বংশী বলেছিল—বিকেল বিকেল বাড়ি ফিরবেন আজ্ঞে, চুলটা ছেটে দাড়িটা কামিয়ে নেবেন তাড়াতাড়ি। বাড়ি সুদ্ধ, কামাবে কিনা আজকে হাতে সময় রেখে না এলে সন্ধ্যে উৎরে যাবে একেবারে।
ছোটবৌঠান ডেকে বলেছিল—জামা জুতো তোমার পছন্দ হয়েছে তো ভূতনাথ?
আজ তিন দিন থেকে নবৎ বসেছে নহবৎ খানায়। কাশীর বাজিয়ে। এক একটা রাগ ধরে আর ঝাড়া দেড় ঘণ্টা দু’ ঘণ্টা ধরে কালোয়াতি চলে তার ওপর। মীড়ে, গমকে, মূছনায় সারা বৌবাজারটা যেন মেতে ওঠে। বনমালী সরকার লেন-এ কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখে। ভেতরের উৎসবের কিছুটা আভাস পাবার চেষ্টা করে।
ব্রিজ সিং মাঝে মাঝে বন্দুকটা বাগিয়ে তাড়া করে—ভাগো, ভাগো হিঁয়াসে—রাস্তা ছোড়ো
একজন হুমড়ি খেয়ে সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে—ওই দ্যাখ—ওই দ্যাখ-উ-উ-ই—
গায়-হলুদের তত্ত্ব যাবে। রান্নবাড়ি থেকে বারকোষ, থালা, ঝুড়ি মাথায় লোক বেরোচ্ছে তত বেরোচ্ছেই। নতুন কাপড় পিরেন পেয়েছে সবাই। পুরোনো ঝি-রা পেয়েছে গরদের থান। নাথু সিং আছে সামনে। পাগড়ি লাল রং করেছে। হাতে বাঁশের লাঠি। পেতলের পাত বাঁধানো। দাসু জমাদার ছেলেমেয়ে নিয়ে নতুন কাপড় পরে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে। ইব্রাহিমও ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছে। জাফরির ফাঁক দিয়ে বউরাও উঁকি মারছে হয় তো!
শাখ বেজে উঠলো।
বিধু সরকার আজ উড়নি চড়িয়েছে গলায়। সামনে এসে ধমক দেয়।—সব সার বেঁধে চলবি, সার যেন কেউ না ভাঙে, রাস্তার এক পাশ দিয়ে।
প্রথমে বাসন-কোসন। ঘড়া, পিলসুজ, থালা, বাটি, গাড়। চল্লিশটা লোক। তারপর মশলা-পত্তোর। পান সুপুরি লবঙ্গ এলাচ। তারপর কাপড় জামা সেমিজ। তাও জন পঞ্চাশ। তারপর মিষ্টি মিষ্টির ললাকের আর শেষ নেই! ছানার খাবারের পর ক্ষীরের খাবার, তারপর নোনতা। তারপর দই-এর হাঁড়ি। গয়নার বাক্স নিয়ে চলেছে নাথু সিং সকলের আগে আগে।
বিধু সরকারের হাতে লিস্ট। এক একজনের নাম ধাম লেখে আর ছাড়ে।এক শ’ চল্লিশ দফালোচন দাস, এক শ’ একচল্লিশ শ্যামসুন্দর ভুইয়া, এক শ’ বিয়াল্লিশন পরামাণিক—তুই কে? তোর নাম কি রে বেটা, নাম বল—কা’র লোক—বাড়ি কোথায়?
শাঁখ বাজাতে বাজাতে চললো মিছিল। ব্রিজ সিং গেট খুলে দিলে। বনমালী সরকার লেন ছাড়িয়ে মিছিল গিয়ে পড়লো বৌবাজারের মোড়ে।
বাহার হলে রাত্তির বেলা। বিরাট দোতলা বাড়ির সমান চতুর্দোলা। ছুটুকবাবু তার ওপরে বসে। নিচের রাস্তায় সার সার গাড়ি চলেছে আস্তে আস্তে। জুড়ি, চৌঘুড়ি, ছয়ঘুড়ি, আটঘুড়ি ল্যাণ্ডের সঙ্গে জোতা। চতুর্দোলার সামনে কিছুটা দূরে বাঁশের ময়ুরপঙ্খীতে খেমটার নাচ চলেছে। মেজবাবুর সঙ্গে আরো তিন চারটে গাড়িতে মোসাহেব নকলবাবুদের ভিড়। হৈ হল্লা চলেছে। দেড় মাইল দু’ মাইল লম্বা মিছিল। কত রকমের গাড়ি। ল্যাণ্ডো, ফিটন, বগি, ল্যাণ্ডোলেট, দশ ফুকরে ব্রাউনবেরি, ব্যারুষ। আর সামনে রোশনচৌকি বাজতে বাজতে চলেছে সঙ্গে—আর মাঝে মাঝে তুবড়ি ফুটছে এক-একবার—আর তারই দু’পাশে রাস্তার দু’ধার দিয়ে লম্বা হয়ে চলেছে খাস গেলাশের আলোর ঝাড়।
আশে পাশে বাড়ির জানালা দরজায় লোকজনের ভিড়। সারা কলকাতা যেন গম গম করছে।
বংশী বললে—ছুটুকবাবুকে বেশ দেখাচ্ছেনা, শালাবাবু?
মেজবাবুর ইচ্ছে ছিল বাঁধা রোশনাই-এর ব্যবস্থা করবেন। বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার দুই ধার জুড়ে একেবারে গ্যাস লাইন বসে যাবে। ছোকরাদের কাঁধে খাস-গেলাশের ঝাড় যা গেল তা তো গেলই। তার ওপর দু’পাশে বাঁধা আলোর ঝড়।
ভৈরববাবু বললেন—বাঁধা রোশনাই দেখেছিলুম কালীকেষ্ট ঠাকুরের ছেলের বিয়েতে-লাখ টাকা খরচা হয়েছিল।
এদিকে কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের বাড়ি দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ত্রীটের পশ্চিম দিকের শেষাশেষি আর ওদিকে কন্যা পক্ষের বাড়ি রামবাগানের কাছাকাছি। প্রায় আধ-ক্রোশের দূরত্ব। সমস্তটা জুড়ে বাঁধা রোশনাই।
কিন্তু খাস-গেলাশ নিয়েও বিপদ আছে বৈকি! ছেলে ছোকরাদের রাস্তা থেকে ধরে এনে তাদের দু’চারটে পয়সা দিয়ে ঝাড় বওয়াতে হয়। কিন্তু বর যখন কনের বাড়িতে ঢুকলো তখন তাদের নিয়ে মুশকিল। যে যেদিকে পারে ছিটকে পালিয়ে যায়।
ভৈরববাবু সিগারেট টানছিলো। বললে—এ আর কী খাসগেলাশ দেখছিস—আগে ছিল দু’ আনায় যোল বাতির প্যাকেট। সেটা হচ্ছে খাঁটি তিমি মাছের চর্বি—আর এ তো নকল মোম।
বংশী বললে—আমি আর যাবো না শালাবাবু, আমি এখান থেকে ফিরি—ছোটমা’র শরীরটা ভালো নয়।
—সে কী, কী হয়েছে বৌঠানের? শুনিনি তো কিছু।
—না শুনেছেন তো ও শুনে আর কাজ নেই আপনার—ও না শোনাই ভালো।
ছোটবৌঠানের শরীর খারাপের কথা কখনও আগে কানে আসেনি। তাই খবরটা যেন কেমন অস্বাভাবিক লাগলো ভূতনাথের কাছে। জিজ্ঞেস করলে—সত্যি, কী অসুখ রে বংশী?
—সে শুনে কাজ নেই আপনার–তবে যদি পারেন তো চটপট চলে আসবেন খাওয়া-দাওয়া সেরে গান-বাজনার মধ্যে যেন জমে যাবেন না আবার।
–-কেন, কিছু ভয়ের ব্যাপার আছে নাকি?
—তা ভয়ের ব্যাপার না থাকলে কি আর শুধু শুধু বলছি? কাল তো সকাল বেলা বারোটার সময় ঘুম ভেঙেছে আজ্ঞে।
—কেন, ছোটমা তো আগে খুব সকাল-সকাল উঠতে?
—আগে উঠতে—কিন্তু আজকাল অন্য রকম, কাল তেঁতুল গোলা জল খাইয়ে তবে জ্ঞান ফিরিয়েছি আজ্ঞে।
—কেন, এমন হলো কেন?
—আজ্ঞে, বলি আর কাকে, নিজে নিজের ভালো বুঝতে না শিখলে আমি কী করবো–যাক, আমার কী, আমি হুকুমের চাকর বৈ তো নয়—কে বাঁচলো, কে মরলো তা আমার দেখার কী দরকার—বলে মাঝ পথ থেকে ফিরে গেল বংশী।
