ভূতনাথ তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলে। আজ সকাল বেলাই যেতে হবে ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে। বাইরে সারা বাড়ি রং করা শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন জানালা দরজায় রং হচ্ছে। শ্যামসুন্দর জল তুলছে ভিস্তিখানায়। লোচনের কাজ অনেক বেড়েছে। অনেক হুঁকো কল্কে আর তামাকের সরঞ্জাম সংগ্রহ হয়েছে। বিয়ে [ড়ির আয়োজন চলছে। ভূতনাথকে দেখে বললে–প্রেণাম হই শালাবাবু।
-কী খবর লোচন?
—আজ্ঞে, ফুরসত আর নেই আজকাল তেমন, সমস্ত তামাকের ব্যাপারটা তো একা আমাকে সামলাতে হবে, হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি একেবারে, একটা নতুন তামাক তৈরি করেছি আজ্ঞে, গয়া মিঠেকড়া বালাখানার সঙ্গে ছটাক আন্দাজ কাশী মিশিয়ে বেশ নতুন রকমের সোয়াদ এনেছি—খেয়ে দেখবেন নাকি?
ভূতনাথের মুখের ভাব লক্ষ্য করে বললেন, না, ভয় পাবেন না-–পয়সাটয়সা চাইনে, আধলাও নয়, এমনিই আপনাকে খেতে দিচ্ছি। মতিবাবু তো জহুরী লোক, তিনি পর্যন্ত খেয়ে ধরতে পারেন না আজ্ঞে–জিজ্ঞেস করলাম—কী তামাক বলুন দিকি মতিবাবু? —মতিবাবু খানিকক্ষণ ভাবলেন, দু’চার বার টানলেন, এদিক ওদিক সাত পাঁচ সব ভেবে বললেন—আট আনা ভরির অম্বুরি যেন মনে হচ্ছে লোচন…
ভূতনাথ বললে–তারপরে?
তারপরে আর কী ঘটনা ঘটলো তা লোচন বললে না। নিজের কাজে মন দিলে কিছুক্ষণ। তারপর বললে—ওই মতিবাবু, মেজবাবু, ভৈরবাবুর মতো দু’একজন লোক এখনও আছে বলে পৃথিবীটা টিকে আছে—নইলে য়্যাদিনে কবে কলিযুগ এসে যেতো… দেখতেন।
—তা তো বটেই লোচন–আচ্ছা আমার একটু তাড়াতাড়ি আছে—আসি-বলে ভূতনাথ ভিস্তিখানায় ঢুকে পড়লো।
বেরোতে বেরোতে বেশ বেলা হয়ে গেল। মাধববাবুর বাজারের পাশে বেশ ভিড় জমেছে। সিনেট হল-এর সামনে গাড়িঘোড়া পুলিশের ভিড়। চারদিকে য়ুনিয়ন জ্যাক উড়ছে। ভিড়ের ঠেলায় কাছে ঘেঁষা যায় না। সামনে লাল কাপড়ের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে–কনভোকেশন’।
বেশ মনে আছে বোধহয় ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৯০৫ সাল।
ভিড় কাটিয়ে চলে যাওয়ারই কথা। চলেই যাচ্ছিলো ভূতনাথ। হঠাৎ চারদিকে বেশ গুঞ্জন শুরু হলো। পুলিশের দল বেশ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো। হট যাও—হট যাও শালে লোক—এই উল্লঃ—
পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো—ওই বড়লাট আসছে।
বড়লাট! ভূতনাথও দাঁড়িয়ে পড়লো। বড়লাটকে কখনও দেখেনি ভূতনাথ। সামনে পেছনে মাউন্টেড পুলিশ। গাড়ি থেকে নেমে বড়লাট উঠতে লাগলেন সিঁড়ি দিয়ে। .
ভূতনাথের তখন দাঁড়াবার সময় নেই। বি-এ পাশ করলে সে-ও এইখানে এসে ডিগ্রি নিতে বড়লাটের হাত থেকে। কালো গাউন পরে গিয়ে বসতে সকলের সঙ্গে।
–ভূতনাথ-দা’ না?
পেছন ফিরে দেখলে ভূতনাথ। অচেনা লোক। কাঁধে হাত দিয়েছে। হাসি-হাসি মুখ।
–চিনতে পারছেন আমাকে?
চিনতে পারা যায় না। কোথায় যেন দেখেছে।
—আমি নিবারণ, ‘যুবক সঙ্ঘে’র কথা মনে আছে? আপনি আর গেলেন না ওখানে? কেমন আছেন? প্রায় দু’বছর পরে দেখা আপনার সঙ্গে—একসঙ্গে অনেক কথা বলে গেল নিবারণ।
–কী খবর তোমাদের? তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে হ্যাঁ ভালো কথা, ব্ৰজরাখাল কোথায় জানো? তোমাদের যুবক সঙ্ঘে’র প্রেসিডেন্ট?
–কেন, আপনি জানেন না?
-না, এই তো সবে ক’দিন হলো উঠে বেড়াচ্ছি, অনেকদিন তো শয্যাশায়ী ছিলাম, ঘা বিষিয়ে গিয়েছিল। উঠে বেড়ানো বারণ করেছিল ডাক্তার। আরো এক বছর কাটলো বিশ্রাম নিতে, এখনও বেশি পরিশ্রম করলে মাথা ধরে। কোথা দিয়ে যে সময়গুলো হু হু করে কেটে যায় টের পাওয়া যায় না, মনে হচ্ছে এই যেন সেদিন তোমাদের ওখানে ছিলাম!
—এখন কোথায় যাচ্ছেন?
—সেই ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে, কতদিন আপিসে যাইনি, চাকরি বোধহয় আমার নেই, মাঝখানে শুধু দু’তিনখানা চিঠি লিখে ওদের জানিয়েছিলাম যে এখনও পুরোপুরি সারিনি। সেরে উঠলেই যাবো। আজ কর্তা একবার ডেকে পাঠিয়েছেনযাই দেখে আসি।
নিবারণ বললে—বড়দা’ও আসবে কলকাতায় দু’একদিনের মধ্যে।
—কে? ব্রজরাখাল? এতদিন কোথায় ছিল সে?
নিবারণ বললে—তিনি তো সেই তখন থেকেই বাইরে—অনেকদিন পর্যন্ত আমরা কোনো খবর পাইনি, স্বামিজীর আলমোড়ার আশ্রমে অনেকদিন ছিলেন, সেখান থেকে একবার খবর আসে তিনি অসুস্থ। তারপর শুনলাম তিনি তিব্বতে চলে গিয়েছেন। এই সেদিন আবার শুনলাম তিনি নাগপুরে এসেছেন প্লেগের জন্যে, খুব প্লেগ হচ্ছিলো, সেই শুনে তিনি কারো বারণ না শুনে প্লেগরুগীদের সেবা করতে এসেছিলেন। এবার সিস্টার নিবেদিতা ওঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন—লিখেছেন—মোক্ষ নিতে দৌড়চ্ছে৷ ব্ৰজরাখাল, কিন্তু যারা লাফাতে পারে না তারা পার হবে লঙ্কা! দুটো মানুষের মুখে অন্ন দিতে পারে না, দুটো লোকের সঙ্গে একবুদ্ধি হয়ে একটা সাধারণ হিতকর কার্য করতে পারো না—মোক্ষ নিতে দৌড়চ্ছে। বৌদ্ধের ঐখানটায় গুলিয়ে ফেলে যত উৎপাত করে ফেললে আর কি! সিস্টার নিবেদিতা বলেন—অহিংসা ভালো কিন্তু নিঃশত্রু হওয়া আরো বড় কথা, আতোয়িনমায়ান্তং ইত্যাদি, অর্থাৎ হত্যা করতে এসেছে এমন ব্ৰহ্ম বধেও পাপ নেই, তোমাদের মনুই তো বলেছেন—বীরভোগ্যা বসুন্ধরা–বীর্য প্রকাশ করে, সাম, দান, ভেদ, দণ্ডনীতি প্রকাশ করে, ভোগ করো, পৃথিবী ভোগ করে, তবে তুমি ধার্মিক—আর ঝাটা লাথি খেয়ে চুপটি করে ঘৃণিত জীবন যাপন করলে ইহকালেও নরক ভোগ, পরকালেও তাই–কথা বলতে বলতে নিবারণ থামলে।
ভূতনাথ বললে—ব্রজরাখাল সে-চিঠির কিছু উত্তর দিয়েছে?
–দিয়েছেন আমাদের কদমদা’কে একটা চিঠি। লিখেছেন–আমি যাচ্ছি শিগগির, তোমরা তৈরি হও। সিস্টার নিবেদিতা সেদিনও আমাদের যুবক সঙ্ঘে’ এসে বলে গেলেন—স্বামিজী বলে গিয়েছেন—অজুন ওই তমোগুণে পড়েছিলেন বলেই তো ভগবান অত করে বোঝাচ্ছেন গীতায়—প্রথম ভগবানের মুখ থেকে বেরুলো —‘ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ’–জৈন বৌদ্ধদের পাল্লায় পড়ে আমরাও ওই তমোগুণের মধ্যেই পড়েছি—কেবল ডাকছি ভগবানকে ভগবান শুনবেনই বা কেন, আহাম্মকের কথা মানুষই শোনে না— তা ভগবান! এখন আমাদের একমাত্র উপায় হচ্ছে ভগবানের উপদেশ শোনা—ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ’—তস্মাত্ত্বমুত্তিষ্ঠ যশোলভস্ব’: আমাদের যুবক সত্যে’গীতা-ক্লাশ হয়—একদিন যাবেন না বেড়াতে?
