ধীরে ধীরে মন্থর গতিতে চতুর্দোলা চলেছে। পাথুরেঘাটায় দত্তবাড়িতে গিয়ে একেবারে থামবে এ মিছিল। সামনের ময়ূরপঙ্খীতে খেমটা নাচ, নকলবাবুদের গাড়িতে হৈ হুল্লোড় আর দু পাশে ছেলে-ছোকরাদের কাঁধে খাস-গেলাশের ঝাড়। রোশনচৌকির তালে তালে মিছিল চলেছে। বৌবাজার স্ট্রীটের দু পাশের বাড়ির জানালা দরজায় মেয়ে পুরুষের ভিড়।
–বাঃ, বরকে বেশ মানিয়েছে দ্যাখ।
–ও মা, কী সুন্দর নাচছে দেখো।
—হ্যাঁগা, কনের বাড়ি কোথায় গা?
সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কনস্টেবল চলেছে পাহারা দিতে দিতে। আগে, পেছনে, পাশে। বাইরের কেউ যেন না ঢুকে পড়ে ভেতরে। খুব হুঁশিয়ার। কোনো ছোকরা যেন খাস-গেলাশের ঝাড় নিয়ে
পালায়।
–এই শালা, ভাগো, উধার ভাগ যাও!
মাঝে মাঝে ভৈরববাবু, মতিবাবু, তারকবাবুর উল্লাস-ধ্বনি শোনা যায়। কেয়াবাৎ বুড়ো বাঈজী—ঘুরে ফিরে–
মেজবাবুর দল বরের চতুর্দোলার পেছনেই। আজ বেশ রঙ-এ আছেন মেজবাবু। দিল-দরিয়া মেজাজ। এক-একটা তুবড়ি ফোটে আর হা-হা-হ্যাঁ করে ওঠে মোসাহেবদের দল। গাড়ির তলা থেকে বোতল বেরোয়। বনেদী রক্ত আরো গরম হয়ে ওঠে।
ছুটুকবাবুর বন্ধুরাও আছে পেছনে। কান্তিধরের গলার জোর বেশি। কোত্থেকে একটা ছোট টিনের বাক্স যোগাড় করেছে। সেইটেই ড়ুগিতবলা করে বাজায়। মাঝে মাঝে চিৎকার করে ওঠে—আহা-হা, তালে ভুল হলো যে, মেরে খোঁপার খাঁচা উড়িয়ে দেবো বেটির।
কিন্তু বিপদ বাধলো ঠনঠনের শিবু ঠাকুরের গলির ভেতর ঢুকে। আস্তে আস্তে মিছিল ঢুকছে গলির ভেতর। পাথুরেঘাটায় কনের বাড়ি যেতে হলে এ-গলি পেরোতে হবে। চতুর্দোলা বরকে নিয়ে, ঢুকে পড়েছে। মেজবাবুর গাড়িও ঢুকেছে। ছুটুকবাবুর বন্ধুদের গাড়িও ঢুকতে যাবে এমন সময় ওপাশ থেকে সমবেত গলার আওয়াজ এল—বল হরি, হরি বোল—বল হরি, হরি বো-ও-ও—সঙ্গে খোল কর্তালের হরি-সঙ্কীর্তন।
রাত্রের অন্ধকারে কিছু দেখতে না পাওয়ার কথা কিন্তু খাসগেলাশের আলোয় সমস্ত গলিটা তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দেখা গেল গলির ওপাশ থেকে আর একটা মিছিল আসছে। বিয়ের বরযাত্রীর মিছিল নয়। আনন্দ উৎসব নয়। শবযাত্রা!
কে যেন বললে-কে মরেছে গো?
—কে জানে, কোন্ শালা মরেছে, মরবার আর সময় পেলে না।
সত্যি তো! মরবার সময়-অসময় নেই! মরলেই হলো! আর ঠিক এই সময়েই তার শবযাত্রা! বর বেরিয়ে যাক, বরযাত্রীরা বেরিয়ে যাক—তবে ত!
মেজবাবু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।—দেখে তো ভৈরব, কে? কে মরলো আবার!
ভৈরববাবু গাড়ি থেকে নামলো। সাধারণ কেউ নয় নিশ্চয়ই। নইলে এত জাঁক। পালিশ করা সেগুন কাঠের খাট। ফুলে একেবারে ছেয়ে গিয়েছে, ভরে গিয়েছে। ধামা-ধামা খই ছড়াচ্ছে। আনি দোয়ানি টাকা ছড়াচ্ছে। রোশনাই রয়েছে। লোকজন প্রচুর। পেছনে ল্যাণ্ডে গাড়ি, হাম, ব্ৰাউনবেরি, ব্যারুষ ওদের দলেও রয়েছে। সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। চিৎকার করছেবল হরি হরি বো-ও-ও-..
ভৈরববার কোঁচা হাতে নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে খবর দিলে—সর্বনাশ হয়েছে মেজকত্তা—ছেনি দত্ত মারা গিয়েছে।
সবাই শুনলে। ছেনি দত্ত! ঠনঠনের ছেনি দত্ত! মেজবাবুর পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী। এত দিনে মারা পড়লে তাহলে। মেয়েমানুষ নিয়ে খড়দ’র রামলীলার মেলায় রেষারেষি হয়েছে বছরের পর বছর। গঙ্গার বুকে নৌকোয়, পানসিতে প্রতিযোগিতা। পায়রা ওড়ানো নিয়ে সেদিন পর্যন্ত লড়াই হয়েছে, মামলা হয়েছে আদালতে। মেজবাবুর হাসিনীর ওপর বরাবরের হিংসে ছিল ছেনি দত্তর। ছোটবাবুর চুনীবালাকেও কতবার ভাঙচি দিয়ে বার করে আনবার চেষ্টা হয়েছে জানবাজারের বাড়ি থেকে। ছোটবাবুর দেখাদেখি নিজের মেয়েমানুষের গা গয়নায় মুড়ে দিয়েছে। বাড়ি করে দিয়েছে চিৎপুরে। সেই ছেনি দত্তর মৃত্যু!
মেজবাবু বোতলটা আর একবার মুখে তুললেন। তারপর বললেন–তা বলে ও সব শুনছি না, আমাদের বর আগে যাবেই।
সরু গলি। বর, বরযাত্রী গেলে আর জায়গা থাকে না। শবযাত্রা পিছিয়ে যাক। কিম্বা অন্য রাস্তা ঘুরে যাক। অন্য রাস্তা খোল পড়ে আছে। নিমতলায় যাবার রাস্তার অভাব নেই।
মেজবাবু আবার বললেন—বলে দাও ওদের ভৈরব—বর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে?
ভৈরববাবু গেল।
কিন্তু ওরাও নাছোড়বান্দা। ছেনি দত্ত ছিল ঠনঠনের রাজা। মরে গিয়েছে বলে রাজত্বও চলে গিয়েছে নাকি? ছেলেরা নেই নাকি? জ্বল জ্বল করছে বংশ। নাতি, নাতনী, আত্মীয়, কুটুম, স্বজন, বন্ধুবান্ধব, মোসাহেব, চাকর, দারোয়ান সবই আছে।
ওপাশে ছেনি দত্তর বড় ছেলে—নটে দত্তরও তখন মেজাজ গরম। সে-ও ফুর্তি করতে জানে। বাপের মৃত্যুতে সে কি কম শোক পেয়েছে নাকি! শোক তোলবার জন্যে সে-ও বিকেল থেকে অনেক গেলাশ খালি করে ফেলেছে। বললে—কুছ পরোয়া নেই–-আগে আমরা যাবো, ওরা ওদের বরকে পিছে হটিয়ে নিক, পাথুরেঘাটায় যাবার বহুৎ রাস্তা পড়ে আছে।
লাগলো ঝগড়া। মুখোমুখি দুই দল থমকে দাঁড়িয়ে, কেউ নড়বে না।
এরা বলে—ওরা নড়ুক।
ওরা বলে—ওরা নড়ুক।
মেজবাবু এবার গরম হয়ে উঠলেন। ছেনি দত্ত মরেও জ্বালাতে এসেছে! বললেন—ভৈরব, ব্রিজ সিংকে ডাকো তো একবার।
ব্রিজ সিং আজ রেশমী মুরেঠা পরেছে। সাদা লম্বা প্যান্ট। গায়ে গলাবন্ধ কোট আর বুকে গুলী ভরা চামড়ার বেল্ট, হাতে বন্দুক। কাছেই ছিল দাঁড়িয়ে। ভৈরববাবুর ডাকে গোঁফে চাড়া দিয়ে এসে হাজির হলো।
সেলাম করে বললে–হুজুর—
মেজবাবু বললেন—ফায়ার করো।
করুক ফায়ার। ভৈরববাবু, মতিবাবু, তারকবাবু সবাই মনে মনে খুশি। করুক ফায়ার। বোঝা যাক কে কত বড় বাবু।
