কে যেন বললেন—আপনার পায়ের ধুলো পড়েছে এ-বাড়িতে এতেই কিতাৰ্থ হয়েছে পাথুরেঘাটা।
ননীলাল চুপ করে রইল।
–নতুন মিলটা কবে চালু করছেন। বাজার থেকে শেয়ারগুলো সব তো হু হু করে উড়ে গেল সেবার। এবার যেন মনে থাকে আমাদের।
ননীলাল সিগারেটে টান দিলে। গাড়ির পাদানিতে একটা পায়ের ভর দিয়ে দাঁড়ালো। ভিড়ের পেছনের সারিতে দাঁড়িয়েও ভূতনাথ দেখলে ননীলালের বিলিতি কোট প্যান্টের ভাজগুলো কী তীক্ষ্ণ, কী স্পষ্ট। মনে হলো, ছুটুকবাবুর মলমলের গিলে করা পাঞ্জাবীর চেয়েও যেন দামী পোষাক ননীলালের। এমন কি ছুটুকবাবুর মখমল-সাটিনের বরের পোষাকের চেয়েও যেন জুমকালো! গাড়ির ভেতরে আরো দুজন কারা বসে আছে। খুব ফরসা চেহারা। দেখে মনে হয় সব সাহেব।
ননীলাল একবার সিগারেটের শেষ টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে উঠলো—তা হলে আসি এখন মিস্টার…
হাবুল দত্ত সামনে হাত জোড় করে এগিয়ে গিয়ে বললেনকড়েয়ার নতুন বিল্ডিং-এর কন্ট্রাক্টটা তা হলে যে রকম দেখছি
–ওঃ, নন ফিয়ার—আমি তো আছি।
হাবুল দত্ত বললে—আপনি তো কিছু জল গ্রহণ করলেন না–ভয় হচ্ছে—
-করবো, করবো, আপনার জামাই ছুটুক তো আমার ফ্রেণ্ড। এক ক্লাশে পড়েছি আমরা—এখন তো আত্মীয় হয়ে গেলাম। এবার থেকে না বলতে পারবো না আর..
হো হো করে বিলিতি কায়দায় হেসে ননীলাল গাড়িতে গিয়ে বসলো এবার।
সেই শেষ দেখা। সেদিন ভিড়ের মধ্যে থেকে সামনে এগিয়ে দেখা করবার ইচ্ছে হয়েছিল একবার। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। ননীলাল তখন ব্যস্ত। শুধু গাড়িটা চলে যাবার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত বিয়েবাড়ির সমস্ত গন্ধ ছাপিয়ে আর একটা গন্ধ তীব্র হয়ে নাকে এসে লেগেছিল। হয় মোটরগাড়ির তেলের, নয় সিগারেটের, নয় ননীলালের পোষাক পরিচ্ছদের। কিছুই ঠিক করে বলা যায়নি। কেমন যেন অবাক হয়ে গিয়েছিল ভূতনাথ। আদ্যোপান্ত ননীলালের সমস্ত ইতিহাসটা যেন চোখের ওপর ভেসে ওঠে। সেই ননীলাল। গঞ্জের স্কুলের বড় ডাক্তারের ফুটফুটে ছেলেটা! কী যে মোহ ছিল ওর ওপর। সেই ভূতনাথের জীবনের প্রথম চিঠিটা তো ননীলালেরই লেখা। এখনও টিনের বাক্সটা খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে। লিখেছিল—’বড় চমৎকার শহর এই কলিকাতা। কী যে সুন্দর দেশ বলিতে পারিব না। কই ভূতনাথের চোখে তো সে-সৌন্দর্য এখনও ধরা পড়লো না। তারপর সেই যেদিন স্বামিজী কলকাতায় এলেন—ননীলালের সঙ্গে হঠাৎ দেখা। স্বামিজীকে বলেছিল—বুজরুক। তারপর ছুটুকবাবুর কাছে শোনা মতিয়া বিবির বাড়িতে যাওয়া। সেই গান—’জখমী দিলকো না মেরে দুখায়া করো’—সেই শিবু ঠাকুরের গলির বিন্দির কথা। কলেজের দরজার ওপর থেকে ‘God is good’ কেটে দিয়ে ‘God is money’ লিখে দেওয়া। আর আজ অন্য এক মূর্তি!
ছুটুকবাবু বলেছিল—একদিন আমার কাছে পাঁচ শ’ টাকা ধার নিয়েছিল ননী, আর আজ তার কাছ থেকে টাকাটা ফেরৎ চাইতেই লজ্জা করবে। ছুটুকবাবু আরো বলে—এই ননীই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে ভূতনাথবাবু, কী টাকাটাই না নষ্ট করেছি বন্ধুবান্ধবদের পেছনে। এক-একজনের জন্যে এক-একটা দামী বোতল আনিয়ে রেখেছি, যার যা দরকার হয়েছে আমি যুগিয়েছি টাকা, কোথাও গিয়েছি একসঙ্গে, সমস্ত খরচা আমার, পান সিগারেট থেকে শুরু করে সমস্ত-আমার স্বার্থ কী? না তারা আমার সঙ্গে আড্ডা দেবে। আমাকে ঘিরে থাকবে চারপাশে দিনরাত—এই আমার লাভ। ছুটুকবাবু আবার বলে —অথচ আজ সাহেব মেমর পর্যন্ত খাতির করে চলে ননীকে—একটা ব্যাঙ্কও করলে সেদিন, তিনটে জুট মিল, ছ’টা কোলিয়ারির শেয়ার কিনেছে, রাতকে একেবারে দিন বানিয়ে ছাড়লে, বাহাদুর ছেলে বটে—তার ওপর আবার ওই শাঁসালো শ্বশুর, আর রূপসী বউ—অথচ একদিন শেষের দিকে এমন হয়েছিল ওর জামা করতে দিয়েছে বিলিতি দোকানে, ছাড়িয়ে আনবার পয়সা নেই—আমি দিয়েছি টাকা। .
ছুটুকবাবুর বৌভাতের দিন সেই ননীলালকে আরো ভালো করে দেখবার সুযোগ হয়ে গেল। পেছন থেকে মৃদু স্বরে ডাকলেননী।
ছেনি দত্তর সঙ্গে যে অত ঝগড়া, তার ছেলে নটবর দত্তও এসেছে নিমন্ত্রিত হয়ে। শেঠ, শীল, লাহা, মল্লিকরা সবাই যার যার গাড়ি নিয়ে এসেছে। আতর, গোলাপজল, ফুলের মালা, তামাক সিগারেটের ছড়াছড়ি। লক্ষ্মৌ থেকে রহমতউল্লা এসে তিন দিন ধরে তোড়ি, ভৈরো, দরবারি কানাড়া যত সব ওস্তাদী রাগ বাজিয়ে চলেছে। বড়বাড়ির ঐশ্বর্য আর ঐতিহ্যের আড়ম্বর কোথাও যেন হানি না হয়।
সুখচর থেকে খোদ নায়েব সেলামী পাঠিয়েছে এবার মোটারকম। এবার বিধু সরকার নিজে চলে গিয়েছিল কাছারি-বাড়িতে মেজবাবুর নিজের হাতের লেখা চিঠি নিয়ে। সেবার বড়কর্তার শ্রাদ্ধের কাজে ফাঁকি দিয়েছিল মালোপাড়ার প্রজারা। ১৮৩৩ সালের ঝড়-বৃষ্টিতে যখন ঘরবাড়ি ক্ষেত-খামার জমি-জিরেত নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, প্রজাদের দু’ সালের খাজনা মকুব করা হয়েছিল। সে-কথা মনে আছে তো! ছিয়াত্তরে মন্বন্তরের সময় প্রজারা এসে জমিদার বাড়ি থেকে ধান মেপে মেপে নিয়ে গিয়েছে, সে তো আর জমা হয়নি সেরেস্তার খাতায়। তোমাদের মনে না থাকে মনে আছে সমাজের মাতব্বরদের। সব লেখা আছে খাজাঞ্চীখানার পুরোনো রেকর্ডে। দরকার হলে বিধু সরকার সব বার করে শুনিয়ে দিতে পারে। এবার বেগার পাঠাতে হবে গাঁ পিছু একজন করে। আর মাথা পিছু আট গণ্ডা পয়সা সেলামী। বিধু সরকার এই নিয়ম করে দিয়েছিল। না দিলে পরের সনের প্রজা বিলির সময় দেখা যাবে।
