ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—হাবুল দত্তকে টাকা দিয়ে তোর লাভ?
-আরে, আমি কি আমার টাকা দেবে? .রামের টাকা শ্যামকে দেবো, আবার যদুর টাকা রামকে দেবো—আমার কিছুই, মাঝখান থেকে আমি খাবো লাভ—এই যে এত লোককে আমি মাইনে দিই, আমি কি আমার পকেট থেকে দিই, দিই রাম শ্যাম যদুর টাকা।
অত কথা বুঝতে পারে না ভূতনাথ। জিজ্ঞেস করলে–এখন কোথায় যাচ্ছিস?
—এখন আর কোথাও যাবে না, সোজা বাড়ি, সারাদিন খাওয়া হয়নি আজ।
—বড়বাড়িতে খাস নি কিছু?
—খেতে ওরা বলছিল খুব, কিন্তু পেটে আর জায়গা নেই। সারা বিকেলটা শুধু মদ খেয়েছি।
—মদ! কেন মদ খেয়ে টাকা নষ্ট করিস?
ননীলাল হো হো করে হেসে উঠলো।-তুই এখনও মানুষ হলি না, আরে মদ খেয়ে যারা টাকা ওড়ায় তারা ওই চূড়ামণি গোবরমণির দল—আমি মদ খেলে টাকা পাই।
—সে কী রকম?
ননীলাল বললে সে তোকে আর একদিন বোঝাববা, এমন লোক আছে কলকাতায় যাদের সঙ্গে মদ খেলে টাকা দেবে আমাকে। আমি কথা বললেই তারা কৃতার্থ—এই যে এত কারবার চালাচ্ছি, এর একটা পয়সা পর্যন্ত আমার নয়, সব পরের টাকা বিশ্বাস করবি?
ভূতনাথের কাছে বিশ্বাস না হবার মতোই কথা। এ কোন্ কলকাতার কথা বলছে ননীলাল! স্বামিজীর যখন সম্বর্ধনা হয়েছিল বাগবাজারে, সে-সভার খরচ পর্যন্ত ওঠেনি। এমনি টাকার অভাব হয়েছিল। সে-খবর ব্রজরাখালের কাছে শুনেছিল ভূতনাথ। বন্যা কি দুর্ভিক্ষের সময় গান গেয়ে গেয়ে লোকেরা চাল, কাপড়, পয়সা চেয়ে বেড়ায়। কেউ দেয় না। টাকার অভাবে কত ভালো কাজ হতে পারছে না দেশে। নইলে স্বামিজীর একটা মূর্তি তৈরি করে রাখা হতো কলকাতার একটা বড় রাস্তার মোড়ে। ব্রজরাখাল কতদিন সে-কথা বলেছে। সুবিনয়বাবু অবশ্য ব্রাহ্মসমাজে টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু সুবিনয়বাবুর মতো লোকই বা ক’জন আছেন? টাকার অভাবে চিকিৎসার জন্যে কত ফুলদাসীর মতো মেয়েমানুষ কলেরায় মারা যাচ্ছে! নিবারণদের দল টাকা পেলে কত কী করতে পারতো। জার্মানী থেকে রিভলবার, বন্দুক, বোমা আসতো। গরীব দুঃখীদের জন্যে অন্তত একটা হাসপাতালও হতো! অথচ ননীলালের কাছে টাকাটা একটা সমস্যাই নয়।
ননীলাল বলে—টাকা পাওয়া সহজ—টাকাটা খাটানোই হলো শক্ত, টাকার বাচ্ছা হয় জানিস—সেই বাচ্ছ। পাড়ানোই হলো শক্ত কাজ।
ভূতনাথ বললে—আমার নিজের পাঁচ শ’ টাকা আছে।
কথাটা শুনে ননীলালের বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না কিন্তু! শুধু বললে–পাঁচ শ’—
–হ্যাঁ, পাঁচ শ’।
ননীলাল এবারও কোনো মন্তব্য করলে না। ভূতনাথ মনে মনে হিসেব করতে লাগলো—পাঁচ শ’ টাকা যদি ননীলালের ব্যাঙ্কে রেখে দেওয়া যায় তো বছরে পাঁচ বারোং ষাট টাকা সুদ আসে। জবার বিয়েতে একটা কিছু দেবে বলেই ছোটবৌঠানের কাছে রেখে দিয়েছে টাকাটা। যতদিন বিয়ে না হয় ততদিন ব্যাঙ্কে থাকলে কিছু সুদও আসে।
ভূতনাথ হঠাৎ বললে—আর একজনের কাছে কিন্তু অনেক টাকা আছে-লক্ষ লক্ষ টাকা।
এবার ননীলালের বেশ আগ্রহ দেখা গেল। গাড়ির বাইরে পোড়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললে—কার কাছে?
একটা আচমকা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা আবার সোজা চলতে লাগলো।
ভূতনাথ বললে—আর অত টাকা তাঁর শুধু পড়েই আছে, কোনো কাজে লাগছে না—অবশ্য ছুটুকবাবুর মতো নয়…তা ছুটুকবাবুরা টাকা রাখেনি তোর ব্যাঙ্কে?
ননীলালের গলায় কেমন তাচ্ছিল্য ফুটে উঠলো। বললেওদের ওই বাইরেই যা চাল-চলন—নগদ টাকা নেই—সে আমি জানি—চারদিকে দেনা।
—সেদিন তত মেজবাবু গাড়ি কিনলে।
—ওই কোঁচানো ধুতি, ওই ঝি-চাকর আর গাড়ি ঘোড়া থাকলেই বড়লোক হয় না, আজকাল বড়লোকের ইয়ে বদলে গিয়েছে। ওদের আছে জমি, জমিদারি যদ্দিন তদ্দিন বড়মানুষি—তাও প্রজারা খাজনা
দিতে পারলেই ব্যাস্—সেদিন যে একটা ঘোড়া মরে গেল, এখনও কিনতে পারলে না—এদিকে মেয়েমানুষের নতুন নতুন বাড়ি হচ্ছে কেবল, পায়রার লড়াই হচ্ছে—ওসব শুধু চাল দেখানো।
ভূতনাথ খানিক চুপ করে থেকে বললে—যার কথা বলছিলাম, তাঁর কিন্তু অনেক টাকা-রাখবি তোর ব্যাঙ্কে?
—কে সে?
—সুবিনয়বাবু, আমি যেখানে চাকরি করতুম, ওই ‘মোহিনীসিঁদুরের মালিক। তিনি সব টাকা দান করে দিচ্ছেন, যদি তুই বলিস গিয়ে রাখতেও পারেন, তার মেয়ের সঙ্গেও আমার জানা শোনা আছে—জবাকে ধরলেও হয়—
-জবা?
-হ্যাঁ, ব্রাহ্ম হলে কী হবে, সুবিনয়বাবুর বাবা হিন্দু ছিলেন কিনা, ওই নাম রেখেছিলেন—মেয়েটি খুব ভালো, চিনিস নাকি?
—কী রকম চেহারা বলতো? ভূতনাথ বললে-চেহারাটা খুব ভালো—তার ওপর ব্রাহ্ম তো, লম্বা হাতা জামা পরে, ভেলভেটের কলার লাগানো ব্লাউজ, চুলটা বিনুনি করে ঝুলিয়ে দেয়, ছুটুকবাবুর কাকীদের দেখেছিস তো, ওদের রূপ অন্য রকম—আর জবাকে দেখতে আলাদা একেবারে।
ননীলাল খানিকটা ভেবে জিজ্ঞেস করলে–ব্রাহ্ম?
–হ্যাঁ, ব্রাহ্ম।
—ব্রাহ্ম মেয়েদের সঙ্গে তো এককালে খুব মিশেছি, চিনি বলে মনে হচ্ছে—খুব জেদী মেয়ে, না রে?
ভূতনাথ বললে–হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস, খুব জেদী, কিছুতেই ভাঙবে না।
–তবে চল একদিন।
ভূতনাথ বললে—সুবিনয়বাবু এখন খুব অসুস্থ-মাঝখানে তো খুবই খারাপ অবস্থা গিয়েছিল—শুনছি এখন ভালো আছেন। আমি আগে দেখে আসি একদিন একলা গিয়ে কেমন আছেন, তারপর বরং তোকে নিয়ে যাবে।
ততক্ষণে গাড়ি পটলডাঙার ধারে এসে গিয়েছে। গাড়ি বাড়ির কাছে আসতেই একটা বিরাট কুকুর চিৎকার জুড়ে দিলে।
গাড়ি থেকে নেমে ননীলাল কুকুরটাকে দু হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে ডাকলে-বদরি—
