বংশী দৌড়ে গেল—ওই হাওয়া-গাড়ি এসেছে মেজবাবুর।
ভূতনাথও দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো উঠোনে। চক চক করছে চেহারা। আগাগোড়া লোহার। শুধু ছাদটা মোটা কাপড়ের আর চাকা চারটে রবারের। রবারের বেলুনের মতো একটা জিনিষ টেপে আর ভোঁ ভোঁ শব্দ হয়। সাড়া পেয়ে দৌড়ে এল সবাই। দাস্ত জমাদারের ছেলেমেয়েরা এসে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে।
ইব্রাহিম ছাদের ওপর টুলে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিলো। সে-ও দেখলে। চোখ দুটো তার যেন জ্বলছে। বংশী বললে—ওই দেখুন শালাবাবু, ইব্রাহিমের গা জ্বালা করছে—দেখুন।
-কেন, ওর রাগ কীসের?
—আজ্ঞে, এবার হাওয়া-গাড়ি এল, এর পর আর কে ওর ঘোড়ার গাড়িতে চড়বে।
লোচন তামাকের বোয়েম ফেলে এসেছে। মধুসূদন তোষাখানা ছেড়ে দেখতে এসেছে। শ্যামসুন্দর ভিস্তিখানার জল ভোলা থামিয়ে দেখতে এল এক ফাঁকে। খাজাঞ্চীখানা থেকে বিধু সরকারই শুধু আসেনি। দোতলার বারান্দা থেকে ঝি-এর দল ঝিলিমিলির ফাঁক দিয়ে দেখছে।
তারপর এল মেজবাবু।
মেজবাবু আসতেই সাহেব নামলো উঠোনে। তারপর কথা হলে দুজনে। গাড়িটাকে আগা পাছতলা দেখানো হলো। দুজনে কী সব কথা হলো।
মেজবাবু বললেন—ভেড়ি গুড়-কথার সব কিছু বোঝা গেল না। কথার শেষে মেজবাবু সাহেবকে নাচঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
কিন্তু হাওয়া-গাড়িখানা বার-বার দেখেও যেন তৃপ্তি হয় না কারো। গাড়ি তো অনেকেই কিনেছে। কলকাতার রাস্তায় মাঝে মাঝে দেখা যায়। কিন্তু এখান যেন সকলের চেয়ে সেরা। মেজবাবু বলেছিল—কলকাতায় যত গাড়ি আছে—সকলের চেয়ে ভালো হওয়া চাই।
তা টেক্কা দেওয়ার মতো জিনিষ বটে।
শ্যামসুন্দরও অবাক হয়ে দেখছিল। এতক্ষণ কিছু কথা বলেনি। হঠাৎ বললে—গাড়ি তো হলো—চালাবে কে?
কে যেন পাশ থেকে বললে—কেন, ইব্রাহিম।
কে বললে কথাটা! কে এমন বোকা রে! যে বলেছে সে মাথা ঢাকা দিয়েছে। এমন বোকামির কথা কে আর বলতে পারে। ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম তখনও তার বাবরি চুল আঁচড়াচ্ছে। কথা বুঝি কানে গেল তার।
–ও ইব্রাহিম মিয়া, কী বলছে, শুনলে?
ইব্রাহিমের কান দুটো আরো লাল হয়ে উঠলো। ইয়াসিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুলের কেয়ারি করে দিচ্ছিলো।
ইব্রাহিম শুধু মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে আয়নাতে মুখ দেখতে লাগলো একবার। মুখ দিয়ে শুধু বেরুলো বেওকুফ।
বেওকুফের মতোই কথাটা বটে! সমস্ত দুনিয়াটাই বেওকুফে ভরা। অন্তত ইব্রাহিমের ধারণা তাই। যোধপুরের নেটিভ রাজার ঘোড়সওয়ার ছিল ইব্রাহিমের চাচা। ইয়া লম্বা চওড়া চেহারা তার। সোনা-চাদির কাজ করা প্লেট লাগানো কুর্তার বুকে আর আস্তিনে। মহারাজার ছিল পপালো খেলার সখ। সেই দু’ শ’ ঘোড়ার তদারক। একবার চাচার সঙ্গে কলকাতায় এসেছিল মহারাজার দলের ভেতর। এখানকার লাটসাহেবের বাড়ি, গঙ্গাজী আর কেল্লা দেখে যখন সবাই চলে যাবার মতলব করছে, সেই সময় চাকরির কথা হলো এখানে। এই মেজবাবুর কাছে। মেজবাবু তখন সবে নতুন ওয়েলার জোড়া কিনেছে। তারপর বেশ সুখেই দিন কেটেছে। মেজবাবুকে নিয়ে গিয়েছে বাগানবাড়ি, খড়দ’র রামলীলার মেলায়। নানা উৎসবে আমোদে মেজবাবুকে সেবা করেছে। আর এখন?
মোটরটা যখন ঘড়ঘড় শব্দ করে নড়ে ওঠে, ইব্রাহিম ঘর থেকে চুপি চুপি উঠে আসে। নিঃশব্দে দোতলার ছাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখে। চোখ দুটো দেখতে দেখতে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। শিকারের দিকে চেয়ে বন্য জানোয়ারের চোখও বুঝি এত নিষ্ঠুর হতে জানে না। মুখ দিয়ে নিশ্চয় কিছু শব্দ বেরোয়। অস্ফুট শব্দ। হয় তো ওই নিষ্প্রাণ হাওয়া-গাড়িটাকেই লক্ষ্য করে মাতৃভাষায় গালাগালি দেয়—বেওকুফ।
কিন্তু ইব্রাহিমের সে-আঘাত বিংশ শতাব্দীকে এতটুকু চঞ্চল করতে পারে না। হাওয়া-গাড়ি জাহাজ ভর্তি হয়ে চালান আসে চাদপাল ঘাটে। ম্যাঞ্চেস্টার থেকে রেলি ব্রাদার্সের কাপড়ের চালান আসে। আসে কলের গান, আলুর পুতুল, স্টিম ইঞ্জিন, কল-কজা, ছোট বড় মাঝারি। তার সঙ্গে এল বিলিতি আলতা, সাবান, এসেন্স, মাথার ফুলেল তেল, চুলের কাটা, রেশমি ফিতে, ঝাড়-লণ্ঠন আর বিলিতি মদ। বেঁটে, লম্বা, চ্যাপ্টা, গোল—নানা আকারের বোতলে ভরা।
কিন্তু তাক লেগে গেল ননীলালের মোটরগাড়িখানা দেখে। সকলের সেরা গাড়ি। যেমন লম্বা, তেমনি চকচকে, তেমনি আওয়াজ। রবারের বেলুনটা টিপলে ভারী চমৎকার একরকম শব্দ হয়। সে-শব্দ শুনে ঘোড়াগুলো তেমন করে ক্ষেপে ওঠে না। সমস্ত বাড়িটায় প্রতিধ্বনি ওঠে না। মৃদু মন্থর একটু উত্তেজনা হয় শুধু। যেন গাড়িটার কাছে দাঁড়ালে বেশ সুগন্ধ বেরোয় একটা। কিন্তু ভূতনাথের মনে হয়, গন্ধটা গাড়ির তেলের, না ননীলালের জামা-কাপড়ের, না ননীলালের সিগারেটের। ও তিনটে গন্ধই চেনা। তবু যেন নতুন ঠেকে ননীলালের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে।
সেদিন হাবুল দত্তর পাথুরেঘাটার বাড়িতে ছুটুকবাবুর বিয়ের দিন দেখা হয়েছিল ননীলালের সঙ্গে। সে না-দেখা-হওয়ারই সামিল। বৃন্দাবনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডোবার ধারে অতক্ষণ কথা বলার পর যখন বিয়েবাড়িতে আবার ঢুকেছে তখন ননীলাল বিদায় নিচ্ছে। সবাই ননীলালকে পেড়াপীড়ি করছে খাওয়ার জন্যে আর ননীলাল হাতজোড় করে আপত্তি জানাচ্ছে।
আরও আশ্চর্যের কথা, হাবুল দত্ত-ছুটুকবাবুর শ্বশুর—নিজে বলেছে–ননীবাবু এ কী রকম হলো—আপনি কিছু মুখে দিলেন না?
ননীলাল বলেছে—এই তো বরানগর থেকে খেয়ে আসছি, এর পর আবার কলুটোলায় আর একটা নেমন্তন্ন—মানুষের শরীর তো।
