সে অনেকদিন আগের ঘটনা। সেবার হুজুগ উঠলে চৈত্রমাসের অমাবস্যার দিন মহাপ্রলয় হবে! প্রলয় মানে এক ভীষণ কাণ্ড! কলিযুগ শেষ হয়ে যাবে। পাঁজিতে লিখেছে—অমাবস্যা তিথিতে দ্বাদশ ঘটিকা সপ্তম পল ত্রয়োদশ দণ্ড গতে ঘাতচন্দ্র দোষ।
ভৈরববাবু এসে বললেন—লোচন, দে বাবা, ভালো করে তামাক খাইয়ে দে—আর তো কটা দিন।
লোচনও কথাটা শুনেছিল। বললে-বলেন কি ভৈরববাবু কলি উল্টে যাবে?
—উল্টে যাবেই তো, কলির চারপো পূর্ণ হয়েছে যে— উল্টোবে না!
লোচন বললে—উল্টে গেলে কী হবে?
ভৈরববাবু বললেন—সত্য যুগ শুরু হবে।
লোচন বললে—আমরা দেখতে পাবো তো?
—বেঁচে যদি যাস তো দেখতে পাবি বৈকি—কিন্তু বেঁচে থাকলে, তত—কী হয় আগে দেখ?।
লোচন সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়লো। বললে—বাঁচবো না ভৈরববাবু—বলেন কি!
ভৈরববাবু ইকো টানতে টানতে বললেন-বাবুর বাঁচবে কিনা তাই আগে দেখ! বাবুরা বাঁচলে তবে তো চাকর-বাকরেরা। মনে কর, সাততলা বাড়ির মতো উচু জল দাঁড়িয়ে গেল এখানে, কলকেতা শহর হয় তত সমুদ্র হয়ে গেল—তখন কোথায় থাকবি তুই, আর কোথায় থাকবো আমি—মেজবাবু পর্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছে।
সমস্ত কলকাতার লোকগুলো ভয় পেয়ে গেল। যেখানে যায়, সেখানেই ওই আলোচনা। রাস্তার ধারে নোয়াকগুলোতে আড়া বসে। জোর আলোচনা চলে।
নিশা ছুটি নিয়ে দেশে চলে গেল। বলে—যদি বেঁচে থাকি তো আবার ফিরে আসবো শালাবাবু, মরবার আগে জমি-জিরেতের পাওনাগণ্ডা সব বুঝে নেই তোমরে গেলে কে আর দেবে।
লোচন বলে—পেট ভরে ভাত খেয়ে নে বংশী—এ জন্মে আর খেতে পাবি কি না-পাবি।
বংশীও বড় ভয় পেয়ে গিয়েছে। বলে—কী হবে শালাবাবু? বোনটার জন্যেই ভাবি, বিয়ে দিয়েছিলুম, আট কুড়ি টাকাও খরচ হয়ে গেল, সোয়ামীও বাঁচলো না ওর। এখানে যাহোক ছোটমা’র পায়ের তলায় বসে দু’মুঠো খেতে পাচ্ছিলুম—কিন্তু এখন এ কী কাণ্ড বলুন তো!
এক-এক করে দিন যায়। চৈত্র মাসের অমাবস্যা এগিয়ে আসে। একদিন ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে গিয়ে সুবিনয়বাবুর কাছে কথাটা পাড়লে ভূতনাথ। আপনি কিছু শুনেছেন স্যার?
সব শুনে সুবিনয়বাবু বললেন—শেষ দিনটার জন্য অত ভয় পাও কেন ভূতনাথবাবু, গানেরও তো সম্ আছে, ছন্দেরও তে যতি আছে, কিন্তু নদী যেখানে থামে, নদী যেখানে শেষ হয়, সেখানে একটা সমুদ্র আছে বলেই তো শেষ হয়—তাই শেষ হয়েও তার তো কোনো ক্ষতি নেই—
I have come from thee-why I know not;
But thou art, God! What thou art;
And the round of eternal being is the pulse of
thy beating heart.
জানো ভূতনাথবাবু-ফল যখন পাকে, তখন ডাল থেকে ছিঁড়ে পড়াই তার গৌরব, কিন্তু শাখা ত্যাগ করাকে যদি সে দীনতা বলে মনে করে তবে তার মতো কৃপার পাত্র আর কে আছে—কথা বলতে গেলে সুবিনয়বাবুর আর মাত্রাবোধ থাকে না।
শেষে সেই অমাবস্যা তিথি এল। সমস্ত বাড়িতেই যেন একটা উত্তেজনা। ইব্রাহিম সহিসও আজ অসুখের ভান করে কাজে আসেনি। তোষাখানা, ভিস্তিখানা, খাজাঞ্চিখানা আজ যেন থম থম করছে। রান্নাবাড়ির কাজ সকাল সকাল শেষ হয়ে গিয়েছে। ব্ৰজরাখাল তখন ছিল এখানে। কিন্তু তারও দেখা নেই।
বিকেল বেলা ভূতনাথ ব্ৰজরাখালকে বলেছিল—আজ সন্ধ্যেবেলা একটু সকাল-সকাল ফিরো ব্ৰজরাখাল।
ব্ৰজরাখাল বলেছিল—কেন?
-কী সব শুনছি হবে—পাঁজিতে লিখেছে?
-তুমিও যেমন বড়কুটুম, পাঁজির কথা বিশ্বাস করো, অত ‘দৈবের ওপর বিশ্বাস করলে কাজ চলে না, ওটা মৃত্যুর চিহ্ন কাপুরুষতা!’
—কিন্তু পাঁজি কি মিথ্যে লিখেছে? কত জ্ঞানী পণ্ডিত লোকদের লেখা সব।
ব্রজরাখাল বলেছিল—রেখে দাও পাজিওয়ালাদের জ্ঞান; জ্ঞানের পরেও আছে বিজ্ঞান, ঠাকুর বলতেন—“যে দুধের কথা একেবল কানে শুনেছে, সে অজ্ঞান, যে দুধ দেখেছে সে জ্ঞানী, আর যে দুধ খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, সে হলো বিজ্ঞানী’। যাই বলো বড়কুটুম আমার ও-পাঁজিতে বিশ্বেস নেই-জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাইরে ওরা বলে হাসতে হাসতে চলে গিয়েছিল নিজের কাজে।
ব্ৰজরাখাল বিশ্বাস করেনি, সুবিনয়বাবুও গুরুত্ব দেননি, কিন্তু মেজবাবু সেদিন বাড়ি থেকে বেরোলেন না। সকাল সকাল খানা সেরে নিলেন। নাচঘরেই সেদিন আড্ডা বসলো। ভৈরববাবু এলেন গোঁফে তা দিয়ে। বগলেশ-আঁটা জুতোজোড়া সন্তর্পণে দরজার পাশে রেখে-ফরাসের ওপর গিয়ে বসলেন। মতিবুও এলেন। ছাতাটা একপাশে রেখে কোঁচানো ওড়না আর কোঁচা সামলে বসলেন এগিয়ে। সকলেরই বাকা সিঁথি, বাবরি চুল। আর এলেন বড়মাঠাকরুণ। ভারিক্কি চেহারা। হাতে পানের ডিবে। বারো গাছা করে মোটা বেঁকি চুড়ি দু’হাতে। টাঙ্গাইলের কড়কড়ে দাঁতওয়ালা চওড়া পাড়ের শাড়ি। এসেছে তিনকড়ি। তিনকডির বয়েস কালে চেহারা ভালো ছিলো বোঝ যায়। নাকে হীরের নাকছাবি। গালভর্তি পানদোক্তা। মোটাসোটা মেয়েটি। এককালে হাসিনী আসার আগে ওই ছিল সুয়োরাণী। তারপর আসে হাসিনী। হাসিনী বয়সে কচি। গায়ের গয়না তারই বেশি। বেশি কথা বলে। ছটফটে। চুলবুল।
মেজবাবু গড়গড়ায় মুখ দিয়েই হুঙ্কার দিলেন—বেণী-বেণী
বেণী এলে মেজবাবু বললেন—রূপলাল ঠাকুরকে ডেকে নিয়ে আয় তো।
ভৈরববাবু বললেন—আজ্ঞে পাজি আমি নিজে দেখেছি—রাত বারোটা বেজে সাত পল ত্রয়োদশ দণ্ডে ঘাতচন্দ্রদোষ।
মেজবাবু বললেন—না, না, রূপলাল আসুক না, যদি মহাপ্রলয় হয়ই তো ঠাকুর মশাই বা কেন বাদ যাবেন—সকলের একযাত্রা হওয়াই তো ভালো।
