—আগে বলো, আর খাবে না।
ছোটবৌঠান বললে—একটু অভ্যেস করে নিই। একটু একটু অভ্যেস না করলে যে হেরে যাবো ছোটকর্তার কাছে—কিন্তু বডেড়া ঝাঁঝ ভূতনাথ।
ভূতনাথ দেখলে—বৌঠান গেলাশটা নিয়ে অতি সঙ্কোচে যেন একবার জিভে ছোঁয়ালো। ছোঁয়াতেই গেলাশটা সরিয়ে নিলে। মুখটা কেমন বিকৃত হয়ে উঠলো। বড় ঝাঝ বুঝি। তারপর আর একবার ছোঁয়ালে জিভে। এবার সবটা। তারপর সমস্ত শরীরটা যেন কেমন শিউরে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে একটা পান মুখে পুরে দিলে। দরদর করে ঘাম ঝরছে সারা শরীরে। লাল হয়ে উঠলো। সারা মুখখানা। একটা আবেগ ছড়িয়ে পড়লো সর্বাঙ্গে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে কেমন লাগছে এখন?
ছোটবৌঠানের চোখ দুটো স্তিমিত হয়ে এল। শুধু একবার বললে—বড় জ্বালা করছে—আর একটু বরফ-জল দাও তো ভূতনাথ।
ভূতনাথ জল গড়িয়ে দিলে গেলাশে।
জল খেয়ে বৌঠান বললে—আমার ঠাকুরমা’র যিনি মা ছিলেন ভূতনাথ, শুনেছি, তিনি সহমরণে গিয়েছিলেন, মহা ঘটা হয়েছিল সে-সময়ে, তিনি নাকি হাসতে হাঁসতে চিতায় উঠেছিলেন, তার হাতে-পায়ে দড়ি বাঁধতে হয়নি, দেশের লোক ধন্য ধন্য করেছিল—আর আমিও আজ সহমরণে যাচ্ছি ভূতনাথ—দেখো আমি মরলেও ধন্য ধন্য পড়ে যাবে।
হঠাৎ ভূতনাথ হাত দিয়ে ছোটবৌঠানের মুখ চাপা দিয়ে দিলে–মরা ছাড়া তোমার কথা নেই মুখে।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই কী যে কাণ্ড ঘটে গেল। ছোটবৌঠান নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে এক চড় বসিয়ে দিলে। কোমল হাতের চড়! কিন্তু চড়টা ভূতনাথের গালের ওপর ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
চিৎকার করে উঠলো বৌঠান-যাও, বেরিয়ে যাও—এখনি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাও।
এক মুহূর্তের মধ্যে ঘটনা-বিপর্যয়ে যেন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছে ভূতনাথ। হঠাৎ মনে হলো যেন ছোটকর্তার জুতোর আওয়াজ কানে এল। আর দাঁড়ানো যায় না। ভূতনাথ ভয় পেয়ে গিয়েছে। এখনি ছোটকর্তা এসে ঘরে ঢুকবে। ভূতনাথ পেছন ফিরে এক নিমেষে চোরের মতো নিঃশব্দে সবার অলক্ষ্যে পালিয়ে এসেছে। শুধু মনে হলো তার এই ভয় পাওয়া দেখে যেন হেসে উঠলো বোঠান। প্রচণ্ড হাসি। সে-হাসি আর থামতে চায় না। পাগলের মতো, মাতালের মতো বৌঠান ঘর ফাটিয়ে হাসছে!
আর তারপরেই আচমকা ঘুমটা ভেঙে গেল ভূতনাথের। প্রথমটা যেন ঠিক বোঝা গেল না। তারপর জ্ঞান হলে বোঝ গেল, ভূতনাথ তার ছোট চোরকুঠুরিতেই শুয়ে আছে। আর তারপরেই খেয়াল হলো—কে যেন দুমদাম শব্দ করে দরজা ঠেলছে অনেকক্ষণ ধরে। ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখা গেল বংশীকে। বংশী একা নয়। সঙ্গে একজন চীনেম্যান, আর একজন নুরওয়ালা লোক। মনে হয় মুসলমান।
বংশী বললে—কী ঘুম আপনার শালাবাবু-কত বেলা হয়ে গেল, কতক্ষণ ধরে দরজা ঠেলছি!
ভূতনাথ যেন একটু লজ্জায় পড়লো। চারদিকে বেশ কড়া রোদ উঠে গিয়েছে। ছোটঘর বলে বিশেষ কিছু বোঝা যায়নি।
বংশী তখন চীনেম্যানকে বললে—হাঁ করে দেখছো কি সাহেব এই পায়ের মাপ নিয়ে নাও।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কী ব্যাপার আবার?
—আপনার পায়ের মাপ নিতে হবে, ছোটমা’র হুকুম—ছুটুকবাবুর বিয়েতে বাড়িসুদ্ধ লোকের পায়ের মাপ নিতে হচ্ছে যে।
চীনেম্যান পায়ের মাপ নেবার পর বংশী পাশের লোকটিকে বললে—খলিফা সাহেব, এবার তুমি এগিয়ে এসো, দেরি করে না বাপু আবার, একটা কামিজ আর একটা কোট—আমার ওদিকে আবার অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। ছোটবাবু আবার আজ বাড়িতে রয়েছে।
মাপ নেওয়া হলো। চীনে মুচি আর ওস্তাগর চলে গেল।
ভূতনাথ ডাকলে–ও বংশী, শোন ইদিকে?
বংশী এল। বড় শশব্যস্ত।
—কী ব্যাপার বল তো? আমার এ-সব কেন?
—আজ্ঞে, এই যে রেওয়াজ, বাড়িসুদ্ধ সবার হচ্ছে আর আপনার হবে না? ভৈরববাবু, মতিবাবু, তারকবাবু, ওঁয়ারা সব এ-বাড়ির কে বলুন না, ওঁদেরও হলো, আর শুধু ওঁদেরই নাকি? ওঁদের ছেলে নাতি সবাই সক্কাল বেলা এসে গায়ের পায়ের মাপ দিয়ে গেল যে—তাই তো ছোটমা বলে পাঠালে
—ছোটমা নিজে বলেছে?
—তা ছোটমা নিজে বলবে না তো কি মেজমা বলেছে। মেজম’র বয়ে গিয়েছে।
কেমন যেন অবাক লাগলো ভূতনাথের। এ ক’দিন এখানে থাকতেই খারাপ লাগছিলো তার। যেন অনধিকার প্রবেশ করেছে সে এ-বাড়িতে। কোন্ দিন খাজাঞ্চীখানার বিধু সরকার না…
ভূতনাথ বললে—অথচ আমি ভাবছিলাম কোন্ দিন সরকার মশাই হয় তো কী বলে বসবে আবার, ভাবছিলাম ব্ৰজরাখাল নেই, আমি এখানে আছি, অন্নধ্বংস করছি—
বংশী বললে—সে-কথাও হয়ে গিয়েছে।
–হয়েছে নাকি সে-কথা?
—আজ্ঞে হ্যাঁ। হয়েছে বৈকি! মেজমা’র ছেলেরা এখন মামার বাড়ি গিয়েছে, পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে, তাই ছুটি—তারা ফিরে এলে আপনিই পড়াতে শুরু করে দেবেন।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—আচ্ছা, সে ছেলেদের কই একদিনও তো দেখতে পেলাম না থাকে কোথায়?
–তারা আজ্ঞে, বেশির ভাগই তো মামার বাড়িতে থাকে, লেখাপড়া যা হয়, তা খুব জানি, গাড়ি করে স্কুলে যেতে দেখেন নি, তা আপনি তো ভোর বেলাই আপিসে চলে যান, আর আসেন সন্ধ্যেবেলা—দেখবেন কখন? সন্ধ্যেবেলা তারা বাড়ির ভেতর নিজেদের ঝি-এর কাছে থাকে—তা বিধু সরকারকে আপনার অত ভয় কি?
তারপর শশব্যস্ত হয়ে বললে—আমি এখন যাই শালাবাবুছোটবাবু বাড়িতে আছে আজ।
-তাই নাকি? ছোটকর্তা কোন্ ঘরে শুয়েছিল কাল রাতে?
—কেন, ছোটমা’র ঘরে। রাত্রে গিয়ে ছোটবাবুকে আমি ছোটমা’র ঘরে পৌঁছে দিলাম আজ্ঞে—যা-ই বলুন আপনার ‘মোহিনী-সিঁদুরে’র ফল আছে বলতে হবে কিন্তুক।
২৩. বংশী চলে গেল
বংশী চলে গেল।
