ভূতনাথ বললে আমার দুঃখ যদি তুমি বুঝতে, তবে আমায় এত দুঃখ দিতে পারতে না জবা!
জবা বললে—দুঃখ কথাটা সবাই-এর মুখে বড় বেশি শুনি ভূতনাথবাবু, সত্যি বলুন তো সত্যিকার দুঃখটা কি?
ঠিক সেই মুহূর্তে সুবিনয়বাবু একগাদা কাগজপত্র হাতে ফিরে এলেন। বললেন—এই দেখো ভূতনাথবাবু-বলে কাগজপত্র খুলে দেখাতে লাগলেন। অনেক হিসেব অনেক রসিদ। অনেক পাওনা অনেক দেনা। বললেন–সকলের সব পাওনা মিটিয়ে দিয়েছি, যাদের পাওনা এখনও মেটাতে পারিনি, তাদের খবর দিয়েছি। তোমার পাওনাটা আজ শোধ করে দিতে চাই ভূতনাথবাবু। তুমি প্রাণ দিয়ে কাজ করেছো, তোমার যা প্রাপ্য তার চেয়ে অনেক কম দিয়েছি তোমায়। এই দেখো তোমাকে আমি বেশি দিতে পারিনি, তুমি আমার এখানে কাজ করেছে। সবসুদ্ধ·..
ভূতনাথ কেমন সঙ্কুচিত হয়ে উঠলো মনে মনে। বললে— আপনি আর একবার ভেবে দেখুন।
সুবিনয়বাবু একবার চাইলেন ভূতনাথের দিকে। বললেনকী ভেবে দেখবো ভূতনাথবাবু?
ভূতনাথ বললে—এতদিনের ব্যবসা, তা ছাড়া জবার ভবিষ্যৎ…
—সব ভেবেছি ভূতনাথবাবু, আজ পনেরো বছর ধরে ভেবেছি, ভেবো না এ-সঙ্কল্প আমার হঠাৎ হয়েছে। তোমরা ভাববে আমি বঝি পাগল হয়ে গিয়েছি, কিন্তু পনেরো বছর আগে থেকে এ-সঙ্কল্প শুরু হয়েছে আমার যখন জবা এতটুকু মেয়ে। কিন্তু তখন আমার যৌবন ছিল, কিছু গ্রাহ্য করিনি, তখন যাতে আমার তৃপ্তি ছিল, এখন তাতেই বিতৃষ্ণা হয়ে গিয়েছে-মনের জোয়ার-ভাটা আছে এটা তো বিশ্বাস করো, যেমন নিয়ে একদিন হিন্দুধর্ম ত্যাগ করেছি, সেই মন নিয়েই আজ আমি সমস্ত পার্থিব ঐশ্বর্য ত্যাগ করতে চলেছি—আর জবার ভবিষ্যতের কথা বলছে—ওদের দুজনের অনুরাগ হয়েছে, আমি ধনীই হই আর নিঃস্বই হই তাতে কিছু এসে যায় না, ওদের অনুরাগ যদি তাতে কিছু কমে তো বুঝতে হবে কোথাও ত্রুটি আছে সে অনুরাগের মধ্যে। কী বলল মা জবা? তোমার কি মনে হয় মা?
জবা চুপ করে রইল।
সুবিনয়বাবু আবার বললেন—সুপবিত্রকে কি তুমি সব বলেছো?
জবা মাথা নাড়লো।—না, তাকে কিছুই বলিনি বাবা।
—তুমি তাকে বলে দিও মা, সাধনার পথে প্রত্যয়ের বাধাই তো বড় বাধা, অনুরাগের ক্ষেত্রেও তাই। তোমরা দুজনে দুজনকে গ্রহণ করবে সমস্ত সংস্কার মুক্ত হয়ে। আমি চাইনে মা যে কোনো আবিলতা থাকুক সেখানে, তোমরা হয় তো আমায় অপ্রকৃতিস্থ ভাববে, ভাববে তোমাদের হয় তো বঞ্চিত করছি আমি। কিন্তু আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করছি মা যে, ‘মোহিনী-সি দুরে’র উপার্জন থেকে আজ পর্যন্ত আমি যা সঞ্চয় করেছি, তার ওপর তোমাদের বা আমার আর কোনো অধিকার নেই। শুধু জীবনধারণ করার জন্যে যেটুকু সামান্য প্রয়োজন, সেটুকু ছাড়া। যে-অসত্যকে আশ্রয় করে আমি বেঁচেছিলাম—তার জন্যে আমি বিশ্বপিতার কাছে মার্জনা ভিক্ষা করেছি বারবার। বিশ্বানি দুরিতানি পরাসুব—আমার পাপ —বিশ্বের সকলের পাপ মার্জনা করো—প্রার্থনা করি বার-বার।
ভূতনাথ বললে–কিন্তু আমাদের মোহিনী-সিঁদুরে’ একজনের খুব উপকার হয়েছে জানি।
—কে সে?
—আমাদের বড়বাড়ির ছোটবৌঠান।
সুবিনয়বাবু হাসলেন। বললেন—উপকার তার কতটুকু হয়েছে জানি নে, কার্য-কারণ সম্পর্ক এখানে কতটুকু তা-ও বলতে পারবো না ভূতনাথবাবু, তবে আমাকে যদি প্রশ্ন করে এ কেমন করে হলো, আমি বলবো নিষ্ঠায় সবই সম্ভব, বিশ্বাসে সবই সম্ভব—সে-বিশ্বাস যদি তোমাদের বড়বাড়ির ছোটবৌঠানের থাকে তো ফল তিনি পাবেন, আমার মোহিনী-সিঁদুর’ই নিন আর অন্য কিছুই তিনি নিন। মোহিনী-সিঁদুরে’র গুণ হয় তত এককালে ছিল। বাবা তা বিশ্বাস করতেন বলেই গুণ ছিল। আমি তার অযোগ্য সন্তান, যৌবনেই মন্ত্রে-তন্ত্রে বিশ্বাস হারিয়েছি, কিন্তু ব্যবসাবুদ্ধি হারাইনি, তখন থেকে এই এতদিন সেই ব্যবসাবুদ্ধিতে চালিত হয়েই এসেছি, কিন্তু হঠাৎ জবার মায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমি আমার চরম সত্যকে দেখতে পেয়েছি, আজ আমি আর নিজেকে ক্ষমা করবো না ভূতনাথবাবু, নিজে মুক্তির স্বাদ পেয়েছি, জবাকেও আমি মুক্তি দিয়ে যাবে। কী মা জবা তোমার কিছু বলবার আছে?
জবা বললে—আপনি যা ভালো বুঝবেন করবেন বাবা, আমি তাই-ই ভালো বলে মানবব।
সুবিনয়বাবু বললেন-“তা হলে এবার সুপবিত্র এলে তাকে সব খুলে বলো মা তুমি।
-বলবো বাবা।
—বোলো এতদিনে-ঐশ্বর্যশালী হলাম, বিত্তবান হলাম। এতে অগৌরবের কিছু নেই মা, দেখবে মনে জোর পাবে, সাহস পাবে, তোমাদের দুজনের অনুরাগ যদি খাঁটি হয় তো এ-ঘটনায় তা ছিন্ন হবে না, তা আরো গাঢ় হবে। সুপবিত্র তো অবুঝ নয়, তাকে আমি যতদূর জানি সে ভুল বুঝবে না, আর ভূতনাথবাবু
ভূতনাথ বললে–বলুন।
–তোমার আমি কিছুই করতে পারলাম না, ব্ৰজরাখালবাবুকে কথা দিয়েছিলাম তোমাকে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেবো, তা-ও হলো না। অবশ্য অনেক বন্ধুবান্ধবকে আমি চিঠি লিখেছি তোমার সম্বন্ধে, হয় তো তারা একদিন তোমাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করবেন। তা সে যা হোক, আজ তোমাকে এই সামান্য পারিশ্রমিকটুকু নিতে হবে ভূতনাথবাবু—নিতে দ্বিধা করো না।
ভূতনাথের হাতে সুবিনয়বাবু একটা টাকার তোড়া তুলে দিলেন।
সুবিনয়বাবু আবার বললেন—পাঁচ শ’ টাকা আছে এতে ভূতনাথবাবু, সামান্য এ-দান, তবু প্রসন্ন চিত্তে গ্রহণ করো, করে আমায় মুক্তি দাও, একে একে আমি ঋণ মুক্ত হতে চাই। জানো—এমনি করে সকলের সব ঋণ শোধ করে যাবতীয় সম্পত্তি আমি সমাজকে দিয়ে যাবে।
