ভূতনাথ বললে-বদরিকাবাবুকে দেখেছো নাকি লোচন? এসেছেন তিনি?
–না আজ্ঞে, তিনি তো এলেন না, বললাম অতো করে। তিনি পাগল-ছাগল মানুষ, বললেন—আমি চলে গেলে ঘড়ি মেলাবে কে? তা ইদিকে দেখেছেন—ব্যবস্থার কোনো ছিরিছাঁদ নেই, ফুলের মালা, আতরপানি, সবই তো করেছে কিন্তু আসল জিনিষই বাদ দিয়েছে।
—আসল জিনিষ কী?
—আজ্ঞে, লক্ষ্য করছেন না, মেজবাবুর মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠেছে!
–কেন?
-আমি তো সেই জন্যেই ঘুরঘুর করছি, সন্ধ্যে থেকে এতখানি হুজুৎ গেল, তার ওপর রাস্তায় ছেনি দত্তর বাড়ির কাছে যে কাটা হয়ে গেল, এর পর মেজবাবুর কি মেজাজ ঠিক থাকে? গাড়িতে সঙ্গে যা ছিল, সব তত ভৈবববাবু, মতিবাবু, তারকবাবু ওঁয়ারা শেষ করে দিয়েছে। আমি তো তাই তখন থেকে ভাবছি এ কী রকম বড়লোক, তামাকের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেনি!
সত্যিই তো! ভূতনাথের এতক্ষণে খেয়াল হলো। মেজবাবু যেন অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে মুখ বুজে রয়েছেন। বিয়ে সেই রাত বারোটার পর। সুতহিবুক লগ্ন। ততক্ষণ মেজবাবুর মতো বরকর্তা কি উপোস করে থাকবেন নাকি! লোচনের কিন্তু সব দিকে নজর আছে। মেজবাবু চিৎকার করে ডাকলেন—লোচন
-–ওই ডাকছেন, আসি হুজুর—বলে এক ঝটকায় লোচন ঘরে ঢুকে গেল।
ওপাশে পূজোবাড়ির দরদালানের ওপর ছুটুকবাবুকে বসিয়েছে। মোটা-সোটা শরীর। দূর থেকে বোঝা যায়, বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেজে-গুজে বেশ সুন্দর মানিয়েছে বরকে। মাথার রঙিন পালক লাগানো রেশমী পাগড়িটা এখন নামিয়ে রেখেছে। কিন্তু সাটিনের চুমকি-বসানো পাঞ্জাবীর ওপর হীরের লকেট বসানো হারটা ঝকমক করছে। দু’হাতে তাগা, আর কানে মুক্তোর কান—মনে হয় যেন ঠিক সোনার কার্তিকটি। পাশে কান্তিধর, পরেশ, সবাই রয়েছে। লাল মখমলের তাকিয়ায় মাঝে মাঝে হেলান দিচ্ছে। ছুটুকবাবুর তো নেশাটা-আশটার দরকার হবে। রাত বারোটা পর্যন্ত থাকবে কী করে!
ভূতনাথ এবার বারান্দা পেরিয়ে নেমে রাস্তার সামনে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ যেন মনে হলো চেনা মুখ একজন লোক তার দিকে চেয়ে আছে। খানিক চেয়ে থাকতেই লোকটা সামনে এগিয়ে এল। এ কি! বৃন্দাবন না! চুনীদাসীর চাকর!
বৃন্দাবন সামনে এসে দাত বার করে হাসতে লাগলো।
ভূতনাথ বললে—তুমি এখানে?
বৃন্দাবনের আর সে চেহারা নেই। এই রাত্রের অন্ধকারেও যেন কামিজের ফাঁক দিয়ে গলার কণ্ঠা দেখা যায়। পানের ছোপ লাগা দাঁতগুলো মিশিমিশে কালো। শেষ ফোকা বিড়িটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলে বৃন্দাবন।
ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে—এত রাতে এখানে কী করতে?
—আপনার কাছেই এইছিলাম।
—আমার কাছে? ভূতনাথ আরো অবাক হয়ে গেল।–আমার কাছে কী করতে?
বৃন্দাবন খানিক ইতস্তত করলো যেন। বললে—একটু কথা ছিল, আসুন না, একটু নিরিবিলিতে আসুন—বলছি।
আর একটু নিরিবিলিতে এসে দাঁড়াতে হলো। হৈ চৈ হট্টগোল যা কিছু সব পাশে ফেলে এসে দাঁড়ালো গলিটার কোণে। এটো কলাপাতার পাহাড় জমেছে রাস্তার কোণে। ঝুড়ি ভরতি এনে ফেলছে ওখানে। কয়েকটা কুকুর খাওয়া-খাওয়ি লাগিয়েছে তাই নিয়ে। খাসগেলাশের নেভানো ঝাড়গুলো কাত করে রেখেছে দেয়ালের গায়ে। নকল মোম পোড়ার গন্ধও আসছে নাকে।
বৃন্দাবন বললে—এখানে নয় আজ্ঞে, ওই দিকটায় চলুন—আর একটু নিরিবিলি চাই।
ভূতনাথ আরো নিরিবিলিতে সরে চললো। এখানটায় একটা পুরোনো ভোবা বোজানো হচ্ছে। গাড়ি গাড়ি আবর্জনা বুঝি দিনের বেলা ফেলা হয় এখানে। সবটা বুঝি বোজানো হয়নি এখনো। আবর্জনাতে বুঝি আগুন লাগানো হয়েছে। ওদিকটা দুর্গন্ধময় ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে।
বৃন্দাবন বললে—আপনাদের বড়বাড়ি গিয়েছিলাম এখন।
–কেন?
–দরকার ছিল যে আপনার সঙ্গে গিয়ে দেখলাম সবাই এবাড়িতে, তাই হাঁটতে হাঁটতে আবার এলাম এখেনে, পা দুটো একেবারে টন টন করছে—বংশী কোথায়?
ভূতনাথ বললে-বংশী তো আসেনি।
—আসেনি তত ভালোই হয়েছে—ও বেটা ভারী বজ্জাৎ। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলছি জানতে পারলে মুণ্ডু খেয়ে ফেলবে আমার।
—কিন্তু বংশীর ওপর তোমার অত রাগ কেন বৃন্দাবন?
—আজ্ঞে, বংশীই তো যতো নষ্টের গোড়া, ছোটবাবুকে ফুসলে নিয়ে গেল কে শুনি? সেই যে কথা আছে না, ‘মাছ খায় না যতনে, পাতে তিনটে খোলসে’-ও হলে তাই শালাবাবু, ওকে আপনি চিনবেন না সহজে, ওর মতলব যে আলাদা, নইলে ছোটবউরাণীকে মদ ধরায় ও
—এ সব তোমায় কে বললে বৃন্দাবন?
–শুনতে পাই আজ্ঞে সব, নতুন-মা ও-বাড়িতে যে অতদিন ছিল, সবাইকে জানে যে—ওই বাড়িতে কাজ করে মধুসূদন বড়লোক হয়ে গেল, বালেশ্বরে জমি-জিরেত কিনেছে, লোচন তামাক সাজে টিপে টিপে, কিন্তু তলে তলে ওদিকে ঠিকে নিয়েছে ঠেলাগাড়ির, দর্মাহাটায় গেলেই দেখতে পাবেন–আর ওই যে আপনাদের বিধু সরকার—বিধু সরকারকে দেখেছেন নিশ্চয়ই
ভূতনাথ ঘাড় নাড়লো।
—ওই বিধু সরকার, আপনাকে আজ বলে রাখি, বাবুদের জমিদারী দেখবার তত সময় নেই, কত বিঘে জমিতে কত ধান হয়, তারও হিসেব রাখেন না, রাখবার সময় কখন, কিন্তু নায়েবের সঙ্গে যোগসাজস করে কী সব্বনাশ যে করছে তা একদিন না একদিন টের পাবেন—নইলে সুখচরের যে-জমিতে সোনা ফলতত সেই জমিতে এখন তিন মণ ধানও হয় না। প্রেজা বিলির যখন সময় হয়, তখন সেলামী যা আসে তার কি আদ্দেকও ওঠে বাবুদের খাজাঞ্চীখানায়?
ভূতনাথ যেন কেমন অবাক হলো। বললে-এতো কথা তত তোমার জানবার কথা নয় বৃন্দাবন–তুমি সব জানলে কী করে?
বৃন্দাবন চুপ করে রইল। তারপর খানিক পরে বললে—জানে সবাই শালাবাবু, ওই বংশী, লোচন, মধুসূদন, ইব্রাহিম, যদুর মা, সৌদামিনী, বিধু সরকার, এমন কি বিরিজ সিং পর্যন্ত সবাই জানে। জানেন না কেবল বাবুরা আর বিবির আর জানেন না আপনি পারা কখনও চাপা থাকে আজ্ঞে?
