হঠাৎ সচেতন হয়ে ভূতনাথ বললে— আচ্ছা, আমি আসি বৃন্দাবন—দেরি হয়ে যাচ্ছে ওদিকে আবার।
বৃন্দাবন বললে—তা হলে ওই কথাই রইল শালাবাবু।
—কী কথা?
বৃন্দাবন বললে—চুনী দাসী আমাকে পই পই করে বলে দিয়েছে যে।
-কী বলে দিয়েছে?
—আজ্ঞে সবার কাছে নতুন-মা শুনেছে যে, ছোটমা’র সঙ্গে আপনার খুব মাখামাখি—আপনাকে জামা-কাপড়-জুতো দিয়েছে ছোটমা, আপনাকে একটু পেয়ারের চোখে দেখে তিনি। বিধু সরকার তো সরাতেই চেয়েছিল আপনাকে বড়বাড়ি থেকে, খোরাকির খাতা থেকে নামও কেটে দিয়েছিল, কিন্তু ছোটমা’র কথাতেই তো রাখতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। তাই আপনাকে
একবার জানবাজারে দেখা করতে বলেছে নতুন-মা।
ভূতনাথ বললে—কেন, আমি কী করতে পারবে তার?
—তা জানিনে শালাবাবু, কিন্তু দেখা করতে আপনার দোষটা কী?
ভূতনাথ খানিকক্ষণ কি যেন ভাবলে। বললে—কিন্তু যে রকম ব্যাপার দেখছি, তাতে হয় তো বড়বাড়িতে আমি বেশিদিন থাকবো বৃন্দাবন।
—সে আপনি পারবেন না আজ্ঞে, ছোটমা আপনাকে ছাড়বে না।
ভূতনাথের রাগ হলো কথাটা শুনে। বললে—কেন ছাড়কে, ছোটবৌঠান আমার কে শুনি? আমি যদি ছেড়ে চলে যাই —কে আমায় আটকাতে পারে?
—পারে শালাবাবু, আটকাতে পারে ছোটমা, মধুসূদন কাকা সব বলেছে যে-নইলে ভেবে দেখুন না, এত লোক থাকতে এত রাতে আপনার সঙ্গে এত কথা বলি?
ভুতনাথ বললে–আচ্ছা, এখন তাহলে তুমি এসো বৃন্দাবন।
–তা হলে আপনি আসছেন তো?
—কথা দিতে পারছি না আমি কিন্তু ভেবে দেখি।
—আসবেন কাল ঠিক।
সে-কথার উত্তর না দিয়ে ভূতনাথ হন হন করে বিয়েবাড়ির দিকে চলে গেল।
২৫. ইতিহাসের একটা বাঁধা পথ আছে
ইতিহাসের একটা বাঁধা পথ আছে। জব চার্নক থেকে লর্ড ক্লাইভ। লর্ড ক্লাইভ থেকে ওয়ারেন হেস্টিংস। ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে লর্ড ডালহৌসি তারপর লর্ড ডালহৌসি থেকে লর্ড কার্জন। কিন্তু এটা সোজা পথ নয়। সোজা পথটা অনেকদিন হারিয়ে গিয়েছিল। রামমোহন রায়ের পর আর পথ ছিল না। তারপর আবির্ভাব হলো স্বামিজীর। স্বামী বিবেকানন্দ। কিন্তু ১৮৩৩ থেকে ১৯০২ অনেক দূর। এ-পথটারও নিশানা ঠিক ছিল না। মাঝে মাঝে তার আগাছা আর মরুভূমি। পথ খুঁজে বার করবার আগ্রহ হয় তত ছিল, ধৈর্য ছিল না। বিবেকানন্দর স্মৃতি প্রায় মুছে এসেছে। বড়বাড়িতে বাবুরা ঘুমে অচেতন। ছোটবৌঠান ‘মোহিনীসিঁদুরের মায়ায় আচ্ছন্ন। ছুটুকবাবু নতুন বউ নিয়ে উন্মত্ত। ব্রজরাখাল নিরুদ্দেশ। নিরাশ্রয় ভূতনাথ মায়াবী কলকাতার গোলকধাঁধা কূটচক্রে বিপর্যস্ত। নিবারণদের দল তখনও অসঙ্ঘবদ্ধ। সিস্টার নিবেদিতা শুধু একলা পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন।
কিন্তু সহজ পথটা দেখিয়ে দিলে লর্ড কার্জন। সিনেট হলে দাঁড়িয়ে কনভোকেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বললেন—তোমরা ভারতবাসীর মিথ্যেবাদী–সত্য, যাকে বলে truth, তা জানতে হলে জানতে হবে আমাদের কাছে—ইউরোপের কাছে।
সেদিন জবাদের বাড়ি থেকে ফেরবার পথে সিনেট হ-এর সামনে দিয়ে আসছিল ভূতনাথ। সামনেই দেখা হয়ে গেল নিবারণের সঙ্গে আবার। একলা নিবারণ নয়। কদমদা, শিবদাস, কুমুদ সবাই।
কদমদা’ বলছেন–ভালোই হলো নিবারণ, লর্ড কার্জন এক মহা উপকার করলেন আমাদের। এবার আমরা চিনতে পারবো নিজেদের।
নিবারণের চোখ দিয়ে তখন আগুনের হল্কা বেরুচ্ছে। বললে— এত বড় মিথ্যে কথা বলবে, আর আমরা সহ্য করবো কদমদা’।
কদমদা’ হাসলো, বললে—এই তো ভালো হলো রে বোকা। মনে করে দেখ স্বামিজী কী বলেছিলেন—তোমার দেবতা আজ চায় তোমার জীবন-বলি…আরো বলেছিলেন—আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত তোমার সামনে তেত্রিশ কোটি নয়, তোমার একমাত্র উপাস্য দেবতা-সে তোমার জননী জন্মভূমি, লর্ড কার্জন মনে না করিয়ে দিলে সে-তো ভুলেই গিয়েছিলুম রে।
ভূতনাথকে দেখেই নিবারণ বলে উঠলো—এই যে ভূতনাথদা’ —বড়দা’ এসেছে জানেন?
-কই না, এখনও তো আসেনি।
কদমদা’ বললে—আজকালের মধ্যেই আসবেন।
—আপনাকে চিঠি লিখেছে ব্ৰজরাখাল?
-কালই আর একখানা চিঠি পেয়েছি তার, লিখেছেন রওনা হচ্ছি—কিন্তু আমাদের আর অপেক্ষা করা যায় না। কার্জনের একখানা বই যোগাড় করতে হবে—‘Problems of the Far East’ বইখানা যেখান থেকে হোক যোগাড় করতে হবে নিবারণ–স্যার গুরুদাস চেয়েছেন বইখানা।
নিবারণ বললে—কেন?
—সিস্টার নিবেদিতার কাছে উনি শুনেছেন নাকি—বইটাতে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা লেখা আছে। কোরিয়ায় যখন ছিল কার্জন তখন ওখানকার লোকদের ধারণা ছিল চল্লিশ বছর বয়েস না হলে মানুষ বিচক্ষণ হয় না। কোরিয়ার মন্ত্রী যখন কার্জনের বয়স জিজ্ঞেস করলেন, কার্জন তখন সবে তেত্রিশ বছরে পড়েছে, কিন্তু মন্ত্রীর উত্তরে অনায়াসে বললে—চল্লিশ।
কুমুদ বললে—কথাটা হিতবাদী’তে ছাপিয়ে দিলে হয় না। কদমদা’।
কদমদা’ বললে–ছাপালে এর প্রতিকার হবে না ভাই, আমাদের এই ঘা খাওয়ার প্রয়োজন ছিল রে আজ। আমাদের এখন থেকে তৈরি হতে হবে–৩০শে আশ্বিনের জন্যে এখন থেকে তোড়জোড় করা দরকার—যেমন করে আনন্দমঠের সন্ন্যাসীরা মায়ের সামনে দীক্ষা নিয়েছিল, তেমনি করে শক্তির দীক্ষা নিতে হবে—তেমনি করে সবাই মিলে বলতে হবে—বন্দে মাতরম্—
পরে দেখেছিল ভূতনাথ ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ কার্জনের সেমিথ্যেবাদিতা ধরিয়ে দিয়েছিল। শুনেছিল—সিস্টার নিবেদিত নাকি মতিলাল ঘোষের কাছে ‘Problems of the Far East বইখানা নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিলেন।
