ভূতনাথ হাঁ করে দেখছিল—হাবুল দত্তর দিকে। ছুটুকবাবুর শ্বশুর। উঠতি বড়মানুষ। নতুন উঠছে এখন। বড়বাড়িতে মেয়ে দিতে পেরেছে এটা ওঁরই গর্ব। আজ ওঁর আত্মীয়স্বজনের অভাব নেই। হাবুল দত্তকে কোনো দিকে দেখতে হচ্ছে না। সবাই রয়েছে। এবার একটা নতুন পাটকল করবার ইচ্ছে আছে। আর কয়লার খনি। ব্যবসা-বাণিজ্য কল-কারবার যে-রকম বাড়ছে চারদিকে, তাতে কয়লার চাহিদা বেড়ে যাবে ক্রমেই। এই দেখুন না, রাণীগঞ্জে গিয়েছিলাম—এখনও অনেক খনি পড়ে রয়েছে। নিতে পারলে টাকা রাখবার জায়গা থাকবে না। আর শুধু তো জমিদারিতে চলছে না কারো। অজন্মা হলো গ্রামে তো প্রজারা দিলে না খাজনা। তা বলে তো আর রাজস্ব বন্ধ থাকবে না। রাত কাবার না হতে হতে কালেক্টরিতে খাজনা জমা করে আসতে হবে। প্রজা ঠেঙিয়ে আর কতকাল আয় হবে বলুন। তারপর বেহ্মরা যে-কাণ্ড করছে, সব প্রজারা লেখাপড়া শিখতে লেগে গিয়েছে দেশে। মেয়েরা পর্যন্ত লেখাপড়া শিখছে মশাই। শেষে এমন দিন আসবে যখন ছোটলোক প্রজা-পাঠক আর মানতেই চাইবে না জমিদারদের। তখন? তখন গাড়ি-ঘোড়া, পাল্কি, বেয়ারা, বাবুয়ানি চলবে কী করে!
হাবুল দত্ত গল্প জমাতে পারে বেশ। বললেন—ছোটবেলায় আপনারাও দেখেছেন, আমিও দেখেছি, চিৎপুর রোডের ওপরেই যে ঠিকে গাড়ির আড্ডা ছিল, ওইখানে থাকতো বটুবাবু। সারাদিন ভোর থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত বটুবাবু বসে থাকতো। একটা বেঞ্চির ওপর। একটা হাত-গড়গড়া ছিল, তাইতে তামাক পুড়ছে। দিনরাত খ্যাচ খ্যাচ করতে গাড়োয়ানদের সঙ্গে। ঘোড়ার দানা কম দিয়েছে, কি ভালো ডলাই-মলাই হয়নি দেখতাম সারাদিন ওই একভাবে বসে। বাঙালীর ছেলে অমন কেউ পারবে মশাই, ও হিন্দুস্থানী বলেই তো পারতো।
ভৈরববাবু বললে—বাঙালীদের কেবল বাবুয়ানিই সার।
হাবুল দত্ত বললেন—তবে শুনুন, আমার আপিসে একজন বাঙালী ছোকরাকে রেখেছিলাম—দশ টাকা মাইনে দিতাম, একদিন দেখি ফুলদার রেশমী মোজা পায়ে আর ডসনের বাড়ির বার্নিশ করা জুতো পরে আপিসে এসেছে। এদিকে নানা রকম ফুর্তি টুর্তি করে শরীরটাকে তো অকেজো করেই রেখেছিল। একদিন বলা নেই কওয়া নেই ফট্ করে মরে গেল—আর দেখুন তো মাড়োয়ারীদের—ওরা লক্ষ টাকা আয় না হলে এখনও মশারি কেনে না মশাই।
মেজবাবু এতক্ষণ গম্ভীর হয়ে শুনছিলেন। এবার কথা বললেন। বললেন—কিন্তু ওরা বড় চশমখোর, কী বলেন।
–তা যদি বলেন তবে আমিও একটা গল্প বলি—শুনুন—হাবুল দত্ত পায়ের ওপর পা দিয়ে বসলেন।
—সেদিন নতুন যে হ্যারিসন রোড হয়েছে না, ওইখান দিয়ে যাচ্ছি, টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, হঠাৎ একটা মাড়োয়ারীর ছেলে দেখি আমার সামনে এসে বলছে—এক পয়সায় দুটো দেশলাই, কিনবেন বাবু?
আমি তো চমকে উঠলাম। গুলজারীলাল আমাদের পুরোনো বন্ধু। বড়বাজারের অতবড় লোহা মার্চেন্ট, তার ছেলে কিনা রাস্তায় দেশলাই বেচছে।
গুলজারীলালকে ধরলাম সেদিন দর্মাহাটায়। বললাম—তোমার ছেলে কিনা শেষে দেশলাই বেচছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে!
গুলজারীলাল বললে—ওটা যে আমাদের নিয়ম ভাই। পাঁচ বছর বয়েস থেকে কিছু না কিছু আয় করতে হবে-দিনে অন্তত তিন আনা।
আমি তো শুনে অবাক! তিন আনা পয়সা আয় করলে তবে নাকি সেদিন পুরো খোরাকি পাবে, আদ্দেক আনলে আধ-খোরাকি, আর কিছুই না আনতে পারলে উপোস—তা দেখবেন এই কলকাতাই একদিন মাড়োয়ারীতে ভরে যাবে মশাই। হ্যারিসন রোডে যতগুলো বাড়ি হলে সব তো মাড়োয়ারীদের।
হঠাৎ গল্পে বাধা পড়লো। কে যেন একজন শশব্যস্তে এসে বললে–ননীবাবু এসেছেন কর্তাবাবু!
—ননীবাবু? কোথায়? বলে হাবুল দত্ত ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়লেন।
হাবুল দত্ত উঠে যেতেই ভৈরববাবু বললেন—না স্যার, বেয়াই মশাই লোহার ব্যবসা করে করে একেবারে মাড়োয়ারী হয়ে উঠেছে দেখছি—রস কষ নাস্তি।
মেজবাবু পান চিবুচ্ছিলেন। বললেন—যা বলেছো—টাকাটা চিনেছে খুব।
মতিবাবু বললে—তা আপনার সঙ্গে হাবুল দত্তর সম্পর্কটা কিসের স্যার। আপনি মেয়ে নিয়ে গিয়ে খালাস। আপনি তো আর ছেলে বেচতে আসেন নি এ-বাড়িতে?
কিন্তু ভূতনাথ তখন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছে। ননীবাবু এসেছে। কোন্ ননীবাবু! ডাক্তারবাবুর ছেলে ননীলাল! তাকেই এত খাতির! কয়েকজন কর্তাব্যক্তি উঠে গেলেন বাইরে। ভূতনাথ একবার বাইরে এসে দাঁড়ালো সবার অলক্ষ্যে। লোক গিস গিস করছে। সামনে খোলা জায়গাটায় ঘোড়ার গাড়ির ভিড়। মাঝখানে একটিমাত্র মোটর। বিয়েবাড়ির রোশনাই লেগে সমস্ত মোটরটা চক চক করছে। গোল গোল চারটে চাকা। মাথার ওপর ছাদের মতন করে মোটা চটের কাপড়ে ঢাকা। কয়েকজন তাই-ই হাঁ করে দেখছে।
বেশ জ্বল জ্বল করছে চেহারাটা। জানবাজারের চুনীবালাকেও এমনি গাড়ি কিনে দিয়েছে ছোটবাবু। এখন তো এমনি চুপচাপ। একটু কল চালালেই ভোঁ ভোঁ শব্দ করে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে চলবে। পেছন দিয়ে ধোঁয়া বেরোবে।
—এই, হাত দিবিনি কেউ।
–গাড়ির কাছে কে যায়?
চারদিকে ছুটোছুটি। লাল বনাতের কাপড়ের ওপর দিয়ে বরযাত্রীরা এসেছে—সেটা ধুলোয় ধুলো হয়ে উঠেছে। ফুলের মালার টুকরো-টাকরা ছড়িয়ে আছে সারা জায়গাটায়। ফুলের গন্ধ! রান্নার গন্ধ! চারদিকে যেন নানা রকম গন্ধের উৎসব। বড়বাড়ির লোকজন ঝেটিয়ে এসেছে এখানে।
লোচন যাচ্ছিলো পাশ দিয়ে। ভূতনাথ ডাকলে—কী, লোচন নাকি? চলেছে কোথায়?
লোচন থেমে গেল। বললে—এই যে শালাবাবু, দেখি কুটুম বাড়ির তামাক-বিড়ির ব্যবস্থাটা কেমন, পরশু তত আবার বড়বাড়িতে আমাকেই সব করতে হবে কিনা।
