সাপ দেখে সরে আসার মতো ভূতনাথ এক পা পিছিয়ে এল!—তুই কী করে জানলি বংশী?
বংশী নির্বিকারভাবে সঙ্গে চলতে চলতে বললে—বলবে আবার কে শালাবাবু, এতদিন বড়বাড়িতে চাকরি করছি, সব জানতে পারি, চাকর-বাকর যদি না জানে তো জানবে পাড়ার পাঁচজনে? আমি যা জানি তা ছোটমাও জানে না, মেজমাও জানে না, ছোটকর্তা মেজকর্তা কেউ জানে না, কোন ঘরে কার রাত কাটে, কবে চুপি চুপি বড়বাড়িতে ডাক্তার আসে, দাই আসে, ওষুধ-বিষুধ, রোগ-জারি, সব টের পাই আমরা। এই তো গেল-বছরে বড়বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে সক্কালবেলা লোকের ভিড়, পুলিশ পেয়াদা, হৈ চৈ, কাক-চিল-শকুনির পাল–সবাই অবাক হয়ে দেখে কী?, একটা একদিনের মরা ছেলে—সবে জন্মেছে আজ্ঞে। সব জানি, কে ফেলেছে—কোন্ ঘর থেকে বেরিয়েছে-কিন্তু আমরা চাকর মনিষ্যি, আমাদের অত সাত-সতেরোতে থাকার কী দরকার। পুলিশ এল—জিজ্ঞাসাবাদ করলে—বললুম-কিচ্ছু জানি না বিত্তান্ত —চুকে গেল ল্যাটা।
ভূতনাথ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে—আচ্ছা, ছোটমা হঠাৎ এই বিষ কিনতে দিলে কেন জানিস বংশী।
বংশী খানিক চুপ করে রইল। তারপর বললে—মাইরি শালাবাবু, আপনি বামুন মানুষ, আপনার এই পা ছুঁয়ে বলতে পারি, ছোটমা’কে আমি ঠাকুর দেবতার মতো ভক্তি করি, ছোটমা’র দুঃখু ঘোচাতে আমি প্রাণ দিতে পারি আজ্ঞে। লোচন, মধুসূদনকাকা ওরা তো তাই হিংসে করে, বলে—আর জন্মে তুই ছোটমা’র পেটের ছেলে ছিলি। তা পেটের ছেলে তো ছোট কথা হলো হুজুর, পেটের ছেলেই কি দেখতে পারে সব মা’কে তেমন মায়ের মতন আবার মা তো হওয়া চাই। তা সেদিন সন্ধ্যেবেলা বাবু ঘরে এসেছে, আমিই ডেকে এনেছি তাকে। মা ডাকতে পাঠিয়েছিল। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনছি আজ্ঞে।
ছোটমা বলছে—তুমি আবার যাবে নাকি ওখানে?
ছোটবাবুর তখনও বিষ পেটে পড়েনি কিছু। জ্ঞান আছে বেশ। বললে-যাই যদি তো তোমার কী!
–-ছোটকর্তার তো ওই রকমই কথার ঢং।
ছোটমা বললে-নাই বা গেলেনা গেলে হয় না?
–বউ-এর আঁচল ধরে থাকি তেমন বংশে জন্ম নয় আমার ছোটবউ।
ছোটমা যেন কিছুক্ষণ ভাবলে। তারপর বললে—আঁচল ধরে থাকতে বলছি না, কিন্তু আঁচল না ধরেও তো ঘরে থাকা যায়।
–ঘরে বসে তোমার মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকবে নাকি?
—চেয়ে থাকতে ভালো না লাগে চেও না, মুখ ফিরিয়ে থেকো—আমি তোমার সেবা করবো।
ছোটবাবুর হাসির শব্দ শুনতে পেলুম আজ্ঞে। অপগেরাজ্যির হাসি। একটু পরে ছোটবাবু বললে সেবা করতে জানো তুমি ছোটবউ?
ছোটমা বললে—একবার পরখ করেই দেখোনা সেবা করতে জানি কিনা।
ছোটবাবু বললে—আমি তত তোমার যশোদাদুলাল নই, পাথরের কিংবা সোনা-রূপোর ঠাকুরদেবতাও নই—আমি মানুষ, রক্তমাংসের মানুষ—আমাকে সেবা করতে পারবে? ভেবে দেখো।
ছোটমা’র গলা শুনতে পেলুম—এতে ভাববার কিছু নেই, হিন্দু মেয়েদের স্বামীসেবা শিখতে হয় না।
ছোটবাবু আর একবার হেসে উঠলো আজ্ঞে, সেই অপগেরাজ্যির হাসি। বললে—আমি তো তেমন স্বামী নই ছোটবউ। বড়বাড়ির পুরুষমানুষের জন্মের আগে থেকে মদ খেতে শেখে, মানুষ হয় ঝি-চাকরের কোলে, আটদশ বছর বয়সে অন্দরমহলে ঢোকা বন্ধ তাদের, বয়সকালে রক্ষিতা রাখে, পাল্লা দিয়ে বাবুগিরি করে, মোসাহেব পোষে—এমন স্বামীকে সেবা করে খুশি করা তোমার কম্ম নয় ছোটবউ।
—একবার পরখ করেই দেখো না তুমি।
ছোটবাবু বললে-মিথ্যে পরখ করা ছোটবউ, মেহনতই সার হবে, ঘরের বউরা সে পারবে না, বড়বাড়ির কোনো বউই পারেনি আজ পর্যন্ত, শুধু বড়বাড়ি কেন, দত্তবাড়ি, মল্লিকবাড়ি, শীলবাড়ি, শেঠবাবুদের বাড়ির কোনো বউ চেষ্টাও করেনি পারেও নি। ওতে অনেক ল্যাঠা, সে পারে ওরা—ওই বাগানবাড়ির মেয়েমানুষেরা–ওরা কায়দা-কানুন জানে।
ছোটমা’র গলার শব্দ কেমন কঁদো কাঁদো শোনালো আজ্ঞে। বললে—এই তোমার পায়ে ধরে বলছি ওগো—দেখো, কেউ পারেনি, কিন্তু আমি পারবো-ওরা সবাই বড়লোকের ঘরের মেয়ে, আমায় গরীবের ঘর থেকে এনেছে। আমি পারবে—তুমি যা বলবে তাই করবো, যেমন করে সাজতে বলবে তেমনি করে সাজবো, যেমন করে কথা বলতে বলবে তেননি করে বলবো,, তোমার মাথা টিপে দেবো, পা টিপে দেবো।
—গান গাইতে পারবে?
ছোটমা বললে—গান তো বাবার কাছে শিখেছিলাম, সেই সব গান যদি তোমার পছন্দ হয় গাইবো।
—নাচ?
ছোটমা বললে—নাচিনি কখনও, কিন্তু শিখিয়ে নিলে তাও পারবে—তোমার জন্যে আমি সব পারি জানো।
ছোটবাবু এবার হঠাৎ বললে—আর মদ? মদ খেতে পারবে? যেমন করে চুনীবালা মদ খায়?
খানিকক্ষণ চুপচাপ। কোনো কথা শুনতে পেলাম না আজ্ঞে। ছোটমা বুঝি ভাবতে পারেনি ছোটকর্তা এমন কথা বলতে পারে। আমিও কেমন যেন বোব হয়ে গেলাম। নিজের সোয়ামী কেমন করে একথা বিয়ে-করা ইস্তিরীকে বলতে পারে আজ্ঞে! ও মদ আর বিষ তো একই জিনিষ, সেই বিষ নিজের ইস্তিরীকে কেমন করে খাওয়াতে পারে মানুষ! তা ছোটবাবু তো আজ্ঞে মানুষ নেই আর। নতুন-মা’র কাছে থেকে থেকে মানুষটার মধ্যে আর কিছু নেই হুজুর। কিন্তু ধন্যি আমার ছোটমা, মা তো নয় সাক্ষাৎ সতীলক্ষ্মী। তা মা-ও সেই কথা বললে—আমার মা’র মতন উপযুক্ত কথাই বললে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে–কী বললে?
—বললে–তা খাবো, মদই খাবো, তুমি হাতে করে তুলে দিলে আমি বিষও খেতে পারি হাসিমুখে।
ছোটবাবু হেসে উঠলো। বললে—কিন্তু নিয়ম তো তা নয়, আমি তুলে দেবো না, তুমিই বরং আমার হাতে গেলাশ তুলে দেবে ছোটবউ।
