—আমার হাতটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললেন—তুমি এখনও জেগে আছো?
জিজ্ঞেস করলাম—কষ্ট হচ্ছে খুব?
তিনি বললেন—খুব কষ্ট হচ্ছে—কিন্তু আর হবে না।
–কেন?
—আর বেশিক্ষণ বাঁচবো না আমি।
তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। তার চোখ দি জল পড়তে লাগলো।
একবার জিজ্ঞেস করলাম—জবাকে ডাকবো এখন?
বললেন–না।
বললাম—তবে কী করলে তোমার কষ্ট কমবে—বলো?
তিনি বললেন—তোমাকে আমি যা বলবো করতে পারবে?
বললাম–বলো।
তিনি হঠাৎ বললেন আমাকে তুমি মুক্তি দাও।
-কেমন যেন চমকে উঠলাম। সেদিন স্বপ্নে বাবা যা বলেছিলেন, জবার মা-ও সেই এক কথাই বললেন। তবে কি আমি সবাইকে আমার কাছে আবদ্ধ করে রেখেছি। যেখানে প্রেমের সম্পর্ক সহজ, সেখানে তো বন্ধনের প্রয়োজন বাহুল্য। প্রেম মানেই তো মুক্তি। আবার জিজ্ঞেস করলাম—একথা কেন বলছো তুমি?
তিনি বললেন—আমাকে মুক্তি না দিলে, নিজেও মুক্তি পাবে। তোমার মুক্তির জন্যেই আমার মুক্তি চাইছি— জবাকেও তুমি মুক্তি দাও–পারবে?
—আর তারপরেই তার হাতটা শিথিল হয়ে গেল। তিনি চলে গেলেন।
জবা হঠাৎ বলে উঠলো–বাবা।
ভূতনাথ দেখলে জবার চোখেও জল নেমেছে।
সুবিনয়বাবু বললেন–এর এক বর্ণও অসত্য নয় মা-–সব সত্যি–প্রথমটা কী করবো বুঝতে পারলাম না। শেষে নিজের মনকে দৃঢ় করলাম। চিত্তকে স্থির করলাম। তখন মনে পড়লো বাবা বলেছিলেন—সচ্ছলতাটুকু হলেই ধন্য মনে করবে নিজেকে-দৈক আশীর্বাদে বিলাসিতা করবার জন্যে কালীর অনুগ্রহ নয়। মনে আছে—সচ্ছল হয়ে খেয়ে পরে বাঁচবার পর যেটুকু উদ্ব ও থাকতো বাবা সব দান করতেন। মোহিনী-সিঁদুর’ নিয়ে বিলাসিতা করতে তিনি বারণ করেছিলেন—দেবীর নাকি নিষেধ ছিলো। আমারও মনে হলো—আমার যে ঐশ্বর্য এ তো বিলাসিতারই নামান্তর।
পরদিনই ‘মোহিনী-সিঁদুরে’র সাইন-বোর্ডটা খুলে ফেলে দিলাম। চিঠি লিখে দিলাম সর্বত্র। তোমাকেও সেই সঙ্গে চিঠি লিখে দিলাম ভূতনাথবাবু। এখন আমি মন স্থির করে ফেলেছি—এতদিন যে অন্যায় করেছি তারই প্রায়শ্চিত্ত করে যাবো সারাজীবন। ধুলোয় আমার সর্বাঙ্গ মলিন হয়ে উঠেছে। উপনিষদে সেই প্রার্থনা আছে—‘আবীরাবীৰ্ম এধি’—হে প্রকাশ, আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক—তোমার হাল তুমি ধরো, এই তোমার জায়গায় তুমি এসো, আমার ইচ্ছে নিয়ে আমি আর পেরে উঠলুম না— মৈত্রেয়ীর সেই প্রার্থনা—’অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মামৃতং গময় মনে হলো জবার মা-ও যেন উপনিষদের যাজ্ঞবল্ক্যর স্ত্রীর মতো সেই প্রার্থনাই করে গেলেন মরবার সময়–উপনিষৎ ব্ৰহ্মজ্ঞানের বনস্পতি আমিই জবার মাকে উপনিষৎ পড়িয়েছিলাম একদিন আর আজ আমাকে তিনি শিখিয়ে গেলেন। আজ আমি বুঝেছি ভূতনাথবাবু, আমি যা চাই তা এ নয়। টাকা আরো চাই, খ্যাতি আরো দরকার, ক্ষমতা আরো না হলে আর চলছে না। এই ভেবে ভেবেই দিন কাটিয়েছি—কিন্তু ‘আবীরাবীম এধি’ হে রুদ্র তোমার যে প্রসন্ন সুন্দর মুখ তাই আমাকে দেখাও, আমাকে বাঁচাও—সেই প্রসন্নতাই আমার অনন্তকালের পরিত্রাণ। তাই আমি ঠিক করেছি আমার সমস্ত উদ্ব ও সম্পত্তি আমি সমাজকে দিয়ে দেবো—সমস্ত সঞ্চয়ের বোঝা মাথা থেকে নামিয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণের মধ্যে অবগাহন করি—সমস্ত ত্যাগ করে শান্ত হবে, পবিত্র হবে।
জবা ভূতনাথের দিকে তাকালে এবার।
ভূতনাথ বললে—আপনি ‘মোহিনী-সিঁদুরের ব্যবসাও তুলে দেবেন?
–তুলে দেবো নয়, তুলে দিয়েছি ভূতনাথবাবু।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—একটু বোসো ভূতনাথবাবু, আমি আসছি—বলে পাশের ঘরে চলে গেলেন।
ভূতনাথ জবার দিকে চেয়ে বললে—আচ্ছা, বাবা যা বললেন সব সত্যি?
জবা বললে—বাবা মিথ্যা কথা বলেন না।
–-কিন্তু তুমি তো বারণ করতে পারতে—তোমার ভবিষ্যৎ–
জবা কিছু উত্তর দিলে না। তারপর বললে—ভবিষ্যতের কথা তো অনেক দূরে, বর্তমানই আমার কাছে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। এ থেকে বাঁচবার কোনো উপায়ই আর দেখতে পাচ্ছি না।
—তুমি কিছু বলেনি বাবাকে?
জবা বললে–বাবাকে আপনি এখনও তা হলে চিনতে পারেননি ভূতনাথবাবু। যেদিন ধর্মত্যাগ করেছিলেন সে গল্প তো শুনেছেন আপনি, সেদিন যেমন কোনো কিছুর টানই তাঁকে ভোলাতে পারেনি। আজও যখন সঙ্কল্প করেছেন সমস্ত ত্যাগ করবেন, এ-সঙ্কল্প থেকেও কেউ তাকে টলাতে পারবে না।
ভূতনাথ বললে—আমি অবশ্য বাইরের লোক, আমার কিছু বলা শোভা পায় না, কিন্তু তোমার কথা ভেবে বলছি।
জবা হাসলো এবার। বললে—আমার কথা অত ভাববেন না।
উত্তরটা শুনে ভূতনাথও লজ্জায় মাথা হেঁট করলো। কী মনে করে জবা কথাটা বলেলে কে জানে। তবু সেদিনের সেই ঘটনাটা যেন হঠাৎ মনে পড়ে গেল ভূতনাথের। বললে—আমাকে তুমি ক্ষমা করো জবা।
জবা বললে—কিন্তু কথায় কথায় যারা এমন অপরাধ করে, তাদের কি কথায় কথায় ক্ষমা করা যায় নাকি?
—কিন্তু অনেকদিন আমি সে-ঘটনার জন্যে মনে মনে অনুতাপ করেছি জানে।’
জবা বললে—কিন্তু কেন আপনি অনুতাপ করতে গেলেন মিছিমিছি, আপনার চাকরি তো চলেই গিয়েছে।
-–চাকরিই কি আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করো নাকি?
–আপনার জীবনের লক্ষ্য কী তা তো আমার ভাববার কথা নয়। আপনার কথা আমি বসে বসে ভাবি এই আপনি ভাবেন বুঝি?
-কিন্তু যত অধমই হই আমি, ক্ষমা চাইবার অধিকারও কি নেই আমার।
জবা বললে—ক্ষমা আদায় করবার ক্ষমতা সকলের থাকে না ভূতনাথবাবু, সকলের কি সব ক্ষমতা থাকে? তা নিয়ে কোনো দুঃখ করবেন না আপনি।
