সুবিনয়বাবু মুখ তুলে চেয়ে চিনতে পেরে বললেন—আমার চিঠি পেয়েছিলে ভূতনাথবাবু। তোমার কথা আমি দিবারাত্রি ভাবি, ব্ৰজরাখালবাবু নিজে এসে তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছেন। আমি তোমার কিছু করতে পারলাম নাসার জীবন ধরে কারই বা কী করতে পেরেছি।
ভূতনাথ পাশের চেয়ারে বসে রইল চুপ করে। জবাও গিয়ে বসলো বাবার চেয়ারের হাতলের ওপর।
তারপর জবার দিকে চেয়ে বললেন—মা জবা, তা হলে ভূতনাথবাবুকে বলল সেই কথাটা–বলো সেই কথাটা।
জবা বললে—আপনিই বলুন।
সুবিনয়বাবু বললেন—আমিই বলবো মা, আমিই বলবোকিন্তু তার আগে তোমার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া দরকার ভূতনাথবাবু। আমি তোমার কিছু করতে পারিনি-ব্ৰজরাখালবাবু নিজে আমার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছেন তোমাকে।
ভূতনাথ হাত জোড় করে বলে উঠলো—আমাকে অপরাধী করবেন না মিছিমিছি।
—সে কি কথা, অপরাধ তো আমার, সেই বিশ্বনিয়ামক যিনি, সমস্ত তিনি জানেন, তাঁর প্রতি আমি অবিচার করেছি, সমাজের প্রতি অবিচার করেছি, সমস্ত বিশ্বের ওপর অপরাধ করেছি অপরাধ কি আমার সামান্য ভূতনাথবাবু, অথচ এই অপরাধ সম্বন্ধেই এতদিন অজ্ঞান ছিলাম আমি। সেদিন সচেতন করে দিলেন আমার বাবা।
–আপনার বাবা? ভূতনাথ অবাক হয়ে গিয়েছে।
–হ্যাঁ, সেদিন স্বপ্নে আমাকে দেখা দিলেন। আমার বাবা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু, কালীভক্ত, তোমাকে তো বলেছি। বাবা বললেন—খোকা, আমি মুক্তি পাচ্ছি না, আমাকে তুই মুক্তি দে।
শেষ জীবনে বাবা আমার মুখদর্শন করেন নি। আমি ধর্মত্যাগী বলে আমার হাতে এক গণ্ডুষ জলও পাননি তিনি। বললেনতেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে খোকা, আমি মুক্তি পাচ্ছিনে—আমাকে তুই মুক্তি দে। তারপরেই আচমকা আমার ঘুম ভেঙে গেল ভূতনাথবাবু, আমি চারদিকে চোখ মেলে দেখলাম কেউ কোথাও নেই। বিদ্যাসাগর মশাই অবশ্যি লিখে গিয়েছেন—’স্বপ্ন সত্য নহে—‘ আমিও ভালো রকম তা জানি। কিন্তু সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মনে শান্তি পেলাম না। সারাদিন কাজকর্ম করতে মন গেল না। জবাকে বললাম—একটা ব্ৰহ্মসঙ্গীত করতে—তবু যেন ভুলতে পারলাম না কথাটা। শেষে সন্ধ্যেবেলা আমাদের সমাজে গেলাম। মনে হলো যেন ওখানে গেলে শান্তি পাবে!
ভূতনাথ বললে—তারপর?
—সেদিন আচার্যদেব বক্তৃতা দিলেন যাজ্ঞবল্ক্যর ব্ৰহ্মবাদ সম্বন্ধে। মন দিয়ে শুনতে শুনতে মনে হলো এ তো আমারই কথা। যাজ্ঞবল্ক্য যখন গৃহত্যাগ করবার সময় তাঁর দুই স্ত্রীকে তার সমস্ত ঐেশ্বর্য দিয়ে গেলেন তখন মেত্রেয়ী বললেন—যে নাহং অমৃতস্যা কিমহং তেন কুর্যাম্যা দিয়ে অমরত্ব লাভ করতে পারবে না তা নিয়ে আমি করবো কী! বড় ভালো কথা! মন দিয়ে শুনতে লাগলাম ভূতনাথবাবু, অমৃতের মধ্যেই যে সত্য আছে, অমৃতের মধ্যে দিয়েই যে ব্রহ্মের সাক্ষাৎ পাই এ উপলব্ধি আমরা কখন করি? যখন আমার কোনো পরমাত্মীয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। যাকে আমরা ভালোবাসি, মৃত্যুতে যে সে থাকবে না, একথা ভাবতে আমাদের সমস্ত চিত্ত অস্বীকার করে। যে-মানুষকে আমরা অমৃতলোকের মধ্যে দেখেছি তাকে মৃত্যুর মধ্যে দেখবো কেমন করে! তখন ভাবি—প্রেম কি কেবল আমারই? কোনো বিশ্বব্যাপী প্রেমের যোগে কি আমার প্রেম সত্য নয়? তোমরা ঠিক বুঝতে পারবে ভূতনাথবাবু, তুমি বুঝবে না, জরাও বুঝবে না।
ভূতনাথ বললে—আপনি বলুন আমি বুঝতে চেষ্টা করবো।
দাড়িতে হাত বুলাতে বুলোতে সুবিনয়বাবু বলতে লাগলেন— বাবার মৃত্যু আমি দেখিনি! শুনেছি। কিন্তু জবার মায়ের মৃত্যু আমি প্রতিদিন পলে পলে অনুভব করেছি ভূতনাথবাবু—মন বড় চঞ্চল হয়ে উঠতো। কিন্তু যতই চঞ্চল হতো ততই কাজের মধ্যে ড়ুবিয়ে দিতুম নিজেকে—তোমরা কিছু হয় তো জানতে পারেনি। কিন্তু এই বলে সান্ত্বনা পেতাম যে, ‘পিতা নোহসি’—হে আমার অনন্ত পিতামাতা তুমি আছো, তাই আমার পিতাকে কোনো দিন হারাবার জো নেই। মনে মনে বলতাম—
মধু বা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ
মাধ্বীর্নঃ সন্তোষধীঃ–
মনে হতে পৃথিবীর ধুলো থেকে আকাশের সূর্য পর্যন্ত সমস্ত কিছু অমৃতে অভিষিক্ত হয়ে মধুময় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ উপলব্ধি বেশিক্ষণ থাকতো না—প্রতিদিনের দুঃখ-কষ্ট রোগ-যন্ত্রণা আমাকে আবার এই মাটির পৃথিবীতে টেনে নামিয়ে নিয়ে আসতো। সে ভাব চিরস্থায়ী হতো না।
সমাজে আচার্যদেব বলছিলেন—ভোগই প্রেমের একমাত্র লক্ষণ নয়। প্রেমের একটি প্রধান লক্ষণ হচ্ছে এই যে, প্রেম আনন্দে দুঃখকে স্বীকার করে নেয়—কেননা দুঃখের দ্বারা ত্যাগের দ্বারাই প্রেমের পূর্ণ সার্থকতা!…কিন্তু একথা আমাকে আর একজন বলে গিয়েছেন।
তারপর জবাব দিকে ফিরে বললেন—একথা তোমাকেও বলা হয়নি মা, তোমার মায়ের মৃত্যুর দিনের কথা—আজ শোনো।
স্থির হয়ে এল সুবিনয়বাবুর দুই চোখ। চোখ বুজে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন—সেদিন রাত দুটো বেজেছে। তোমার মায়ের অবস্থা খুব খারাপ, তুমি পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছা মা, আমি একলা তোমার মায়ের পাশে বসে আছি। হঠাৎ মনে হলো যেন চোখ মেলে চাইলেন। আমি এক দাগ ওষুধ খাইয়ে দিলাম। তখন সেই মরণাপন্ন রোগী আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আমার হাত দুটো ধরলেন। যে মানুষ চিরকাল অসংলগ্ন কথা বলে এসেছেন, সেদিন সেই রাত দুটোর সময় তিনি যা বললেন, খুব জ্ঞানী লোকও তেমন জ্ঞানের কথা বলতে পারে না। আজও আম কথা মনে পড়ছে ভূতনাথবাবু।
