ভূতনাথ বললে—ছোটবাবু আজকাল বাড়ি থাকছে?
শুনে কেমন যেন অবাক হয়ে গেল ভূতনাথ। এ-খবরটা তো জানা ছিল না।
বংশী বললে—ওঠবার কি সাধ্যি আছে তেমন! কোনো রকমে একবার ছোটমা’র ঘরে যান, আর নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়েন। ডাক্তার মানা করেছে যে। বলেছে, যদ্দিন না সেরে ওঠেন একেবারে ওঠা-হাঁটা বন্ধ। কী-চেহারা কী হয়েছে শালাবাবু, দেখলে আপনার কান্না পাবে মাইরি।
–মদ খাওয়া ছেড়েছেন নাকি?
–ও বিষ কি আর কেউ ছাড়তে পারে আজ্ঞে! এই আমিই দেখুন না কেন—আজকাল যখন ছোটবাবু শয্যাশায়ী থাকেন, গেলাশে ঢেলে দিই, তা একটু-আধটু জল মিশিয়ে দিই শালাবাবু, মনে হয় মানুষটাকে তো আমিই মেরে ফেলেছি। ডাক্তার পই পই করে বলেছে, ও-খেলে আর বাঁচবে না। তবে কার কথা কে শোনেসেই আগৈকার মতনই খাচ্ছেন, আর আমিই সেই বিষ নিজের হাতে ঢেলে দিচ্ছি। সকালবেলায় এক-একদিন নিজের ঘরের জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ান, বাইরে চেয়ে দেখেন একবার দিনের বেলাটায় তত নেশা থাকে না বাবুর, কিন্তু সন্ধ্যে হলেই
আন বরফ, আন বোতল—তবু ভালো যে নতুনমা’র বাড়ি যাবার ক্ষেমতা নেই, ক্ষেমতা থাকলে কি আর ছাড়তেন—ঠিক ছুটতেন। মাগী ওকে কী বশই যে করেছে–
তারপর হঠাৎ থেমে বংশী বললে—হ্যাঁ, ভালো কথা, জানেন সেদিন নতুন-মা যে বড়বাড়িতে এসেছিল–শোনেন নি?
—কবে? টের পাইনি তো কিছু?
—আপনি টের পাবেন কি করে, তখন আপনি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, রাত তখন অঢেল, নাথু সিং এসে চুপি চুপি আমায় খবরটা দিলে। বললে-বংশী, রূপোদাসীর মেয়ে চুনীবালা এসেছে। ছোটবাবুর কাছে যেতে চায়, গেট খুলবো?
আমি ভাবলাম—চুনীবালা এসেছে ছোটবাবুর কাছে, ক’দিন যেতে পারেননি বাবু, বাবু শুনলে যদি আবার অনখ বাধায়, বললাম–দাঁড়া—বলে সোজা ছোটমা’র কাছে দৌড়ে গেলাম। ছোটমা তখন পূজো সেরে সবে উঠেছে। কথাটা শুনেই রেগে একেবারে আগুন! ছোটমা’কে দেখেছেন তো ওই রকম ভালোমানুষ, কিন্তু রাগলে আবার ওই মানুষেরই চেহারা বদলে যায়। বললেন—ছোটবাবুর গাড়ির চাবুকটা নিয়ে দু’ ঘা মারতে পারবি রাক্ষুসীর পিঠে-পারবি বংশী—আর না পারিস তো ডাক নাথুসিংকেই ডাক—আমিই তাকে বলছি।
আমার কেমন ভয় হলো দেখে। ছোটমা বললে—পারবি না?
বললাম—জানতে পারলে ছোটবাবু আমার মাথাটা আর আস্ত রাখবে না ছোটমা।
–আমিও এ-বাড়ির ছোটবউ, যা বলছি কর গিয়ে—চাবুক মেরে পিঠের চামড়া তুলে রক্ত বের করে দিগে যা।
বললাম—মেয়েমানুষের গায়ে হাত তুলতে কেবল বাধে, নইলে…
–ওকে তুই মেয়েমানুষ বলিস, ডাইনি ও, তুই না পারিস নাথু সিংকে ডাক। ও যদি বড়বাড়ির মাটি ছুঁয়েছে তো তোদের সকলের চাকরি যাবে বলে দিচ্ছি—আর যদি যা বললুম করতে পারিস তো তোদের দু’ ভাই-বোনের জীবনে কখনও খাওয়া-পরার ভাবনা থাকবে না—এই বলে দিচ্ছি।
ছোটমা’র চিৎকারে তখন মেজমা, বড়মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
মেজমা বললে—কী হলো রে ছোট?
সব শুনে মেজমা হেসেই আকুল। বললে—তুই অবাক করলি আমাদের, পুরুষমানুষের চরিত্তির তো তসর কাপড়—ওর আবার শুদ্ধ-অশুদ্ধ কি? তোর সব তাতেই বাড়াবাড়ি—আমার রাঙামাকেও দেখেছি, আর মেজকর্তাকেও দেখেছি—ওসব মনে করতে গেলে কবে গলায় দড়ি দিতুম।
বড়মা বললে—তোর সবই আদিখ্যেতা ছোটবউ।
তা বললে বিশ্বাস করবেন না শালাবাবু, সেই রাতের বেলা গেলাম। নাথু সিং নিয়ে গেল গেটের সামনে। নতুন-মা তার নতুন কেনা মোটর গাড়িতে করে এসেছে। আমাকে দেখে ডাকলে— বংশী ছোটবাবু কেমন আছে?
বললাম—একটু ভালো।
—ওষুধ খাচ্ছেন তো?
–খাচ্ছেন।
—আমাকে ভেতরে নিয়ে চল একবার—নতুন-মা বললে।
তা তখন কী আর বলবো! মিথ্যে কথাই বললুম আজ্ঞে। বললাম—বাবু যে মানা করে দিয়েছে তোমাকে আসতে দিতে মাইরি বলছি নতুন-মা, বলেছে—তোর নতুন-মা যদি আসে তো ঢুকতে দিবি নে বাড়িতে—ওর মুখ দেখতে চাইনে।
–নতুন-মা কী যেন ভাবলে কতক্ষণ। বললে-বলেছে ওই কথা?
–আজ্ঞে, আমি কি মিথ্যে মিথ্যে বলতে গিয়েছি—আমার লাভ কি বলো?
–তবে আমার সামনে বলুক ও-কথা, নিজে আমাকে ছোটকর্তা বলুক চলে যেতে নিজের কানে না শুনে আমি যাচ্ছিনে। এপথে আমি নিজে আসিনি, ছোটকর্তাই নিয়ে এসেছে আমাকে।
-কী বিপদেই যে পড়েছিলুম শালাবাবু সেদিন কী বলবো। ছিল রূপো দাসীর মেয়ে, হয়েছে রাজরাণী, সে কেন অত সহজে হাল ছাড়বে। জানবাজারের বাড়ি, চারটে দাসী, তিনটে চাকর, মোটর গাড়ি ও হাতে যেন চাঁদ পেয়ে গিয়েছে! আর কী চাই। নষ্ট মেয়েমানুষের তো কেবল ওই দিকেই নজর। ছোটবাবুর অসুখ বলে তো ওর রাতে ঘুম হচ্ছে না একেবারে!
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—তা গেল শেষ পর্যন্ত চলে গেল চুনীবালা?
—তা কি আর আমি দেখতে গিয়েছি শালাবাবু, যাবে না তো করবে কী? আমি নাথু সিংকে গেট বন্ধ করতে বলে চলে এসেছি। তারপর আর কি হয়েছে জানি না—আমার তখন অন্য ভাবনা।
-কীসের ভাবনা?
—ভাবনা নয়? বলেন কী? ছোটবাবু যদি শোনে সব তত অনখ বাধাবে না? তখন আমার চাকরিটা ঠেকাবে কে? চিন্তার হাত ধরে আবার তো সেই দেশে গিয়ে না খেয়ে মরবে। দেশে কি জমিদারি আছে আমার যে ভাঙাবো আর খাবো। সেই যে কথায় আছে না—’তোর ভাবনা কি লো ভাবি’… আমার তো আর তা নেই শালাবাবু।
–তা বলে ছোটমা তোকে আর ছাড়বে না বংশী-এত করছিস তুই ছোটমা’র জন্যে।
বংশী বললে—কিন্তু ছোটমা’র কথা কে শুনবে শালাবাবু, ছোটকর্তাই আমল দেয় না তো শুনবে বাড়ির লোকে! এই যে এত রাতে আপনি ছোটমা’র জন্যে মদ কিনতে যাচ্ছেন-–
