ভূতনাথ বললে-কিন্তু তোমার নতুন-মা?
—আমার নতুন-মা’র কথা বলছেন?
–হ্যাঁ, চুনী দাসী! ছিলো তো ঝিয়ের মেয়ে—সেই বা কী ভালো করছে শুনি ছোটবাবুর? ছোটবাবুর ওই তো শরীর, ওঁকে মদ খাইয়ে, টাকা দুয়ে নিয়ে কী সাশ্ৰয়টা হচ্ছে শুনি?
–তবে বলি শুনুন,—বৃন্দাবন আবার চারদিকে চেয়ে দেখে নিলে ভালো করে। বললে-নতুন-মা’র আমি পেটের ছেলেও নই সাতপুরুষের জ্ঞাতি-কুটুমও নই যে তার কোলে ঝোল টানবে, কিন্তু একথাও বলি, দশটাও নয় বিশটাও নয়, ছোটবাবুর ওই একটি তো মেয়েমানুষ, মেয়েমানুষ না হলে বাবুদের চলবেও না, কিন্তু আপনাদের শুধু-শুধু নতুন-মা’র ওপরে জ্বালা কেন বলুন তো? আর মেজবাবুর ক’টা মেয়েমানুষ গুণে দেখুন তো—পায়রার পেছনে, মোসায়েবের পেছনে তিনি কত টাকা উড়োচ্ছেন—আর ছোটবাবু তো কোথাও যান না, শুধু আসেন নতুন-মা’র কাছে, আর মদ খান–কিন্তু নতুন-মাকে মদ খাওয়াতে কে শেখালে শুনি? এখন যদি ছোটবাবু ছেড়ে দেন নতুন-মাকে, নতুন-মা’র এখন বয়স হয়েছে, এ-বয়েসে আবার কার কাছে গিয়ে হাত পাতেন বলুন তো-নতুন গাড়িটা পর্যন্ত বেচে দিতে হলো সেদিন—চলে কী করে? এক মণ চাল তা-ই কিনতে লাগে তিন টাকা—দশ আনা সের ঘি, পাঁচ আনা সরষের তেল—আর আমরা এতগুলো লোক বাড়িতে দু’বেলা খেতে
ভূতনাথের কেমন যেন রাগ হলো। বললে—কিন্তু মদ সোড আর বরফের খরচ তো ঠিক জুটছে।
বৃন্দাবন বললে—সে জুটছে কি না-জুটছে আমি আর পাপ মুখে তা বলতে চাইনে।
ভূতনাথ বললে—তা ছাড়া ছোটবৌঠান তার বিয়ে-করা বউ, তার কথা তোমার নতুন-মা একবার ভেবে দেখে না। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তার কেমন করে কাটে, ছেলে নেই, স্বামী থেকেও নেই, মেয়েমানুষ হয়ে মেয়েমানুষের এতবড় দুঃখ বুঝতে পারে না। ভাববা: তো একবার নিজের মা-বোনের কথা?
বৃন্দাবন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। খানিকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলে না। তারপর বললে—আপনি এতবড় কথা বললেন?
কাঁদো কাঁদো হয়ে এল বৃন্দাবনের মুখ। ছল ছল করে এল বৃন্দাবনের চোখ। সেই পাথুরেঘাটার গলির ভেতর অন্ধকারেও ভূতনাথ দেখলে—বৃন্দাবন যেন হঠাৎ বড় ঘা খেয়েছে। হঠাৎ যেন বোমা ফাটার মতো বৃন্দাবন বললে–ওই চুনী দাসী আমার কে হয় জানেন?
—কে?
তারপর এক নিমেষে যেন নিজেকে সামলে নিয়ে বৃন্দাবন বললে —না থাক, দরকার নেই–তার চেয়ে আমি যে-কথা বলতে এসেছি তাই বলি।
ভূতনাথ বাধা দিয়ে বললে—চুনী দাসী তত শুনেছি রূপোদাসীর মেয়ে-রূপোদাসী তোমার কে?
বৃন্দাবন মাথা নাড়তে লাগলো-না, না-না।
-কেন, বলতে বাধা কী?
—না শালাবাবু, যে-কথা কেউ জানে না এক আমি আর চুনী দাসী ছাড়া, সে কথা বলতে পারবো না আমি-বরং যে-কথা বলতে এসেছি, সেটা বলে নিই। পেটের দায়ে সবই করি, কিন্তু লজ্জা, সরম, আমাদেরও আছে শালাবাবু, নতুনমা’র চাকর বলে সবাই জানে আমাকে, তাই জানুক। দেশে থাকলে আমাদের দু’বেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, এমন আকালের দেশ, কিন্তু দেশে-গাঁয়ে সমাজ আছে, পঞ্চায়েৎ আছে—এ সব জানলে ‘এক ঘরে’ করবে যে।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ভূতনাথ বললে—তা আমাকে কী করতে হবে বলে?
-আপনি সব পারেন শালাবাবু!
—আমি? যেন বিদ্রূপের মতো শোনালো কথাটা।
বৃন্দাবন বললে—আমি বংশীর কাছে গিয়েছিলাম, তা বংশী আমাকে তেড়ে মারতে এল। মধুসূদনের মুখে শুনলাম ছোটবৌঠানকে মদ ধরিয়েছে বংশী, ভালোই করেছে, তার উপযুক্ত কাজই করেছে। সেদিন নাকি সাত ঘণ্টা অজ্ঞান অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল, শেষে ডাক্তার ডাকতে হয়। বংশীর হাতেই মদের আলমারির চাবি কি না, কর্তা-গিন্নী দুজনে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকলে বংশীরই সুবিধে, দুই ভাই-বোনে দেশে ফিরে গিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে থাকবে।
ভূতনাথ প্রতিবাদ করতে গেল—সব মিথ্যে কথা বৃন্দাবন।
বৃন্দাবন সে-কথা কানে না তুলে বলতে লাগলো—আর করবে–ই বা কেন, লোচন দর্মাহাটায় ঠেলাগাড়ির ঠিকেদারি নিয়েছে, মধুসূদন জমি-জিরেত কিনেছে দেশে, বিধু সরকারও কাজ গুছিয়ে নিয়েছে বেশ, কেউ বাদ যায়নি, চাকরি যদি চলেও যায়, কারো অসুবিধে হবে না, পারলাম না শুধু আমি।
ভূতনাথ বললে—পারোনি কেন?
—আজ্ঞে আমিও পারিনি, আপনিও পারেননি, অথচ বৌঠানের সঙ্গে আপনার ভাব—ছোটবৌঠানের সিন্দুকে গয়না-গাটি যা আছে তাই-ই একটা একটা করে ফুরোতে জীবন কেটে যাবে, মদের নেশায় কোথায় থাকবে চাবির গোছা আর কোথায় থাকবে হিসেব—তা আপনি না নেন, নেবে বংশীবংশী আর ওর বোন চিন্তা।
রাত গভীর হয়ে এল। বিয়েবাড়িতে নহবৎ-এ কানাড়ার আলাপ বড় করুণ আবেদন জানাচ্ছে। এই মুহূর্তে কানাড়ার মূৰ্ছনার মধ্যে যেন জবা, ছোটবৌঠান, চুনী দাসী ছাড়াও রাধা, আন্না, সকলের মনের নিভৃততম কামনাটি মূর্ত হয়ে উঠতে লাগলো ভূতনাথের মনে। কলকাতার এই নির্জনতম অংশে পচা ডোবার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হলো—আবার যেন সকলের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে সে। বাইরে থেকে সবাই পরস্পর-বিরোধী—কিন্তু আসলে সবাই এক। কেউ ঘৃণা দিয়েছে, কেউ তাচ্ছিল্য, কেউ ভালোবাসা, কেউ বা স্নেহ, কেউ করেছে বিদ্রূপ। কিন্তু সকলের সঙ্গে আজ এই মুহূর্তে ওই কানাড়া রাগিণীর মূছনার পটভূমিকায় এক নিবিড় যোগ স্থাপন হয়ে গেল হঠাৎ। যে তাচ্ছিল্য করেছে, যে কেবল বিদ্রূপ করেছে, তার সঙ্গে যে ভালোবেসেছে তার আর কোনো পার্থক্য রইল না। ওরা সবাই এক। সবাই এক। এখানে এই অন্ধকার পরিপ্রেক্ষিতে যেন সকলের অন্তস্তল পর্যন্ত এক অলৌকিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। হয় তো এ শুধু অন্ধকারের ছলনা কিম্বা হয় তো কানাড়া রাগিণীর ভুল বকা, নয় তো এইটেই বোধ হয় অনন্তকালের চরমতম সত্য!
