চুনীবালা নিজেকে সামলে নিয়ে বললে-বংশী তোর তো বড় আস্পর্ধা দেখছি…
বৃন্দাবন এসে বংশীর হাত ধরলে এবার। বললে–চুপ কর তুই বংশী, একে সারাদিন মার খাওয়া হয়নি, তুই আর জ্বালাসনে।
বংশী কান্নার মতো হাউহাউ শব্দ করে উঠলো—খায়নি তো কার কি, বারণ করতে পারে না ছোটবাবুকে যে ও বিষগুলো খেও না?
চুনীবালা যেন স্বগতোক্তির সুরে বলে উঠলো—বিয়ে করা বউ-এর কথা যে শোনে না, সে শুনরে আমার কথা—কথা শুনলি বৃন্দাবন।
বংশী বললে—বিয়ে করা বউ-এর কথাই যদি ছোটবাবু শুনবেন তো ছোটমা’র আমার দুঃখ কিসের? এই আমার শালাবাবু সাক্ষী আছেন, ছোটমা’র কপাল যে পুড়িয়েছে তার কখখনো ভালো হবে না, কখনো ভালো হবে না—এই বলে রাখছি আমি—তারপর ভূতনাথের দিকে চেয়ে বললে—আসুন শালাবাবু, ধরুন তো একবার।
সেই ছ’ ফুট লম্বা শরীর। কাঁচা সোনার মতো গায়ের রং। সারা শরীরে আতরের ভুর ভুর গন্ধ। ভারিই কি কম। বৃন্দাবনও এসে হাত লাগালে। তারপর তিন জনে মিলে ধরে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাড়িতে তোলা! গাড়ি ছাড়বার আগে বৃন্দাবন ভূতনাথকে বললে—আপনাকে একবার নতুন-মা ডাকছে।
–কে ডাকছে?
—আমার নতুন-মা।
—কোথায়? বলে ভূতনাথ বৃন্দাবনের সঙ্গে বাড়ির ভেতরে যেতেই দেখলে দরজার একপাশে চুনীবালা দাঁড়িয়ে আছে। বললে—আমায় ডেকেছিলেন?
চুনীবালা বললে—তুমি বড়বাড়িতে নতুন ঢুকেছে বুঝি, আগে দেখিনি। তা একটা কাজ তোমায় করতে হবে।
ভূতনাথ বললে—বলুন?
–ছোটকর্তাকে তত তাড়াহুড়ো করে তোমরা নিয়ে চললে, শরীরের অবস্থা ওঁর বড় খারাপ, ডাক্তার নড়া-চড়া করতে বারণ করেছিলেন, কাল একবার খবর দিয়ে যাবে কেমন থাকেন উনি?…পারবে আসতে?…নইলে শান্তি পাবে না মনে।
ভূতনাথ কি বলবে ভেবে পেলে না।
চুনীবালা আবার বললে—আর এই ওষুধটা নাও—ডাক্তার বলেছিলেন যন্ত্রণা হলে এটা খাওয়াতে। রাত্রে যদি ব্যথা বাড়ে তো…তাহলে তুমি আসবে তত ঠিক?
পরের দিন যাবার কথাই দিয়েছিল ভূতনাথ। কিন্তু ঠিক পরের দিনই যাওয়া হয়নি।
সেদিন রাত্রে ছোটমা’র ঘরেই নিয়ে গিয়ে একেবারে তুলেছিল ছোটবাবুকে।
ছোটমা’র হাতে ওষুধের শিশিটা দিয়ে ভূতনাথ বলেছিল— ছোটবাবুর জন্যে এই ওষুধটা দিয়েছে নতুন-মা।
শিশিটা না নিয়ে বৌঠান বলেছিল—ও ওষুধ তুমি রাস্তায় ফেলে দিও ভূতনাথ—ওতে বিষ থাকতে পারে।
তারপর বৌঠানের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িবারান্দার তলায় ভূতনাথ অনেকক্ষণ বসেছিল। রাস্তায় সেদিন লোকের ভিড়। অত রাত্রেও গঙ্গাস্নান করতে চলেছে দলে দলে। মহাপ্রলয়ের আগে মানুষ পুণ্যসঞ্চয় করে মরবে। পরলোকের পাথেয়স্বরূপ। ওপরের নাচঘরে তখনও মেজবাবুর আড়া চলছে। শেষ পর্যন্ত হাসিনীর গান হয়েছে, নাচও হয়েছে। তারপর নাকি মদও চলেছে। মহাপ্রলয়ই যদি হয় তা হলে মনে কেন মিছিমিছি আপসোস থেকে যাবে।
রাত তখন এগারোটা। বংশী এল। বললে–ছোটবাবুর এতক্ষণে জ্ঞান হয়েছে শালাবাবু-শশী ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে। গেল। তারপর বললে—ছোটবাবুর জ্ঞান হতেই পালিয়ে এসেছি আজ্ঞে, যে-রাগী মানুষ, আমাকে এখন সামনে পেলে খুন করে ফেলবে হয়তো।
ভূতনাথ বললে–কেন?
—আজ্ঞে আমিই তো নতুন-মা’র বাড়ি থেকে ছোটমা’র ঘরে এনে তুলেছি। ছোটবাবু তো আমাকেই দুষবে।
তারপর ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বাজলো। পৌনে বারোটা। বারোটা বাজলো। আজ আর সারা বাড়ি নিঝুম নয়। আজ ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে। উদগ্র প্রতীক্ষায় উদগ্রীব হয়ে আছে মানুষ। এবার কী ঘটে। তারপর বাজলে সাড়ে বারোটা। একটা। দুটো। তিনটে। রাত পুইয়ে গেল নিশ্চিন্তে নির্বিবাদে।
কিছুই ঘটলো না। প্রতিদিনকার মতো পুরোনো সূর্য ইব্রাহিমের ছাদের কোণ দিয়ে উঠলো আকাশে। তারপর সেই দাসু মেথরের উঠোন ঝাঁট দেওয়া। তোষাখানায় চাকরদের হৈ-হল্লা। ভিস্তিখানায় জল তোলার শব্দ। লোচনের হুঁকো পরিষ্কার করা। নাথু সিং-এর ডন-বৈঠক। খাজাঞ্চীখানায় বিধু সরকারের বক্তৃতা। ইয়াসিন সহিসের ঘোড়া ডলাই-মলাই। রান্নাবাড়ির পাশে সদুর তরকারির ঝুড়ি নিয়ে বসা। যদুর মা’র বাটনা বাটা। ঘরে ঘরে দিনগত পাপক্ষয়। বদরিকাবাবুর টাকঘড়ি নিয়ে ঘরে ঘরে ঘড়িতে দম দিয়ে বেড়ানো। কোথাও কোনো পরিবর্তন নেই। শুধু ছোটবাবুর ল্যাণ্ডোলেটটা আর ঘোড় জোড়া আজ প্রথম বুঝি এ-বাড়িতে রাত কাটালো। ছোটবাবুর আস্তাবল বাড়িটাকে আজ আর খালি পড়ে থাকবার অগৌরব বহন করতে হয়নি। এ-ঘটনা আজই বুঝি প্রথম! রাস্তায় বেরিয়ে ভূতনাথ এই কথাগুলোই ভাবছিল।
রাত হয়ে এসেছে। এত রাতে মদ কোথায় কিনতে পাওয়া যাবে কে জানে। কোথায় দোকান তাও জানা নেই। একটি মাত্র জায়গা আছে। সেখানে গেলে এখন পাওয়া যেতে পারে। জবাদের বাড়ির ঠাকুর হয় তো এখন সেখানে রাস্তার ওপর ইট পেতে মাটির ভাঁড় নিয়ে বসেছে। আর সেই গান গাইছে ‘পোড়ারমুখী কলঙ্কিনী রাই লো’—কিন্তু এত রাত্রে অত দূরেই বা সে যায় কী করে। হঠাৎ বংশীর সঙ্গে মুখোমুখি।
বংশী বললে—এত রাতে কোথায় চলেছেন শালাবাবু?
কিন্তু বৌঠান তো বংশীকেও বলতে বারণ করে দিয়েছে। বংশীর কথার উত্তরে কী বলা যায় ভেবে পেলে না ভূতনাথ। বললে—তুই কোত্থেকে বংশী?
—চিন্তার আবার জ্বর এসেছে শালাবাবু, মাস্টারবাবু নেই, গিয়েছিলাম শশী কবিরাজের কাছে—কিন্তু আপনি চললেন কোথায় আজ্ঞে?
কেমন যেন বিব্রত বোধ করলে ভূতনাথ।
বংশী বললে—কোথায় আপনি যাচ্ছেন তা আমি জানি শালাবাবু। সন্ধ্যেবেলা থেকেই আপনাকে ডাকছে ছোটমা, আমার তো সন্দেহ হলে, বলি, ছোটবাবুর শরীরটা এখনও ভালো করে সারেনি, রাতের বেলা আজকাল বাড়িতেই থাকছেন, তবু শালাবাবুকে কেন ডাকে ছোটমা।
