ভূতনাথের চোখে জল এসে গিয়েছিল। মনে আছে প্রথম ব্ৰজরাখালের সঙ্গে যেদিন এ-বাড়িতে এসেছিল ভূতনাথ, সেদিন কত দ্বিধা সঙ্কোচের ফণা তুলেছিল মন। ভেবেছিল হয় তো তার ধর্মত্যাগ করতে হবে। অখাদ্য খেতে হবে। কিন্তু কিছুই হয়নি। সমস্ত আশঙ্কা ভার মিথ্যেই হয়েছিল।
অনেকক্ষণ সবাই চুপচাপ। জবা এক মনে চুপ করে বসে আছে। সুবিনয়বাবুও চোখ বুজে রয়েছেন। এই শান্ত পবিত্র পরিবেষ্টনীর মৌনতা ভাঙতে যেন কেমন দ্বিধা হলো ভূতনাথের। দুই হাতের অঞ্জলিতে তখনও সুবিনয়বাবুর দেওয়া টাকার তোড়াটা যেন কাটার মতো ফুটছে। হঠাৎ ভূতনাথ আর্তনাদের মতো বলে উঠলো—আমি এ-টাকা নিতে পারবো না সুবিনয়বাবু।
সুবিনয়বাবু সুপ্তোখিতের মতন চোখ খুললেন। জবাও চোখ তুলে চাইলে।
–আপনি ফিরিয়ে নিন এ-টাকা, আমি নিতে পারবো না।
—কেন? কেন নেবে না ভূতনাথবাবু?
–আমি অন্যায় করেছি—আমাকে ক্ষমা করুন।
–কী অন্যায় তুমি করেছে ভূতনাথবাবু? কোনো অন্যায়ই তুমি করোনি।
–করেছি, জবা জানে—বলে ভূতনাথ মাথা নিচু করলে।
–কই মা, ভূতনাথবাবু কী অন্যায় করেছে জানো তুমি?
জবা হয় তো কী একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিলো—কিন্তু ঠিক সেই সময় ঘরে কে যেন প্রবেশ করলো। বেশ সুদীর্ঘ চেহারা। গায়ে কালো আলপাকার কোট, কয়স অল্প। ভূতনাথ কখনও দেখেনি একে।
সুবিনয়বাবু তাকে দেখেই বলে উঠলেন—এই যে সুপবিত্রবাবু, এসো বাবা, এসো, এসে পড়েছে ভালোই হয়েছে, তোমার আসা দরকার ছিল। আজ জবা মাকে এই একটু আগে তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলাম। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে। তারপর ভূতনাথের দিকে চেয়ে বললেন–ও কি ভূতনাথবাবু উঠলে কেন? বোসো, তোমার সামনে কথা বলতে আমার কোনো অসুবিধে হবে না।
জবাও বললে—আপনি যাবেন না ভূতনাথবাবু, বসুন।
–না, অনেক বেলা হয়ে গেল, আর একদিন আসবে বলে হন হন করে সোজা বাইরে বেরিয়ে এল ভূতনাথ।
রাস্তায় বেরোতেই রতন পেছন থেকে ডাকলে—কেরানীবাবু।
–কী রে?
—একবার শুনে যান, দিদিমণি ডাকছেন।
বাইরে ঝাঁ ঝাঁ করছে রদ্দুর। অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে। ভূতনাথ আবার ফিরলো। জবা দরজার সামনেই দাঁড়িয়েছিল। ভূতনাথ কাছে আসতেই বললে চলে যাচ্ছেন যে, টাকাটা নিয়ে গেলেন না?
ভূতনাথ বললে—এই জন্যেই আমায় ডাকছিলে?
—আপনি টাকাটা ফেলে গেলেন—ভাবলাম ভুলে গেলেন বুঝি। ভূতনাথ জবার মুখের দিকে চেয়ে বললে—ঠিক ভুলে যাইনি আমি।
—ভুলে যদি না যান তো ফেলে যাবার মানে?
–ওটা আমি তোমাকেই দিয়ে গেলাম।
-–আমাকে? আমাকে দান করবার অধিকার আপনার আছে বলে মনে করেন নাকি? বাবা সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন বলে ভেবেছেন আপনার দানের ওপর বুঝি নির্ভর করতে হবে আমাকে?
–-তা কেন ভাবতে যাবো জবা, তাতে যে সুপবিত্রবাবুকে অপমান করা হয়, তা ছাড়া আমি দান করতে পারবে এমন সামর্থ্য আমার কোথায়?
—সামর্থ্য থাকলে আমাদের এই দুরবস্থার সময় আমায় ঋণী করে রাখতে পারতেন, তাই না?
ভূতনাথ হঠাৎ হেসে উঠলো। বললে—আমি এত কথাই যদি বলতে পারবো জবা, তাহলে কবে তোমার সমাজে গিয়ে পৈতে টিকি ফেলে দিয়ে ব্রাহ্ম হয়ে যেতাম। আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করতে পারবে এমন ক্ষমতা আমার নেই। আমি ও-টাকাটা তোমাকে যৌতুকই দিলাম।
—যৌতুক, কীসের যৌতুক?
ভূতনাথ বললে—তোমাদের বিয়েতে ও-টাকাটা তোমাকে যৌতুক দিলাম মনে করে।
—আপনার কাছ থেকে যৌতুক নেবো কেন আমি? তাছাড়া আপনার সঙ্গে আমার কীসের সম্পর্ক, আপনি এক সময়ে চাকরি করতেন এ-বাড়িতে, সম্পর্কটা বন্ধুত্বেরও নয় কিম্বা…
—কিম্বা…?
জবা হাসলো এবার। বললে–কথাটা আমার মুখ দিয়ে না বলিয়ে ছাড়বেন না দেখছি।
ভূতনাথ বললে—না বলতে চাও বলো না, তোমার ওপর আমার জোরও নেই, কিন্তু এমন কী আমাদের সম্পর্ক যাতে উপহার দেওয়াও যায় না?
—উপহার দেওয়া হয় তো যায়, কিন্তু উপহার নিতে বাধে। আপনার চাকরি নেই; পরের বাড়িতে আশ্রিত আপনি, আপনি তো সব বলেছেন আমাকে। আমার চেয়ে আপনার প্রয়োজন কি কিছু কম?
—টাকার প্রয়োজন হয় তো আমার বেশিই। হয় তো কেন, সত্যিই তাই, কিন্তু টাকার চেয়েও আরো বড় জিনিষ আছে পৃথিবীতে যার কাছে টাকা তুচ্ছ।
জবার মুখ কৌতুকে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললে—সে জিনিষটা কী? বলতে আপত্তি আছে?
ভূতনাথ বলতে যাচ্ছিলো। কেমন যেন সঙ্কোচ হলো। কথাটা জবা কেমনভাবে গ্রহণ করবে কে জানে। আসলে তত জবার সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক সহজবোধ্য নয়, আর সমানে সমানেও নয়। উত্তর দিতে গিয়ে ভূতনাথের মুখটা কেমন কালো হয়ে উঠলো। কান দুটো গরম হয়ে এল। জবার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। বললে—আজ নয় জবা, আর একদিন বলবো।
–কিন্তু আর যদি বলবার অবকাশ না আসে?
—সে অবকাশ আমি করে নেবে।
—কিন্তু আমার যদি শোনবার অবকাশ না হয় আর?
ভূতনাথ আবার, বিপদে পড়লো। বললে—না-ই বা শুনলে, না হয় আমার কথা আমারই মনে থাক, একদিন ভুল করে তোমাকে অপমান করে ফেলেছিলুম, না-হয় সারা জীবন তারই প্রায়শ্চিত্ত করতে দাও। তোমাদের সাত টাকা মাইনের কেরানীর মুখে এর চেয়ে বেশি কথা না-ই বা শুনতে চাইলে।
—খুব টাকার খোঁটা দিয়ে কথা বলতে পারেন আপনি, কিন্তু সে যাক—এখন থেকে তো টাকার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল আপনার সঙ্গে—আর যেদিন আঁচল ধরে টেনেছিলেন, তখন সহ্য করিনি স্বীকার করি, কিন্তু এখন আমি শুনবই–বলুন।
ভূতনাথ বললে–কিন্তু সুপবিত্রবাবু ওদিকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন—তোমার দেরি দেখে হয় তো রাগ করতে পারেন।
