—সুপবিত্রবাবুর ওপর ভারি হিংসে আপনার, না?
ভূতনাথ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। বললে—রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক মিনিটে এর উত্তর দেওয়া যায় না জবা, দিলেও তুমি তা বুঝবে, আমিও ঠিক বোঝাতে পারবে না। সুতরাং সে-চেষ্টা করবো না আমি। আমি শুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করি তোমায়। আজ তো আর আমি এ-বাড়ির কর্মচারী নই। হয় তো এ-বাড়িতে আর আসার অধিকারও থাকবে না, কিন্তু যে-প্রশ্ন করবে, তার ঠিক-ঠিক উত্তর দেবে?
জবা বললে—দেবো, কী বলুন?
কিন্তু ভূতনাথ কথা বলবার আগেই রতন দৌড়ে এসেছে হাঁফাতে হাঁফাতে।
—দিদিমণি, বাবু কেমন করছেন যেন।
জবা চঞ্চল হয়ে উঠলো—কেমন করছেন রতন?
–খোকাবাবু শিগগির আপনাকে ডাকতে পাঠালেন—আপনি চলুন এখুনি।
জবা এক নিমেষে ছুটে চললো আগে আগে। রতনও গেল পেছন পেছন। ভূতনাথও হতবুদ্ধির মতো একমনে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। একবার মনে হলো ফিরে যাবে। কিন্তু এমন দুঃসংবাদ শোনবার পর চলে যাওয়াই বা যায় কী করে? আস্তে আস্তে আবার গিয়ে উঠলো ওপরে। সুবিনয়বাবু আরাম কেদারায় যেমন ভাবে বসেছিলেন, তেমনি ভাবেই হেলান দিয়ে রয়েছেন। চোখ দুটি বোজা, বুকে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে যেন তাঁর। মাঝে মাঝে ছটফট করে উঠছেন।
সুপবিত্র মাথার ওপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলে একবার আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে নাকি বাবা?
সুবিনয়বাবুর যেন সে-কথার উত্তর দেবার সামর্থ্যটুকুও নেই।
সুপবিত্র ভূতনাথকে ডেকে বললে—আসুন তো একটু ধরাধরি করে ওঁকে শুইয়ে দিই।
তারপর সুপবিত্র আর ভূতনাথ দুজনে মিলে ধরে সুবিনয়বাবুকে শোবার ঘরে নিয়ে গেল।
তারপর জবার দিকে চেয়ে বললে—জবা, তুমি একটু দেখো—আমি আমাদের ডাক্তারবাবুকে খবর দিই গে—বলে বেরিয়ে গেল সুপবিত্র।
ভূতনাথ নিষ্কর্মার মতো একমনে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। মনে হলো যেন এই সময়ে তারও একটা কিছু উপকারে লাগা উচিত। কিছু কাজ! সুবিনয়বাবুর এই আকস্মিক বিপদে তাদের কিছুটা উপকার করতে পারলে যেন বাচা যেতো।
নিজের বিছানায় শুয়ে সুবিনয়বাবু একবার চোখ খুললেন। তারপর অভিভূতের মতন চারদিকে চাইতে লাগলেন। একবার ভূতনাথের দিকে চেয়ে বললেন—সুপবিত্র কোথায়, চলে গিয়েছে?
জবা বাবার মুখের ওপর নিচু হয়ে বললে তিনি ডাক্তারবাবুকে ডাকতে গিয়েছেন, এখুনি আসবেন।
সুবিনয়বাবু খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
জবা জিজ্ঞেস করলে—এখন কেমন লাগছে বাবা?
সুবিনয়বাবু যেন হাসলেন মৃদু মৃদু। একটু বিকৃত হয়ে এল মুখটা। খানিক পরে বললেন-সমাজের ওঁদের একবার খবরটা দাও মা।
জবা আবার বললে—আপনি ভালো হয়ে যাবেন বাবা, আপনি ভাববেন না।
–আর রূপচাঁদবাবুকে একবার খবর দাও, আর ধর্মদাসবাবুকেও খবর দিও ওই সঙ্গে—তারপর খানিকক্ষণ চুপচাপ। তার মধ্যে সুবিনয়বাবু আর একবার বললেন—আচার্যদেবকেও, খবর পাঠাও না মা।
তারপর আবার তন্দ্রা। তন্দ্রাচ্ছন্ন সুবিনয়বাবু নিথর নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর আবার চোখ খুললেন। আবার তন্দ্রা। তারপর তন্দ্রা আর জাগরণের দোলায় জীবন-মৃত্যুর নৌকো এপাশ-ওপাশ করতে লাগলো।
২৪. এর পর থেকে ভূতনাথের জীবনে
এর পর থেকে ভূতনাথের জীবনে সব যেন কেমন ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে। কোথায় ছিল ভূতনাথ আর এক ধাক্কায় কোথায় গিয়ে পড়লো। নিবারণদের দল যে কী আগুন জ্বললো দেশে! ব্ৰজরাখালও একদিন হঠাৎ এসে হাজির হলো। আর ছোটবৌঠান! কিন্তু…কিন্তু সে কথা থাক। প্রকাশ ময়রার কথাই ধরা যাক প্রথমে। সেদিন কী কুক্ষণেই যে প্রকাশের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
প্রকাশ ময়রা। সামনে আভূমি নিচু হয়ে প্রণাম করলে।–পেন্নাম হই ঠাকুর মশাই, চিনতে পারলেন আমাকে?
—আরে তুমি—কী খবর! কতদিন তোমার ওখানে জিলিপী খেতে গিয়েছি, দেখি তুমি নেই।
—জিলিপীর ব্যবসা উঠিয়ে দিলাম ঠাকুর মশাই, লাভের গুড় সব পিঁপড়েয় খেয়ে ফেলতে আজ্ঞে, ও হলো না আমার, দেনায় মাথার চুল পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যাচ্ছিলো, শেষে দুগ্যা বলে দোকান একদিন দিলাম তুলে।
–এখন করছো কী?
—কিছুদিন ঘটকালীর কারবার ধরলাম, তেমন ঘরে বরে বিয়ে দিতে পারলে দু পয়সা থাকবারই কথা, বেশ হচ্ছিলোও, মাঝে মাঝে নেমন্তন্ন-আশটা মিলতো, এই গেল ফানে চাকদা’র ঘোষাল বাড়ির ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম কলকাতায়। ও-বাড়ি দু’দিন আর বরের বাড়ি দু’দিন খাওয়া হলো, মাংস করেছিল, তিন রকম মিষ্টি, আমাদের বর্ধমানের মনোহরা আনিয়েছিল—এমনি বড়ো বড়ো মাপের, তা মাথা পিছু চারটে করে দিয়ে গেল পাতে।
ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে–তা এখন করছো কী?
–আজ্ঞে আপনাদের আশীৰ্বাদে এদানি ননীবাবুর আপিসে একটা কাজ পেয়েছি।
–কোন্ ননীবাবু?
—ননীবাবুকে চেনেন না? নতুন আপিস খুলেছেন, তা শ’ তিন চার লোক খাটে, আরো অনেক লোক ভর্তি হবে শুনছি। তিন তিনটে কোলিয়ারি—পটলডাঙার সরকার বাড়ির জামাই যে, পাকা সাহেব মানুষ কিনা, এমন ইংরিজী বলেন ঠাকুর মশাই, বোঝে কার সাধ্যি? তা আপনি এখন আছেন কোথায়?
—সেই বড়বাড়িতেই—আর যাবো কোথায়?
প্রকাশ বললে—বিয়ে থা…?
—করিনি।
—সে কি ঠাকুরমশাই, কুলীন ব্রাহ্মণ আপনারা, সেকালে হলে গণ্ডা দশেক বিয়ে করলে আপনার আর চাকরি করে খেতে হতো না। বলেন যদি তাহাতে আমার একটা সন্ধান আছে।
–আচ্ছা, পরে একদিন দেখা করে প্রকাশ, আমার একটু তাড়াতাড়ি আছে আজ—বলে ভূতনাথ চলে এসেছিল। ছুটুকবাবুর বিয়ের দিন সেটা। সন্ধ্যেবেলা বরযাত্রী যেতে হবে।
