—তা-ই দেবো, আমি মদ খেলে তুমি যদি ঘরে থাকো তো তা-ই করবো।
শুনতে শুনতে আমার শরীর হিম হয়ে এল শালাবাবু! শেষকালে ছোটমা বিষ গিলবে আর আমরা তাই দেখবো! মনে হলো-বড়বাড়িতে একটি মানুষ ছিল যার পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করতে বুক ভরে যায়, তা সে মানুষটাও গেল। কী যে কষ্ট হলো মনটার ভেতর! মনে হলো গিয়ে মানা করি ছোটমা’কে বলি যে খেয়ো না তুমি, ও বিষ খেলে তুমি বাঁচবে না মা—কিন্তু চাকর হয়ে জন্মেছি, ছোট মুখে বড় কথা মানায় না।
—চলে গেল ছোটবাবু। আমিও অন্ধকারে চলে আসছিলাম আজ্ঞে, কিন্তু ছোটমা ডাকলে। গেলাম।
বললে-তোর শালাবাবুকে একবার ডেকে নিয়ে আয় তো।
বললাম—এখুনি?
ছোটমা বললে হ্যাঁ এক্ষুণি, বলবি খুব জরুরী দরকার। এখনি যেন একবার আসে আমার কাছে।
তাই তো তখন আপনাকে ডেকে আনলাম—তা আমি সব জানি, আমার কাছে আপনি লুকোতে পারবেন না আজ্ঞে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে কিন্তু এ জিনিষ কোথায় কিনতে পাওয়া যায় তাও আমি জানি না—কত দাম তাও জানি না। শুধু এই দশটা টাকা আমায় দিয়েছে বৌঠান।
বংশী বললে–ছোটবাবুর মদের আলমারির চাবি তো আমার কাছে, আমি জেনে ফেলবে বলেই আপনাকে কিনতে দিয়েছে ছোটমা, কিন্তু আমি হলে ও বিষ হাতে তুলে দিতে পারতাম না শালাবাবু।
ভূতনাথ বললে—তুই কি বলিস আমি টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আসবো?
–তাই-ই দিন আজ্ঞে—সেই-ই ভালো হবে বরং।
—তবে ফিরে চল। তাই ভালো—ফিরিয়েই দিয়ে আসি টাকা–বলিগে আমি পারবো না।
বংশী বললে—কিন্তু আমার নাম করতে পারবেন না শালাবাবু, বলবেন না যেন আমি বলেছি সব কথা।
আবার সেই পথেই ফিরলো ভূতনাথ। বললেন রে বংশী, তা কখনও বলি।
২২. শহর তখন নিঝুম
শহর তখন নিঝুম। কিন্তু বড়বাড়ি তখনও সরগরম। ছুটুক–বাবুর আসরে বুঝি অনেকদিন পরে আবার গানের আসর বসেছে। আজকাল সব দিন আসর বসে না। আস্তাবলের ভেতর অনেক গাড়ি-ঘোড়ার মধ্যে ছোটবাবুর ঘোড়া দুটোও আজ পা ঠুকছে। শুধু মেজবাবু নিত্যকার মতো বাইরে গিয়েছেন মোসায়েবদের নিয়ে। তোষাখানায় চাকরদের তাস-পাশা-দাবার আড়ার শব্দ। খাজাঞ্চীখানার দরজায় একটা পাঁচসেরি ওজনের ভারী তালা ঝুলছে। ইব্রাহিমের ঘরের কোণে রেড়ির তেলের বাতিটা থেকে এক ফালি তেরছা আলো এসে পড়েছে শানবাঁধানো উঠোনের ওপর। বড়বাড়িতে সব ঘরে ইলেকটিক আলো জ্বলে আজকাল। তবু রেড়ির তেলের বাতিটা তুলে নেবার কথা কারো মনে আসেনি। বদরিকাবাবুর ঘর থেকে জানালার ফুটো দিয়ে ক্ষীণ আলো দেখা যায়। আর দেখা যায় এখান থেকে একেবারে বারান্দার ধারে ব্রজরাখালের ঘরখানা অন্ধকার নিস্তব্ধ নির্জীব। জীবনে ওই একটিমাত্র মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ-পরিচয়ে এসেছে ভূতনাথ। এই কলকাতা শহরে যে-লোকটা শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটতে জানে। আর সেই লোকটাই আজ হারিয়ে গিয়েছে।
পাশ দিয়ে শ্যামসুন্দর যাচ্ছিলো। ভূতনাথকে দেখেই থামলো। ডাকলে—শালাবাবু।
–আমাকে ডাকছিস?
—আপনার একটা চিঠি।
—কোথায় চিঠি?
—মধুসূদনকাকার কাছে আছে, আপনাকে দেবে।
–কা’র চিঠি, ডাকপিওন দিয়ে গেল?
—তা জানিনে—বলে শ্যামসুন্দর নিজের কাজে চলে গেল।
ভূতনাথ একবার দাঁড়ালো। কা’র চিঠি হতে পারে। নিশ্চয়ই ব্ৰজরাখালের। কদিন থেকেই আশা করছিল চিঠির। অন্তত একটা খবর তো দেবে! তেমন মানুষ তো ব্রজরাখাল নয়। কাজের লোক বটে। কিন্তু ব্ৰজরাখাল নেই, আর তার পরিচয়সুবোদেই থাকা এ-বাড়িতে। ব্রজরাখালের অনুপস্থিতিতে কতদিন আর এখানে থাকা যায়। লোকেই বা কী বলবে। আজকাল—সেই চোট লাগার পর এ-বাড়িতে পাল্কি করে আসার পর থেকে ভাত-তরকারি আসে তার রান্নাবাড়ি থেকে। কিন্তু তারও তো একটা সীমা আছে। খাজাঞ্চীখানার খাতায় বিধু সরকার প্রত্যেকটি জিনিষের হিসেব রাখে। একদিন দেখতে পেলে হয়তো বলবে—কে তুমি? কোন্ তরফের লোক? নাম কি তোমার? কোন্ খাতায় তোমার নাম? রান্নাবাড়ি না বারবাড়ি না দেউড়ি না তোষাখানা না…
বিধু সরকারের হিসেবের বাড়তি লোক সে। হিসেবের বাইরে এখন সে। এতদিন সে যে ধরেনি কেন, এইটেই আশ্চর্য!
যারই চিঠি হোক সে পরে দেখলেই হবে। এখন আর সময় নেই। ভূতনাথ অন্ধকার পেরিয়ে সেই দক্ষিণের চোরকুইরির বারান্দা দিয়ে আবার গিয়ে হাজির হলো মুখোমুখি। ভেতরে যথারীতি রোজকার মতো আলো জ্বলছে। ছোটবৌঠান বালিশে মুখ গুজে শুয়ে ছিল। বেড়া খোঁপাটা এলিয়ে পড়েছে। ঘাড়ের ওপর বিছে হারটা ইলেকটি ক আলোয় চিক চিক করছে। ওদিকে যশোদাদুলালের সামনে দু’চারটে ধূপকাঠি জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হবার মত। আলমারির ভেতরের সেই পুতুলটা যেন কটাক্ষ করলো আবার। চিন্তাকে আশে পাশে কোথাও দেখা গেল না। ভূতনাথ দরজার চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়ে ডাকলো—বৌঠান?
এক নিমেষে চমকে-ওঠা হরিণীর মতন ঘাড় বেঁকিয়ে দেখেই উঠে পড়লো ছোটবৌঠান। তারপর কাপড়টা গুছিয়ে বললে— কে, ভূতনাথ? এনেছো? তারপর সামনে এসে বললে-দাও।
ভূতনাথ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
ছোটবৌঠান আবার বললে—কই, দাও দেখি।
ভূতনাথ এবার স্পষ্ট করে জবাব দিলে—আনিনি।
—আনননি? কেন? দোকান খোলা পেলে না?
–দোকান পর্যন্ত যাইনি।
—কেন? পটেশ্বরী বৌঠানের আর বিস্ময়ের সীমা নেই।
ভূতনাথ বললে—আমি আনতে পারবো না বৌঠান, এই তোমার টাকা ফেরৎ নাও-ও-বিষ আমি আনতে পারবো না।
বৌঠান এবার শক্ত হয়ে দাঁড়ালো। তাকালো ভালো করে ভূতনাথের মুখের দিকে। বললে—তুমি আনতে পারবে না তাহলে?
