রাত হয়ে যাচ্ছিলো। ওরা চলে যেতেই ভূতনাথ আস্তে আস্তে বড়বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। মনে পড়লো সেদিন নিবারণও ওই কথা বলেছিল। গাতায় আছে ‘ক্লৈব্য মাস্ম গমঃ পার্থ। ক্লৈব্য ত্যাগ করতে হবে। সত্যি সত্যি এই বসে বসে খাওয়া এ আর কতদিন চলবে! ব্রজরাখাল এসে পড়লে বাঁচা যায়। একটা কিছু চাকরি বাকরি করতে পারলে ভালো হতো। কে যোগাড় করে দেয়! কার সঙ্গেই বা তার জানাশোনা আছে!
বনমালী সরকার লেন-এর ভেতরে আসতেই মনে হলো যেন বাড়ির সামনে বেশ ভিড় জমেছে। এখন কীসের ভিড়!
কেমন যেন ভয় হলো। সেদিনকার মতো পুলিশ দারোগা এসেছে নাকি। সেই ছুটুকবাবুর বিয়ের দু’দিন পরেই। সেদিনও ঠিক এমনি দূর থেকে পুলিশের লালপাগড়ি দেখে চমকে উঠেছিল মনটা। কী, হলে কী বড়বাড়িতে!
কিন্তু কাছে আসতেই ভুলটা ভেঙে গেল। না, পুলিশ-সেপাই কিছু নয়। দক্ষিণের পুকুরটা সাফ করতে এসেছিল মজুররা। মাথায় গামছা জড়ানো। হপ্তার জন্যে অপেক্ষা করছে। বিধু সরকার পাওনাদারদের অকারণ দাড় করিয়ে রাখতে কেমন যেন আনন্দ পায়। একরকম অহেতুক দুর্বোধ্য আনন্দ।
সেদিনের মতো পুলিশের গণ্ডগোল হলেই হয়েছিল আর কি!
সে কী কাণ্ড! সেদিনও দূর থেকে ভিড় দেখে কারণটা বোঝ যায়নি।
তখনও বিয়েবাড়ির গন্ধ যায় নি বড়বাড়ির গা থেকে। বাড়ির সামনে এটো কলাপাতা, মাটির গেলাশ আর ভাততরকারির পাহাড় জমেছে। ওদিকটা কুকুর, মাছি আর বেরালের উৎপাত। ব্রিজ সিং লোহার গেট বন্ধ করে বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছে।
কাছে আসতেই—সে এক অদ্ভুত দৃশ্য!
–হট যাইয়ে বাবু, হট যাইয়ে।
-–ওপরে কোঁচার পত্তন, ভেতরে ছুচোর কেত্তন—বলিহারি বাবা।
দুই একজন বৃদ্ধ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভিড় দেখে উঁকি মেরে দেখে। দেখেই নাকে কাপড় দিয়ে ছি ছি করতে করতে চলে যায়।
ভূতনাথও দেখলে। দেখেই শিউরে উঠলো। সমস্ত নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল যেন তার। সকাল বেলা এ কী দৃশ্য!
—কোন্ বাড়ি থেকে ফেলেছে মশাই?
—আবার কোন বাড়ি—বলেই একজন দাত বার করে অর্থভরা। হাসি হেসে বড়বাড়ির দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে।
কিন্তু এ-বাড়ি থেকে কে ফেলবে! কে এমন পাপী হে!
–ওগো, নড়ছে নাকি ছেলেটা?
–আরে না মশাই, মরে কখন ভূত হয়ে গিয়েছে। দেখছেন শাদা হয়ে গিয়েছে অঙ্গ।
ছোট শাদা ধবধবে একটা রক্তপিণ্ড! শিশু না বলে রক্তপিণ্ড বলাই ভালো। মাংসের ডেলা। ভালো করে হাত পা চোখ নাক কান মুখ এখনও গড়ে ওঠেনি। পুষ্টি হবার আগেই আত্মপ্রকাশ করেছে হয় তো!
—ছেলে না মেয়ে—কী মশাই?
ছেলে না মেয়ে বুঝবো কেমন করে! উপুড় হয়ে পড়ে আছে। যে! আর ছোঁবে কে ওকে! আগে পুলিশের ডোম আসুক। নেড়ে চেড়ে দেখুক সে। তারপর বোঝা যাবে ছেলে কি মেয়ে। কিন্তু তবু দেরি যেন আর সয় না কারো। ছুড়িকে টেনে হিচড়ে বার করুক। দারোগা তে ঢুকেছে ভেতরে। মেজবাবুর সঙ্গে দেখা করতে! এত দেরি হচ্ছে কেন!
হাঁ করে চেয়ে থাকে সবাই। একেবারে সদ্য হওয়া মরা ছেলেটার দিকে। আর একবার গেটের ভেতরে বড়বাড়ির লম্বা শান-বাঁধানো উঠোনটার দিকে। যার কীর্তি তাকে দেখা চাই। তা না হলে তৃপ্তি হচ্ছে না ঠিক! কী রকম তার চেহারা। বয়স কত তার। ফর্সা না কালো। বিধবা না সধবা! ঝি না বউ! কে?
–দারোয়ানজী, তোমার মেজবাবু নেমেছে?
ভূতনাথ এগিয়ে গেল। ভূতনাথকে দেখে ব্রিজ সিং গেট খুলে দিলে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কী ব্যাপার ব্রিজ সিং?
ব্রিজ সিং বন্দুক হাতে নিয়ে পরম বৈষ্ণবের মত বললে—সব কুছ হনুমানজী কী খেল বাবুজী—হনুমান জী নে দিয়া, হনুমানজী নে লিয়া।
বাড়ির ভেতরে কিন্তু কোথাও কোনো চাঞ্চল্য নেই। যে-যার কাজ করে চলেছে। বিধু সরকারের ঘরের দিকে চোখ পড়তেই নজরে পড়লে দারোগা সাহেব বসে আছে। বসে বসে বিধু সরকারের সঙ্গে কথা বলছে।
খেরো খাতা সামনে নিয়ে বিধু সরকার বলছে—কিন্তু মেজবাবুর তো এখন সময় হবে না দারোগা সাহেব, আজ তিনি পায়রা ওড়াতে ছাদে উঠেছেন।
–ডাকতে পাঠাও তাঁকে—সাহেব বললে।
–ডাকতে তো হদ্দ হদ্দ তিনবার পাঠালাম হুজুর, মেজবাবু কাজ না সেরে নামবেন না তো।
–কী কাজ করছেন?
—পায়রা ওড়াচ্ছেন—এখন যদি মেজাজ বিগড়ে যায় তত দিন ভর কারো মাথা আর আস্ত থাকবে না। পায়রা ওড়ানোর পরে একবার খাজাঞ্চীখানায় আসেন রোজ—তখন হিসেব পত্তোর দেখেন, পাওনা গণ্ডা বুঝে নেন। এ তো আর সরকারী পোস্টাপিস নয় হুজুর, এখানকার কানুন আলাদা।
মনে আছে ইংরেজ দারোগা সাহেব কথাটা শুনে খুশি হয়নি। হাতের লাঠিটা ঠুকছিল মেঝের ওপর বারকয়েক। মেজবাবু তখনও ছাদের ওপর পায়রা ওড়াচ্ছেন।
বেণী বলে—পায়রা ওড়াতে সবাই তো পারে না হুজুর, পায়রাগুলো চক্কর মেরে মেরে আকাশে উড়তে থাকবে আর সঙ্গে সঙ্গে মেজবাবুর হাতও তালে তালে ঘুরবে—আর আকাশের দিকে চোখ রেখে বাঁ হাতে মাঝে মাঝে একটা করে তুড়ি মারবে।
-তুড়ি মারবে কেন?
—যাহাতক না তুড়ি মারা আমি তাহাতক আমার হাতের পায়রাটা উড়িয়ে দেবে। পত পত করতে করতে সেটাও উড়ে গিয়ে বড় দলটার সঙ্গে ঘুরতে শুরু করবে-এই তো খেলা। সে দেখতে ভারী মজা শালাবাবু—এক সময়ে নেশা লেগে যায়, মাথায় বেশ ঘুরুনি ধরে—মাথার ওপর কখন সূর্যি উঠেছে–তেজ হয়েছে রোদের খেয়ালও নেই কারো, আমারও নেই, বাবুরও নেই, ভৈরববাবুরও নেই, মতিবাবু, ফটিকবাবু তারকবাবু কারোরই নেই।
-এমনি কতক্ষণ চলে?
—তা ধরুন না কেন, রোদের তেজ বাড়লে পায়রার মেহনত হয় কিনা খুব-পায়রা হলো সুখী জানোয়ার আজ্ঞে। ওই একটা একটা করে পায়রা ছাড়বো আমি, তারপর যখন সব পায়রা ছাড়লুম, তখন মেজবাবুর খেলা আরম্ভ হবে—খেলছে তো খেলছেই-–তারি মধ্যে দু’ বার কল্কে বদলে দিয়ে গেল লোচন, সে টিকে তামাক পুড়ে কখন ছাই হয়ে গিয়েছে। মেজবাবু আঙুল দিয়ে ভৈরববাবুকে ইশারা করবেন—আর ভৈরববাবু মুখের মধ্যে দুই হাতের আঙুল পুরে এমন শিস দেবে—পায়রা ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সোজা রেললাইনের মতো দু’ সার হয়ে উড়তে লাগলো। তারপর আবার শিস—নতুন কায়দায় শিস—তখন যেন ঠিক গোড়ে মালার মতো হয়ে গেল। আবার শিস—তখন থমকে দাঁড়িয়ে গিয়ে গাছের পাতায় মতন ঝর ঝর করে পড়তে লাগলো। তা শিষ দিতে পারে খুব ভালো আমাদের ভৈবরবাবু—একবার বরানগরের বাগানে গিয়ে খুব শিস দিয়েছিল আজ্ঞেসে এক কাণ্ড!
