—যাবো একদিন, আর সেই তোমাদের অনুশীলন সমিতি’ —তা শুরু হয়েছে?
—হয়েছে, সব বলব আপনাকে, একদিন আসুন আপনি। সারা কলকাতায়, সারা বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ব্রাঞ্চ খোলা হবে, কুস্তি শেখানো, গীতা পড়া, ড্রিল করা অনেক কাজ এগিয়েছে— কদমদা’ বড়দা’কে লিখে দিয়েছে চলে আসতে, বড়দা’ও লিখেছে রওনা হয়েছে, দু’একদিনের মধ্যেই হয় তো এসে পড়বে। আমি এখন চলি, পরে দেখা হবে।
আর কিছু না বলে ভূতনাথও চলে এল।
‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসের সামনে এসে কেমন যেন অবাক হয়ে গেল ভূতনাথ। সামনের সে সাইন-বোর্ডটা নেই আর সেখানে। সামনের দরজাটা দিনের বেলাও বন্ধ। এমন তো হয় না। সারাদিন তো লোকজনের আনাগোনা থাকে। অথচ আজ এ-রকম কেন।
দরজার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলে বৈজু। ভূতনাথকে দেখে সে-ও যেন অবাক হয়ে গিয়েছে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—বাবু আছেন?
—আছেন, ওপরে যান।
ভূতনাথ একটু দ্বিধা করে আবার জিজ্ঞেস করে—ওরা কোথায় সব, পাঠকজী, ভরত, মিশির—
বৈজু বললে—পাঠকজী আছে। অন্য সবাই চলে গিয়েছে।
—কেন? এখন সিঁদুরের প্যাকেট তৈরি করে কে?
—সিঁদুর আর তৈরি হয় না, কারবার বন্ধ করে দিয়েছে বাবুজী।
সেকি!
বাড়ির ভেতরে সোজা চলতে গিয়ে মুখোমুখি এসে পড়ে গেল জবা। ভূতনাথকে দেখে জবা যেন হঠাৎ একটা আশ্রয় পেয়ে গিয়েছে এমনি করে সামনে এগিয়ে এল। আরো অবাক হলে ভূতনাথ। চোখ নামিয়ে নিতে চাইলে। সেদিনকার জ্বরের ঝোকে যে কাণ্ড সে করে ফেলেছিল তারপর সোজাসুজি চোখ তুলে চাইবারও যেন অধিকার নেই আজ তার।
জবাই সামনে এসে পড়লো। বললে—ভূতনাথবাবু—আপনি এসে গিয়েছেন—কাল থেকে আপনার অপেক্ষা করছি।
অনেকদিন পরে দেখা। তবু ভূতনাথের মনে হলো জবা যেন আরো অনেক বড় হয়ে উঠেছে এরই মধ্যে। আরো শ্ৰীমতী, আরো প্রীতিময়ী হয়েছে। শরীরের রেখায় আরো প্রখরতা! হঠাৎ চোখ তুলে চাইলে ধাঁধা লাগে! মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে।
জবা বললে—বাবা আপনাকে চিঠি লিখেছিলেন—পেয়েছিলেন আপনি!
ভূতনাথ বললে—পেয়েছি, অসুখের পর আজ এই প্রথম এতদূর বেরুলাম।
জবা বললে—বাবা আজ সকালেও বলেছেন—ভূতনাথবাবু এল না—আমার ওপর নিশ্চয় অপরাধ নিয়েছে সে।
–বাঃ রে, অপরাধ কিসের তার—অপরাধ তো আমারই হয়েছে। তারপর জবার মুখের দিকে চেয়ে বললে-নিজের অপরাধেই এতদিন এত জ্বলেছি যে চিঠি না পেলে আসতেই সাহস হচ্ছিলো না। ভাবছিলাম এ-বাড়ির দরজা আমার কাছে চিরদিনের জন্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তোমার বাবার স্নেহের সুযোগ নিয়ে আমি তার বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।
জবা হঠাৎ যেন আবার পুরোনো দিনের সুরে বললে—এবার আর আপনাকে কেউ পাড়াগাঁয়ের মানুষ বলে ভুল করবে না। শুধু নামটা আপনার বদলে ফেলুন এবার।
ভূতনাথ কিন্তু হাসতে পারলো না। বললে–আমি ভাবতেও পারিনি যে এ-বাড়ি থেকে আবার আমার ডাক আসবে—আমি আবার চাকরি ফিরে পাবো।
জবা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে উঠললা—কিন্তু চাকরি তো আপনার নেই ভূতনাথবাবু।
জবা রসিকতা করছে কি না দেখবার জন্যে জবার মুখের দিকে ভালো করে তাকাবার প্রয়োজন হলো এবার।
জবা তেমনি কঠিন স্বরে বললে—-শুধু যে আপনারই নেই, তা নয়। কারোর চাকরিই আর নেই। বাবা কারবার তুলে দিয়েছেন।
-কেন?
—সেই কথার জবাব দেবেন বলেই হয় তো বাবা আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, ভাবছিলেন, হয় তো আপনি নিজে থেকেই একদিন আসবেন, যখন এতদিন ধরেও এলেন না, তখন বাবাই যেতে চাইছিলেন আপনার কাছে। আমিই কেবল বারণ করেছি— বলেছি—যিনি নিজে থেকে চলে গিয়েছেন, আমাদের সমস্ত আদর যত্ন সত্ত্বেও যিনি এখানে থাকতে চাইলেন না, আপনি নিজে গিয়ে ডাকলেও তিনি হয় তো আসতে নাও পারেন—কিন্তু সেটাও আসল কথা নয়, বাবা যেতে চেয়েছিলেন তার নিজেরই গরজে।
ভূতনাথ বললে—আমি আবার একটা মানুষ, এতখানি বয়েস পর্যন্ত যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারলে না—তার জন্যে আবার কারো গরজের প্রশ্ন উঠতে পারে এইটেই তো অবাক লাগে!
—আপনার কাছে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু বাবা কাউকে কোনোদিন ছোট ভাবতে পারেন না। আমার বাবাকে আপনি এখনও চিনতে পারলেন না। সেদিন সমাজে গিয়ে হঠাৎ তার মনে হয়েছে তিনি এতদিন যা করে এসেছেন সব ভুল করে এসেছেন, কেবল গোঁজামিল দিয়ে এসেছেন। লোক ঠকিয়ে এসেছেন—এখন নাকি তাই সব হিসেব মিটিয়ে আবার নতুন করে জীবন শুরু করবেন।
—সে কি?
—বাড়ি এসেই সাইন-বোর্ডটা খুলিয়ে ফেললেন। সব কর্মচারীদের বিদায় দিলেন। সকলকে হাত জোড় করে বললেন— —তাকে যেন সবাই ক্ষমা করে। বললেন—যা করেছি সব ভুল, সব মেকি, এতদিন যে চলেছে সে কেবল বাজারের চলা, কিন্তু এখন ব্যাঙ্কের পোদ্দারের কাছে আমার সব খাদ ধরা পড়ে গিয়েছে।
—তার মানে?
—তার মানে কি আমিই জানি ছাই, মা’র মৃত্যুর পর থেকেই তো ওইরকম সব বলতে শুরু করেছিলেন। এখন আরও বেড়েছে, প্রতি রোববারে সমাজে যান, বেশিক্ষণ একলা চুপ করে বসে থাকেন, ‘সঞ্জীবনী কাগজখনা নিয়ে খুলে বসেন—কিন্তু মনে হয় কিছুই যেন নজরে পড়ছে না।
ভূতনাথ বললে—চলো বাবার কাছে যাই।
জবা বললে—চলুন।
ভূতনাথ বললে—তা ছাড়া এমন চালু-ব্যবসা এভাবে হঠাৎ নষ্ট করে দেওয়াও তো উচিত নয়। এতগুলো লোকের জীবিকা তোমার ভবিষ্যৎ।
জবা কিছু উত্তর না দিয়ে চলতে লাগলো সিঁড়ি বেয়ে।
সুবিনয়বাবু তখন একখানা সঞ্জিবনী নিয়ে পড়ছিলেন।
ভূতনাথ সামনে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে।
