মতিবাবু বললেন—আজ্ঞে আমি তো গিন্নীকে বলে এসেছি, আজ সব যেন একঘরে এসে শোয়—কিন্তু ঘুম কি আর কারো আসবে। সবাই জেগে বসে আছে।
ভৈরববাবু বললেন—কলিযুগ শেষ হয়ে গেল, একরকম বাঁচা গেল স্যার। ছোটলোকদের আস্পর্ধা দিন দিন যেমন বাড়ছিল, সত্যযুগ এলে আবার জিনিষপত্তরের দাম কমবে, জামাকাপড় সস্তা হবে, আট আনা মণ চাল কিনবে-চাই কি দামই লাগবে না।
মতিবাবু বললেন—সে গুড়ে বালি, এ রামরাজত্ব তো নয়, এবার ইংরেজের রাজত্ব। এখানে অবিচার চলবে না আর।
মেজবাবু বললেন—সেদিন বেহ্মজ্ঞানী শিবনাথ শাস্ত্রী মশাই-এর সঙ্গে দেখা হয়েছিল জানেন!
সবাই উন্মুখ হয়ে উঠলো।
মেজবাবু বললেন—জিজ্ঞেস করলাম—কী বুঝছেন? তিনি বললেন—মানুষের ডাকে যেমন দেবতার আসন টলে, তেমনি মানুষের পাপেও তাঁর আসন টলে।
—তা মিথ্যে তিনি বলেন নি স্যার, টলবেই তো, এই যে কলিযুগে প্রজারা জমিদারকে মানতে চায় না, ব্রাহ্মণকে ভক্তি করে না, এ-ও পাপ বৈকি স্যার।
মেজবাবু একটু পরে বললেন—ক’টা বাজলো দেখে তো?
—এই তো সবে সন্ধ্যে সাতটা বেজে চল্লিশ মেজবাবু বললেন—তাহলে এখন তো অনেক দেরি, তা হলে বলে বড়মাঠাকরুণের দিকে তাকালেন।
বড়মাঠাকরুণ পান সাজতে সাজতে বললেন—আজকে আর গাইতে বোলো না হাসিনীকে। কাবোর মেজাজ ভালো নেই।
মেজবাবু বললেন—গান না হয় না হলে, তুমি তবে ওইগুলো বার করো, বরফও তত এসেছে।
বড়মাঠাকরুণ তাতেও নারাজ। বললেন—তোমার মতিচ্ছন্ন হচ্ছে দিন দিন। আজকে কোথায় বসে বসে জপতপ করবার দিন।
—তবে সিদ্ধিই হোক, সিদ্ধির সরবৎ, গরমটাও পড়েছে খুব, বেশ করে পেস্তা বাদাম বেটে, একটু ল্যাভেণ্ডার দিয়ে…কী বলে। ভৈরববাবু?
ইতিমধ্যে রূপলাল ঠাকুর এসে পড়লেন। গায়ে গরদের চাদর। পায়ে খড়ম।
পাশের ঘরের ফাঁক দিয়ে সবাই দেখেছিল। ভূতনাথ, লোচন, আরো সবাই। আজকে প্রায় সকলের ছুটি। সকাল সকাল রান্নাঘরের পাট শেষ।
বংশী তাড়াতাড়ি এসে বললে—শালাবাবু, ওদিকে সব্বনাশ হয়েছে-শিগগির আসুন!
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কী হলো রে বংশী?
একরকম জোর করেই টানতে টানতে ভূতনাথকে বাইরে নিয়ে এল বংশী।
বংশী বললে—শিগগির চলুন একবার জানবাজারে—ওসব পরে দেখবেন আজ্ঞেও সমস্ত রাত ধরেই চলবে আজ।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কেন?
—আজ্ঞে, এখুনি খবর এসেছে জানবাজারের বাড়ি থেকে, ছোটবাবর অসুখ—-আমাকে ছোটমা ডেকে বলে দিলেন—তোর শালাবাবুকে নিয়ে যা।
সেই রাত্রেই বেরোলো ভূতনাথ। সঙ্গে বংশী। রাস্তায় বেরিয়ে বংশী বললে—এমনি করেই প্রাণটা খোয়াবেন ছোটবাবু, ও ছাই-ভস্ম খেয়ে-খেয়ে পেটে একেবারে ঘা হয়ে গিয়েছে, আজ থেকে তো নয়, সেই বিয়ের আগে থেকে—মানুষের শরীর কত সয়, বলুন?
জানবাজারের অন্ধকার গলিতে ছোটবাবুর ল্যাণ্ডেলেট দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়া দুটো চুপচাপ মাথা নিচু করে পা ঠকছে।
বংশী একেবারে সোজা গিয়ে কড়া নাড়তে লাগলো—বিন্দাও বিন্দা
বৃন্দাবন দরজা খুলে দিয়েছে।
বংশী বললে—ছোটবাবু আমার কেমন আছে বৃন্দাবন?
বৃন্দাবন বললে—এখনও জ্ঞান হয়নি। যা না ওপরে যা–বাবুর কাছে নতুন-মাও বসে আছে।
বংশী সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বললে—চলে আসুন শালাবাবু, ছোটমা বলছে রাত বারোটার আগে যেমন করে হোক ছোটবাবুকে বড়বাড়িতে নিয়ে যেতেই হবে—বারোটার পর কি হয় কে জানে।
ছোটবাবুর ঘরের কাছে পৌঁছতেই ভেতর থেকে কে যেন পায়ের শব্দ পেয়ে বেরিয়ে এল। ভূতনাথকে দেখে একটুখানি ঘোমটা টেনে দিলে। বললে-কে, বংশী এলি? ভালোই হয়েছে।
বংশী বললে—আমার বাবু কেমন আছে এখন নতুন-মা?
—এখনও জ্ঞান হয়নি বংশী, ডাক্তার ডেকেছিলুম, বড় ভয় করছে।
—কই দেখি—বলে বংশী ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। ভূতনাথও গেল পেছন-পেছন। চুনীবালার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। বেশ সুন্দরী দেখতে। কিন্তু যেন বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বোধ হয় অনেকক্ষণ ধরে সেবা করছে একটানা।
বৃন্দাবন এসেছিল ঘরে। বললে–মা তুমি এবার খেয়ে নাও গে–বংশী তো রয়েছে।
নিঃসাড় নিস্পন্দ হয়ে পড়ে আছে ছোটবাবু। ধপধপে ফরসা রং-এর মানুষটা। ওষুধ খেয়ে বোধ হয় বেহুশ হয়ে গিয়েছে। বংশী গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে একবার স্পর্শ করলো। মনে হলো বংশী যেন ছোটবাবুকে জাগিয়ে তুলতে চায়। সেই দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বংশীর চোখ দুটো যেন একেবারে পাথরের মতো নিষ্প্রাণ কঠিন হয়ে এসেছে। ভূতনাথের মনে হলো—বংশীর এ রূপ যেন দেখেনি কখনও আগে। এই মুহূর্তে ছোটবাবু উঠে দাঁড়িয়ে তাকে চাবুক মারলে যেন বংশী খানিকটা স্বস্তি পেতো। যেন প্রাণ ফিরে আসতে বংশীর শরীরে।
সেই রকম চেয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ একেবারে ফেটে পড়লো বংশী। বললে—ও ছাই-ভস্মগুলো তুমি কেন খাও নতুন-মা? নিজে না হয় গেলো কিন্তু আমার ছোটবাবুকে কেন গেলাও বলতে পারে?
বংশীর কথায় ভূতনাথও কেমন যেন চমকে উঠলো।
চুনীবালা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে বংশীর দিকে একবার চাইলে। মনে হলো–বংশীর এ ধরনের কথার জন্যে যেন চুনীবালা প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু কিছু উত্তর ও দিলে না।
বংশী আবার হঠাৎ বলে উঠলো—ছোটবাবু মরলে তোমরা বাঁচো, না নতুন-মা?
এতক্ষণে যেন কথা খুঁজে পেল চুনীবালা। দৃঢ়কণ্ঠে বলতে গেল—বংশী…
বংশী আবার চিৎকার করে বলে উঠলো—হাঁ, নিশ্চয় বলব, হাজার বার বলবো, তোমাকে আমি ভয় করি নাকি?
চুনীবালা চাপা গলায় বললে—চেঁচাতে হয় বাইরে গিয়ে চেঁচা।
—কেন, অত দরদ কিসের, বিষগুলো খাওয়াবার সময় মনে থাকে না। কার দৌলতে খেতে পরতে পাচ্ছো? কার দৌলতে রাজরাণী হয়েছে?
