ফায়ার করলে ব্রিজ সিং। কিন্তু আকাশের দিকে মুখ করে।
সমস্ত শিবু ঠাকুরের গলি কাঁপিয়ে সে-শব্দ আকাশে গিয়ে ফাটলো।
আর একবার। আবার আর একবার–
হৈ হৈ করে ততক্ষণে পুলিশ কনস্টেবল দৌড়ে এসেছে মেজবাবুর কাছে। ইন্সপেক্টর সাহেবও দৌড়ে এসেছে।
—হোয়াটস্ আপ, কী হলো? দারোগা সাহেব মেজবাবুর সঙ্গে কী কথা বললে যেন কানে কানে।
রোশনচৌকির দল ততক্ষণে বাজনা থামিয়ে দিয়েছে হতবুদ্ধি হয়ে। খাস-গেলাশের ছেলেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে লাইন ভেঙে পালাচ্ছে। হৈ হৈ হট্টগোল চারদিকে। আশে পাশের বাড়ির জানালা খুলে যারা এতক্ষণ বর দেখছিল তারা দমাদম দরজা বন্ধ করে দিলে। বড়লোকের ব্যাপার। দরকার কী হ্যাঙ্গামে!
ইতিমধ্যে পুলিশ আর দারোগার দল কি কল টিপে এল কে জানে। দেখা গেল শবযাত্রা পিছু হটছে। পিছু হটতে হটতে একেবারে শিবু ঠাকুরের গলির মুখে গিয়ে এক পাশে এসে দাঁড়ালো। নটে দত্ত দাতে দাত ঘষছে তখন। পুলিশ দারোগা পাশে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। মেজবাবুর গাড়ি সপারিষদবরের চতুর্দোলার পেছন পেছন মন্থর গতিতে এগিয়ে চললো। ভূতনাথ এতক্ষণ চুপ চাপ দেখছিল। কেমন যেন অবাক হচ্ছিলো দেখে। এত বড় একটা সমস্যার এমন নির্বিরোধ সমাধান হলো দেখে অবাক হবারই কথা। বড়বাড়ির এই জয়যাত্রা। সেদিন হয় তো নির্বিঘ্নেই গন্তব্য স্থানে পৌঁছুতে পেরেছিল—কিন্তু ইতিহাসের অদৃশ্য ইঙ্গিত এড়াতে পারে নি কেন শেষ পর্যন্ত। সেদিনও তো বন্দুকের ফায়ার করা চলত। দারোগা পুলিশকে ঘুষ দেওয়া চলতো। কিন্তু বদরিকাবাবু জানতে–সেখানে ইতিহাস বড় নির্মম। দারোগাকে ঘুষ দিয়ে তার গতি ফেরানো যায় না।
ছোটবৌঠান পুরোনো সিন্দুকের ডালা খুলে একদিন বলেছিল—এ যা কিছু দেখছে ভূতনাথ, সব আমার—এই হীরের কঙ্কন, মোতির চূড়, পান্নার কান আর মিছরিদানা চুড়ি, সব স-অ-অ-ব-
ভূতনাথ সিন্দুকের ভেতর মাথা নিচু করে দেখেছিল—ফাঁকা সিন্দুক। একটা কণাও আর বাকি নেই কোথাও। সিন্দুকের প্রত্যেকটি কোণ নিঃস্ব। হা হা করছে অন্ধকার প্রেতগর্ভ খালি সিন্দুকটা। কিন্তু তবু ছোটবৌঠানের অপ্রকৃতিস্থ দৃষ্টির সামনে কিছু বলতে সাহস পায়নি সেদিন।
ছোটবৌঠান তখন টলছে। গায়ের শাড়িটা খুলে খুলে পড়ে যাবার উপক্রম করছে বার বার। সমস্ত শরীর আঙুরের থোলোর মতো টলমল করে ছোটবৌঠানের। আবার বললে ছোটবৌঠানএই সব দিতে পারি, কিন্তু তুই আমাকে কী দিবি বল?
ভূতনাথ বলেছিল—কী চাও তুমি ছোটবৌঠান—আমি তো গরীব মানুষ।
—তোকে আমি বড়লোক করে দেবো ভূতনাথ, ভয় কী? এই বাড়ি, বড়বাড়ির সব সম্পত্তি দিয়ে যাবো, তুই আরাম করে থাকবি এখানে—পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে।
কী জানি ভূতনাথের কেমন যেন ভয় হয়েছিল সে-কথা শুনে। ছোটবৌঠান কী বলছে তা সে নিজেই জানে না। ছোটকর্তা যে এখনও বেঁচে! এ বলে কী ছোটবৌঠান!
ভয়ে ভয়ে ভূতনাথ বলেছিল—আমি কিছু নিতে চাই না বৌঠান। আমি কিছুই চাইনে।
ছোটবৌঠান নেশার ঘোরে হাউ হাউ করে কেঁদে ভাসিয়েছিল সেদিন। বলেছিল—তুই বেইমান, মস্ত বড় বেইমান, বেইমান তুই ভূতনাথ।
পাশের ঘরেই ছোটকর্তা অসুখে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। হয় তো কান্না শুনতে পাবে ছোটবৌঠানের। ছোটবৌঠানের মুখে হাত চাপা দিয়েছিল ভূতনাথ। বলেছিল
কিন্তু সে-সব কথা এখন থাক!
পাথুরেঘাটার দত্ত বাড়িতে তখন বরের চতুর্দোলা পৌঁছে গিয়েছে। এক শ’ শাখ বেজে উঠেছে একসঙ্গে। অন্দরমহল থেকে হুলুধ্বনি কানে এল। কন্যাকর্তা সামনে এগিয়ে এসে ছুটুকবাবুকে কোলে করে আসরে নিয়ে গেলেন। বিরাট পূজোবাড়ি জুড়ে বরের আসর বসেছে। গোলাপ জল ছড়িয়ে দিয়ে গেল সকলের গায়ে। গোড়ের মালা দিলে সকলের হাতে হাতে।
মেজকর্তা গিয়ে বসেছেন একেবারে আসরের মধ্যেখানে। আসর আলো হয়ে গিয়েছে।
ছুটুকবাবুর শ্বশুর ব্যবসাদার লোক। স্টাণ্ড রোডে আটার কল বসিয়েছেন। ঢালাই লোহার ব্যবসাও আছে। কিন্তু তারও গায়ে গিলেকরা মলমলের দামী পাঞ্জাবী। সামনে এগিয়ে এলেন হাসিমুখে। বললেন—ছোটকর্তাকে দেখছিনেকই?
-না, তার শরীরটা খারাপ হয়েছে আজ, আসতে পারলে না আর।
—বিশেষ কিছু ভয়ের ব্যাপার নাকি?
-না, শরীরটা তার প্রায়ই খারাপ হয়—আসবার ইচ্ছে ছিলো খুব।
আরো দু’একটা কথা হলো।
—এই আমার বড়জামাই, পটলডাঙার সরকার এরা।
—এই আমার…এঁকে তো দেখেছেন।
—আর, এই হলো—
চারিদিকে ঝাড় লণ্ঠন। আলো জ্বলছে। ইলেটি ক আলো এ-বাড়িতেও হয়েছে। তবু বাহার হিসেবে ঝুলছে টানা পাখাগুলো। এখনো খোলা হয়নি। বড় বড় আয়না চারদিকের দেয়ালে টাঙানো, মানুষ সমান উঁচু। দেয়ালে পঙ্খের ছবি আঁকা। ফুল লতা পাতা। সবুজের ওপর কালো নীল হলদে রং-এর কাজ। ভূতনাথ একপাশে আড়ষ্ট হয়ে সব দেখছিল। এখানে তার যে কী পরিচয় দেবার আছে! কী পরিচয়ে এখানে এসেছে সে। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতেই মুশকিলে পড়ে যেতে হবে।
হঠাৎ বাইরে সোরগোল উঠলো।
সঙ্গে সঙ্গে মোটরের শব্দ। কোনো সম্মানিত অতিথি যেন এসে গিয়েছে। কয়েকজন মোটর দেখতে ছুটলো। মোটরগাড়িটা একেবারে সামনের ঘেরা জায়গাটার ভেতর ঢুকে পড়েছে বুঝি। কয়েকটা ঘোড়া ভয় পেয়ে শব্দ করে উঠলো। গোঁ গোঁ আওয়াজ চলছে মোটরের। তারপর একটা বিকট শব্দ করে যন্ত্রটা থেমে গেল একেবারে।
হাবুল দত্ত দু’পুরুষের বড়লোক। কিছুদিন আগেও খাটো ধুতি পরেছেন ওঁর বাবা। যখন কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট তৈরি হয়, সেই সময়ে লটারিতে বহু টাকা হাতে এসে যায় তার। সেই টাকা খাটিয়ে বড়বাজারের লোহাপটিতে দোকান করেছিলেন। সঙ্গে ছিল আর একজন কর্মকারের ছেলে। বুদ্ধি তারই। টাকাটা হাবুল দত্তর বাবার। তারপর কোথায় গেল কামারের ছেলে, আর কোথায় গেল তার শেয়ার। পুরো মুনাফাটা এসে গেল দত্তবাড়ির কবলে। কী একটা বড় রকমের ঠিকেদারিতে বেশ লাভ হতে লাগলো কয়েক বছর ধরে। তখন কিনলেন আটার কল। কল দেখতে সে কী ভিড় রাস্তায়। চাকাটা বন বন করে ঘোরে আর একটা নল দিয়ে পেষা আটা বেরিয়ে আসে। আটা না পিষে চালও পিষতে পারে। ছাতু তৈরি করতে পারো। তারপর এই পাথুরেঘাটার বাড়ি দেখছেন। মেয়েদের বড় বড় ঘরে বিয়ে। লক্ষ্মীর বরপুত্র হয়ে মারা গেলেন তিনি। তখন সমস্ত সম্পত্তি হাতে এল নাবালক হাবুল দত্তর।
