ভূতনাথ বললে–তুমি আমাকে আনতে বোলো না বৌঠান।
-কেন ভূতনাথ, কী হলো হঠাৎ তোমার?
ছোটবৌঠান এবার ভূতনাথেব দুটো হাত ধরে বললে—আচ্ছা পাগল যা হোক, কেউ কিছু বলেছে নাকি শুনি?
ভূতনাথ কেমন যেন নরম হয়ে এল। মনে হলো, এক্ষুণি সে বুঝি কেঁদে ফেলবে। বললে—কেন তুমি খেতে যাবে ওই ছাই-পাশ-ও বুঝি কোনো মানুষ খায়? লক্ষ্মীছাড়ারাই কেবল ওই সব খায় যে।
ছোটবৌঠান বললে–কেন, এ-বাড়ির ছোটকর্তা তত খায়— কেউ না খেলে ওদের দোকান চলে কী করে?
–যে-খায় সে-খায়, কিন্তু তুমি খেতে পাবে না, তোমাকে আমি খেতে দেবো না–কিছুতেই। ওগুলো খেয়ে তুমি বাঁচবে না।
ছোটবৌঠান এবার খিল খিল করে হেসে উঠলো। বললে–মরাই আমার ভালো ভূতনাথ, স্বামী যার দিকে ফিরে দেখে না, তার বেঁচে থেকে লাভ কী! তবু একবার দেখি না আমার ফেরাতে পারি কি না। মহাভারতে পড়েছি, সেকালের সতীরা কত কী করেছে—কলাবতী, মাদ্রী, লোপামুদ্রা, তাদের মতো হতে চাইছি না, কিন্তু স্বামীর কথা একবার শুনেই দেখি না! ও-খেলে তো কেউ মরে না।
ভূতনাথ হঠাৎ বললে—মরতে তোমার বড় সাধ, না বৌঠান?
ছোটবৌঠান বললে—না ভাই, বরং ঠিক তার উল্টো, আমার মতো এমন করে কেউ বাঁচতে চায় না সংসারে, তবে স্বামীর জন্যে মরতেও আমার আপত্তি নেই কিন্তু এই না-বাচা, না-মরা অবস্থা আমি আর সহ্য করতে পারছি না ভূতনাথ।
—কিন্তু এতেও যদি ছোটকর্তার মতিগতি না ফেরে, তখন?… তখন কী করবে বৌঠান?
ছোটবৌঠান বললে—তখন তোমার ভয় নেই ভূতনাথ–তোমায় দোষ দেবে না তা বলে—কাউকেই দোষী করবো না, আমার কপালেরই দোষ বলে মানবব…কিন্তু সে কথা থাক, আমার জন্যে তোমার এত মাথাব্যথা করতে হবে না। এ-বাড়িতে একটা ঘোড়ার জন্যেও ভাববার লোক আছে, কিন্তু বউ বড় সস্তা, বউ মরলে বউ আসবে, কিন্তু ঘোড়া মরলে ঘোড়া কিনতে পয়সা লাগে যে।
–তবে একটা কথা দাও বোঠান, মদ তুমি বেশি খাবে না।
—তা কি হয়, ছোটকর্তা যত খেতে বলবে তত খাবো, আমি যে কথা দিয়েছি, যা বলবে ছোটকর্তা, সব করবো।
ভূতনাথ খানিক থেমে বললে কিন্তু ছি, এমন কথা কেন দিতে গেলে তুমি?
ছোটবৌঠান হেসে উঠলো। গলা নিচু করে বললে তুমি আমায় খুব ভালোবাসো, না ভূতনাথ!
লজ্জায় ভূতনাথের কান দুটো বেগুনি হয়ে উঠলো। ঝা ঝা করে উঠলো মাথাটা এক নিমেষে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো নামিয়ে নিলে। খানিকক্ষণের মধ্যে মাথা তুলতে পারলো না সে।
ছোটবৌঠান কিন্তু অপ্রস্তুত হয়নি একটুও। বললে—পরস্ত্রীকে ভালোবাসা পাপ-তা জানো তো।
ভূতনাথ একবার প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলো।
ছোটবৌঠান আবার বললে—তা যদি সত্যিই ভালোবাসে। আমাকে—তত ওটা নিয়ে এসো। যদি নিয়ে আসতে পারে আজ রাত্রে তো বুঝবো সত্যিই ভূতনাথ আমাকে ভালোবাসে।
এ-কথার পর ভূতনাথ আর একমুহূর্তও দাঁড়ায়নি সেখানে।
সেদিন বংশীকে নিয়ে সেই রাত্রেই শেষ পর্যন্ত মদ কিনে নিয়ে এসেছিল ভূতনাথ। যে-হাতে একদিন ‘মোহিনী-সিঁদুর এনে দিয়েছিল বৌঠানের হাতে, সেই হাতেই এনে দিয়েছিল মদের বোতল। আজ অবশ্য অনুতাপ হয় সেজন্য। এত বছর পরে অবশ্য অনুতাপের কোনো অর্থ হয় না। কিন্তু সেদিন সে তা না দিলে বড়বাড়ির ইতিহাস হয় তো অন্য রকম হতো। কিন্তু তা হোক, ছোটবাবু তো ফিরেছিল। ফিরেছিল তার মতিগতি! এতদিন পরে সেইটেই শুধু ভূতনাথের সান্ত্বনা!
তোষাখানার সর্দার মধুসূদন বললে—এই নিন শালাবাবু আপনার চিঠি—কাল থেকে পড়ে আছে।
চিঠি খুলে কিন্তু অবাক হয়ে গিয়েছিল ভূতনাথ। চিঠি লিখেছেন সুবিনয়বাবু। মোহিনী-সিঁদুরের মালিক। আলোটার তলায় এসে অত রাত্রেই পড়ে দেখলে।
সুবিনয়বাবু লিখেছেন–
ব্ৰহ্ম কৃপাহি কেবলম্–
সুচরিতে,
শুভানুধ্যায় বিজ্ঞাপনঞ্চ বিধায়–
পরে ভূতনাথবাবু, প্রেমময় ঈশ্বরের কৃপায় তুমি এতদিনে নিশ্চয় আরোগ্য লাভ করিয়াছ। তুমি যথাসত্বর আমার সহিত একবার দেখা করিবে। বিশেষ প্রয়োজন বিধায় পত্র লিখিলাম। আমার বড় দুঃসময় যাইতেছে। আমি পাপী, অপদার্থ, আমি অনুতাপ অনলে নিরন্তর দগ্ধ হইতেছি। তুমি আসিলে কথঞ্চিত শান্তি পাইব। ইতি সত্যং জ্ঞানমনন্তং–
নিবেদক,
শ্ৰী……
অত রাতে আর ‘মোহিনী-সিঁদুরে’র আপিসে যাবার উপায় নেই তখন। কিন্তু রাতটা যেন একরকম জেগেই কাটালো ভূতনাথ। হঠাৎ আধো ঘুমের মধ্যে যেন তন্দ্রা ছুটে যায়। যেন সে বিছানায় শুয়ে নেই। যেন সে ছোটবৌঠানের ঘরে গিয়েছে। পাশাপাশি বসে আছে তারা। চিন্তাকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে বোঠান। অনেক গল্প করছে দুজনে। বৌঠান বলছে—“তুমি আমাকে অত ভালোবাসো কেন ভূতনাথ’। বৌঠানের শাদা চোখের ভেতর দুটো কালো কুচকুচে তারা। তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ঠোট দুটো একটা আর একটাকে দাত দিয়ে কামড়ায়। ঠিক দু’ কানের নিচে ঘাড়ের দিকের কয়েকটা চুল উড়ে এসে সামনে পড়েছে। বৌঠান তেমনিভাবে চেয়ে বললে—“আমি যদি মদ খাই—তাতে তোমার কি এসে যায়—আমি তোমার কে বলো না যে, আমায় তুমি বারণ করছে। অসম্পূর্ণ কথার সব টুকরো। ঘুমের ঘোরের মধ্যেই যেন স্পষ্ট দেখতে পেলে ছোটবৌঠানকে। হঠাৎ বৌঠান বোতলটা কাত করে ঢালতে গেল।
ভূতনাথ খপ করে বৌঠানের চুড়িসুদ্ধ হাতটা ধরে ফেলেছে।–তুমি আবার খাচ্ছে বৌঠান?
বৌঠান একবার কঠিন দৃষ্টি দিয়ে তাকালো ভূতনাথের দিকে। বললে—হাত ছেড়ে দাও বলছি!
—এই তো খেলে, আবার খাচ্ছো কেন?
ছোটবৌঠান সে-কথার জবাব না দিয়ে বললে—তুমি এবার যাও ভূতনাথ—তুমি এবার যাও—অনেক রাত হয়ে গেল।
