেব বাঁধা ছক কাটা আছে।
কিন্তু এবার যেন একটু ত্রুটি হলো সব জিনিষে। একখানা ধুতি বা আট পণ সুপুরি গেল, একথালা করে সন্দেশও দেওয়া হলো আট শ’ তিরানব্বই ঘরে। কিন্তু সন্দেশ চিনির পাকের। ধুতিটা কিছু নিরেশ। সুপুরি কিছু পরিমাণ দাগী।
তা হোক, তবু সবাই এসেছে। বাইরে থেকে কিছু বোঝবার জো নেই। রহমত উল্লা তোড়ির সুরে সমস্ত বৌবাজার কেন সমস্ত কলকাতাটা যেন মাতিয়ে তুললে। সে ক’দিন খেতে খেতে ঘুমোতে ঘুমোতে সর্বক্ষণ যেন নেশার ঘোর লেগে রইল। নহবৎএর সঙ্গে ভুগি তবলার সঙ্গত আর সঙ্গে খঞ্জনী। কাজে অকাজে যেন ভুল হতে লাগলো সবার। মেজবাবু ভুলে গেলেন মালোপাড়ার সর্দারের অপমান। অনুষ্ঠানের ত্রুটির কথা ভুলে গেল ছুটুকবাবু। সন্ধ্যেবেলা জম-জমাট হয়ে উঠলো বড়বাড়ি।
ভূতনাথ আবার পেছন থেকে ডাকলো-ননী—
ননীলালের তখন যাবার পালা। কনে দেখা হয়ে গিয়েছে। প্রকাণ্ড একটা হাজার বারো শ’ টাকা দামের খোকা পুতুল উপহার দিয়েছে চুড়ামণির বৌকে। খোদ প্যারিস থেকে ননীলালের এক ব্যবসাদার মক্কেল পাঠিয়ে দিয়েছে।
ননীলাল গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে। এমন সময় ফাঁক বুঝে ভূতনাথ আবার ডাকলে—ননী—
-আরে ভূতে-কী খবর, চলে আয়-বলে হাত ধরে টেনে একেবারে গাড়িতে তুলে নিলে। বললে—কোথায় আছিস এখন?
–কেন, এখেনে, বড়বাড়িতে।
–কী করছিস?
–কিছু না।
গাড়ি তখন বনমালী সরকার লেন দিয়ে চলতে শুরু করেছে। ননীলালের নতুন মোটর। এই-ই ভূতনাথের প্রথম মোটর গাড়ি চড়া। কেমন অনায়াসে এতখানি পথ চলেছে। তেমন ঝাকানি নেই। আরামে গা এলিয়ে দিলে ভূতনাথ।
হঠাৎ ননীলালই প্রথম কথা বললে চূড়োর বৌ কেমন দেখলি?
-খুব ভালল, ওরা তো রূপ দেখেই বিয়ে করে।
—কিন্তু বড় ছোট, বয়স বোধহয় দশ বছরের বেশি হবে না–ওকে নিয়ে চূড়ো কী করবে?
ভূতনাথ বললে—ওদের বাড়ির যে নিয়মই ওই—তারপর খানিকক্ষণ আবার চুপচাপ। খানিক পরে বললে—আমি আর কতদূর যাবো, এখানে নামি।
-কেন, চল আমার বাড়িতে, পটলডাঙায়।
–এত রাত্রে ফিরে আসবো আবার কী করে?
—সে জন্যে তোর ভাবনা নেই, আমার বাড়িটা চিনে রাখ— তা এখন কী করছিস?
-বললুম তো, কিছু না।
–চাকরি করবি?
—কে দেবে চাকরি?
–আমি দেবো—আমার ব্যাঙ্কে এত লোক নিচ্ছি।
-–আমি কি পারবো?
—কাজ তো তেমন শক্ত নয়—যাদের টাকা আছে, তারা এসে টাকা জমা রাখবে আমার ব্যাঙ্কে, সুদ পাবে—আর যদি তুই কারো টাকা আনতে পারিস, তার জন্যেও কমিশন পাবি। টাকা খাটানোর ভার আমার— ধর, এমন লোক যদি কেউ থাকে তোর জানাশোনা যার অনেক টাকা আছে, আমার ব্যাঙ্কে রাখলে সে সুদ পাবে—টাকাও সেফ রইল—যখন ইচ্ছে তুলে নিতে পারবে।
আরো অনেক কথা বলতে লাগলো ননীলাল। ভূতনাথ শুনতে শুনতে অবাক হয়ে যায়। টাকা ছড়ানো আছে পৃথিবীতে, শুধু নিতে জানলেই হয়। কোটি কোটি টাকার স্বপ্ন দেখে ননীলাল। ননীলাল বলে টাকা হলে আমার ধ্যান। দুনিয়ায় টাকা না থাকলে কিছুই নেই। এই মূল সত্যটি জানতে হবে। শুধু জানলে চলবে না, বিশ্বাস করলেও চলবে না, ধ্যান করতে হবে। জীবনের যা কিছু কাম্য অর্থাৎ যশ, খ্যাতি, স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, ভোগ, স্ত্রী, পরিবার, প্রতিষ্ঠা, মর্যাদা—সকলের মূলে টাকা! এই যে এখন টাকা হয়েছে—তাই সবাই খাতির করে। এমন কোনো কাজ নেই, এমন কোনো দুষ্কর্ম নেই যা করিনি আমি, কিন্তু আমি ড়ুবে যাইনি তা বলে, মদ খেয়েছি, এখনও খাই, বড়লোকের ছেলেদের সঙ্গে ভাব করেছি, আডড়া দিয়েছি, দেনা করা টাকা দু হাতে উড়িয়েছি, কী জন্যে? আরো টাকা পাবার জন্যে! আমি বিয়ে করেছি। রূপ দেখে নয় শুধু, টাকা দেখেও! রূপও চাই টাকাও চাই। তাই তো চূড়োকে বলছিলুম—
—ছুটুকবাবু কত টাকা পেয়েছে?
—কিছুই পায়নি, একটা পয়সা না, তা ছাড়া হাবুল দত্ত টাকা পাবে কোত্থেকে? আমার কাছে তো দু’ বেলা ছুটোছুটি করে টাকার জন্যে। ওর হাঁড়ির খবর আমি জানি, আমি কাজ দিলে তবে ও টাকা পাবে—আমার টাকা নিয়ে ও বড়লোক।
