-কী কাণ্ড বেণী?
—বরানগরের বাগানে একদিন আপনাকে নিয়ে যাব আজ্ঞে। দেখবেন কী সুন্দর গাছের কেয়ারী—এক একটা গাছের ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকলে কেউ খুঁজে পাবে না আপনাকে। ওইখানেই ‘কানা-মাছি-ভোঁ-ভোঁ খেলে কিনা বাবুরা।
–কার সঙ্গে খেলে?
–কলকাতা থেকে কখনও কখনও মেয়েমানুষ নিয়ে যায় মেজবাবু, চোখে দু’পাট কাপড় বেঁধে তাদের ছেড়ে দেয় বাগানের মধ্যে। বাগানের গাছের ঝোপে বাবুরা কুঁ কুঁ আওয়াজ করে–আর তেমনি চোখ বেঁধে বাবুদের ছুঁতে হবে, ভারী মজার খেলা। আমরা এক-একবার লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি দরজার ফোকর দিয়ে।
—লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে হবে কেন—দেখা তোমাদের বারণ বুঝি?
–দেখতে আপনারই লজ্জা হবে যে শালাবাবু, একেবারে উদোম গা যে-কাপড় জামার বালাই নেই—কিন্তু একবার বেশ নতুন খেলা হয়েছিল—মেজবাবু বাগানে বস্ত্রহরণ পালা করেছিল সেবার।
—বস্ত্রহরণ, শ্রীকৃষ্ণের বস্ত্রহরণ?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক যেমন বড়বাড়ির ঠাকুরঘরে ছবি আছে দেয়ালে টাঙানো, অবিকল ওই রকম—মেজবাবু সেজেছিল কেষ্ট।
মেজবাবুর যৌবনকালে এ-রকম সখ ছিল আরো। বস্ত্রহরণ, কালীয়দমন, নৌকাবিলাস, মানভঞ্জন–নানারকম খেলা। সে-কালও নেই, সে-জাঁকজমকও নেই। ওই যে লোচন দেখছেন তামাক সাজছে একলা বসে বসে, ওর কি তখন ফুরসুৎ থাকতে নাকি। একা মানুষ দশ হাতে চিলিম তদারক করেছে তখন। আর আন্সতে কত বাবু! সারাদিন ধরেই তো আড্ডা চলেছে নাচঘরে। নাচঘর তখন দিনরাতই গুলজার। বেলোয়ারী ঝাড় আসছে। বিলেত থেকে। এই যে এখন দেখছেন দীপকের আলো—চোখে লাগে বটে, কিন্তু তার বাহার ছিল কত! একটা বেলোয়ারী ঝাড়ে সতেরোটা মোমবাতি আমিই তো নিজ হাতে জ্বালিয়েছি—সে আলো আর এ আলো। বড়মাঠাকরুণের হীরের চুড়ির ওপর সে-আলো ঠিকরে পড়ে একেবারে নাচঘর ঝকমক করে উঠতো। পশ্চিম থেকে বাঈজী আসতো, নান্নে বাঈ, জহর বাঈ কী সব নাম তাদের, আমরা গেলাশ সাজিয়ে দিয়ে এসেছি আসরে—আমাদের এই চেহারাই খোলতাই হয়ে উঠতে সেই আলোর তলায়।
কাপড় কোঁচাতে কোঁচাতে বেণী হতাশা প্রকাশ করে। বলে–এই কাপড়ের ডাই ছিল মেজবাবুর। বাড়ির মধ্যে মেজবাবুই তো ছিল বাব। কাপড়ের কি হিসেব ছিল তখন। আমরাই কত কাপড় দিয়ে দিয়েছি একে ওকে। ভৈরববাবুই কত কাপড় নিয়ে গিয়েছেন লুকিয়ে লুকিয়ে। আর সেদিন মতিবাবু এসে বললেনকই রে বেণী, কাপড় চোপড় তো ছিঁড়ে এল সব—এবার আর
পেলে তো চলছে না। তা আমি বললাম—আর সে দিনকাল নেই মতিবাবু, এখন গুণতির কাপড় সব—বিধু সরকার গুণে হাতে তুলে দেয়, একটা হারালে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে—ছিড়ে গেলে ছেড়া কাপড়ের টুকরো দেখাতে হবে—বড় কড়াকড়ি করে দিয়েছে খাজাঞ্চীবাবু।
—তা এমন দিনকাল কেন হলো বেণী?
বেণী তখন পাটির ওপর উপুড় হয়ে বসেছে। কোঁচানো কাপড়ের একটা দিক পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে ধরে আর একটা দিকের ওপর ফর ফর করে গিলে চালায়।
একটু থেমে বলে—কী জানি কেন এমন হলে শালাবাবু। এত বড় বিয়ে গেল ছুটুকবাবুর, তা এ-বাড়ির কাজ-কম্মে আগে দেখেছি মিষ্টির ছড়াছড়ি চলে—কাগে পক্ষীতে খেয়ে কুলিয়ে উঠতে পারে না, শেষে রাস্তায় পাহাড় হয়ে যায় মিষ্টি তরকারির—আর এবার দেখুন তো-বিয়ে হলো শুকুরবার আর সোমবারের মধ্যে সব ভোঁ ভোঁ-কেউ কিছু দেখতে পেলে না। প্রত্যেকবার একটা করে ধুতি আর একখানা করে গামছা বরাদ্দ থাকতো—এবার গামছার মুখ পর্যন্ত দেখা গেল না, ভাবলাম ফুলশয্যার দিন পাবে
—তা কোথায় কী!
সত্যি সত্যি ভূতনাথেরও যেন কেমন অবাক লাগছিল। ক’বছরের মধ্যেই যেন কত কী বদলে গেল সব। কতদিন থেকে বংশীর মুখে শোনা গিয়েছে, বাবুরা হাওয়া-গাড়ি কিনবে। ছোটবাবু তো চুনীদাসীকে কিনেই দিলে একটা গাড়ি। তা সে হয় তত চুনীদাসীর পীড়াপীড়িতেই। কিন্তু বাড়ির জন্যেও তো দরকার। শেঠ, শীল, মল্লিকদের বাড়ি গাড়ি উঠেছে। ছেনি দত্তও মরবার আগে গাড়ি চড়ে গিয়েছে!
একদিন গাড়ি এসেও ছিল একটা।
ভূতনাথ তখন খেয়ে উঠেছে সবে। খেতে একটু দেরিই হয়েছে সেদিন। ভেতর বাড়ি থেকে ভাত আসতেই দেরি হলো।
বংশী বললে—আজ রান্না বাড়িতে কেলেঙ্কারি হয়ে গিয়েছে শালাবাবু, তাই এত দেরি হলো-আঁশ নিরিমিষ একাকার হয়ে গিয়েছে সব।
—সে কি।
—আজ্ঞে। বিধবাদের ভাত চড়ে সকাল-সকাল, সেজখুড়ী নিজে নিরিমিষ চড়ায়, বড়মা ছুচিবাই মানুষ, একটু সকাল-সকাল খেয়ে নেয় কিনা—কিন্তু আঁশের হেঁসেলের হাত বেড়ি সব নিরিমিষের ঘরে দিয়ে এসেছে সদু। রাত থাকতে বাসনমাজার লোক আসে কিনা, তারা ঘস ঘস করে বাসন মেজে রেখে গিয়েছে রোয়াকে, তাড়াতড়িতে আর বাসনের কুঠুরিতে রাখেনি, সদুর কাছে বাসন চেয়েছে সেজখুড়ী, সদু আর অত চোখ মেলে দেখেনি, সেই আঁশের বাসনই তুলে দিয়ে এসেছে নিরিমিষের ঘরে। ছোয়াছুয়ি হয়ে গিয়েছে, তখন দেখে ফেলেছে রাঙাঠাকমা, তার তত নজর সব দিকে, সব্বেনাশ কাণ্ড-রাঙাঠাকমা চিৎকার করে উঠলো। বলে—ফ্যাল বাতাসী, ফেলে দেও ছিষ্টি আঁশ হয়ে গেল হেঁসেলের—তা তখন ধরুন অড়র ডাল, বড়ি-শাকের ঘন্ট, সুক্ত, চালতার অম্বল, সব রান্না হয়ে গিয়েছে। রাঙাঠাকমা জিজ্ঞেস করলে—কে বামুন তুলেছে নিরিমিষ হেঁসেলে? খোঁজ, খোঁজ-সদু বলতে চায় না নিজের নাম।
তা সেই নিরিমিষ আঁশ সব আবার নতুন করে রান্না হলো কিনা—তাই এত দেরি।
তখন খাওয়া ভালো করে শেষ হয়নি। নিচে থেকে ভোঁ ভোঁ করে আওয়াজ এল। একেবারে উঠোনের ওপর থেকে শব্দ আসছে।
