সেই অন্ধকারাবৃত আবহাওয়ায় বংশীর পেছনে চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেল ভূতনাথ। কেন সে পাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে। কার কাছে যাচ্ছে। এ কি তার কলকাতা দেখতে আসা। জীবনে সে প্রতিষ্ঠা করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে—তবে আজ কেন এই অভিসার! রোজ রোজ ঘরের অন্ধকার সুড়ঙ্গ পথে কেন এই তিমিরাভিসার! যে-পথ দিয়ে স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস, ভূমিপতি চৌধুরী সবাই একদিন গিয়েছে, আজ ভূতনাথও আবার সেই পথ দিয়ে বুঝি যাত্রা করছে-তার এই অবৈধ নৈশ যাত্রা!
বংশী পেছন ফিরে আর একবার ডাকলে কই, আসুন শালাবাবু।
হঠাৎ কী যেন হলো। মনে পড়লো ছোটবৌঠানের যশোদাদুলালকে! মনে পড়লো ফতেপুরের বারোয়ারিতলার মা মঙ্গলচণ্ডীকে। আর মনে পড়লো—নরহরি মহাপাত্রের সর্বসিদ্ধিদাতা বিনায়ককে। ভূতনাথ বললে-চল—যাই।
দরজাটা খুলেই সামনে ছোটবৌঠানের ঘর। একেবারে মুখোমুখি।
আগে থেকেই বুঝি বন্দোবস্ত ঠিক ছিল সব। বংশী দরজার সামনে যেতেই ছোটবৌঠান বেরিয়ে এল। ঘরের আলো পড়ে ছোটবৌঠানের কানের হীরেটা চক চক করে উঠলো। ভূতনাথকে তখনও বুঝি ভালো করে দেখতে পায়নি ছোটবৌঠান। বললে— কই রে বংশীভূতনাথ কই?
ভূতনাথ সামনে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো। বললে—বৌঠান এই যে আমি!
—ও, এসেছে—এসো-মাথা থেকে নিঃশব্দে ঘোমটাটা খসে গেল বৌঠানের। এতক্ষণে ভালো করে যেন দেখতে পেল মুখটা। সেই ছোটবৌঠান। ভূতনাথের যেন চোখ নামতে চায় না। ছোটবৌঠানের নজরে পড়লো। একটু হেসে বললে–এসো, ঘরের ভেতরে এসো।
তবু ভূতনাথের যেন দ্বিধা হলো। বললে–ছোটবাবু কোথায়?
—আছেন, কিন্তু সেজন্যে তোমার কিছু ভয় নেই—তুমি এসো। ঘরে যেতেই ছোটবৌঠান বললে—কেমন আছো ভূতনাথ?
ভূতনাথ চারদিকে চেয়ে দেখলে একবার। সব ঠিক তেমনি আছে। আলমারির পুতুলগুলো ঠিক তেমনি করে তার দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। সোনার বাঁশি হাতে করে ছোটবৌঠানের যশোদাদুলাল তেমনি অচল অটল দাঁড়িয়ে। ছোটবৌঠানের দিকে চাইতেই ভূতনাথ কেমন যেন অবাক হয়ে গেল। মনে হলো, একটু আগেই যেন ছোটবৌঠান খুব কেঁদে ভাসিয়েছে। কিন্তু ভূতনাথের চোখে চোখ পড়তেই ছোটবৌঠানের ঠোটে হাসি ফুটে উঠলো। বললে—কী দেখছো ভাই অমন করে?
ভূতনাথ বললেন, আমি আপনাকে বলতে এসেছিলাম একটা কথা।
—কী কথা-বলল না শুনি?
—ও সিঁদুর আর আপনি পরবেন না—ওই ‘মোহিনী-সিঁদুর।
-কেন, সিঁদুরে আবার কী দোষ করলো ভাই—জবার সঙ্গে বুঝি ঝগড়া হয়েছে?
—না, ঠাট্টা নয়, সুবিনয়বাবু নিজে বলছেন, ওসব বুজরুকী।
—তা হোক, কিন্তু আমার কাজ হয়েছে ভাই!
—সে কি!
-হ্যাঁ, ‘মোহিনী-সি’ দুরে’র ফল ফলেছে আমার, অনেক ওষুধবিষুধ আগে খেয়েছি, মাদুলি-তাগা, কিছুই বাদ রাখিনি, পূজোমানত সব করে দেখেছি, কিছুতে কিছু হয়নি আগে—কিন্তু ‘মোহিনী-সিঁদুরে’ কাজ হয়েছে।
—সে কি বৌঠান, সুবিনয়বাবু নিজেই বললেন যে ও বুজরুকীর ব্যবসা তুলে দেবেন।
—তা হোক।
—কী করে হলো?
—সব কথা তো তোমাকে বলা যায় না, তুমি শুনতেও চেও না কিছু—কিন্তু..
—কিন্তু কী বৌঠান?
ছোটবৌঠান যেন একটু দ্বিধা করলো। তারপর বললেছোটকর্তা কথা দিয়েছেন আমাকে, জানবাজারের বাড়িতে আর যাবেন না। বরাবর রাত্রে বাড়িতেই থাকবেন, যদি আমি…
–যদি আপনি…?
–এখন এর বেশি আর শুনতে চেও না—এর বেশি আমি বলবোও না।
ছোটবৌঠান যেন নিজেকে সামলে নিলে।
তারপর বংশীকে ডেকে ছোটবৌঠান বললে—বংশী তুই এখন যা—পরে ডেকে পাঠাবে।
বংশী চলে যাবার পর ছোটবৌঠান গলা নিচু করে বললে— কিন্তু ভূতনাথ, তোমাকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবেআজকেই।
ভূতনাথের উৎসুক দৃষ্টির সামনে চোখ রেখে পটেশ্বরী বৌঠান বললে-করবে? পারবে?
–পারবো। কী?
–কেউ যেন জানতে না পারে-বংশীও নয়।
–কেউ জানবে না বৌঠান।
—আমাকে মদ কিনে এনে দিতে হবে।
—মদ?
—হ্যাঁ, মদের অভাব নেই এ-বাড়িতে তা সবাই জানে। এ-বাড়িতে ছেলে বুড়ো সবাই খায়, কিন্তু তবু দরকার, খুব ভালো মদই নিয়ে এসে, বেশি নয়, সামান্য হলেই চলবে’খন, কিন্তু আজ রাত্রেই—আমি টাকা দিচ্ছি। তারপর দাঁড়িয়ে উঠে চাবি নিয়ে সিন্দুক খুলে টাকা বার করে দিলে—বললে—এই জন্যেই তোমায় ডেকেছিলাম।
ভূতনাথ উঠলো। পটেশ্বরী বৌঠান বললে—হ্যাঁ ভাই যাও তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। রাস্তা তো চিনে নিলে—ওইখান দিয়ে আসবে, কেউ জানবে না।
হতবুদ্ধির মতো ভূতনাথ বেরিয়ে এল বাইরে। কোথাও কিছু নেই, কিন্তু এমন যে হবে ভাবতে পারেনি ভূতনাথ। বড়বাড়ির রহস্যই বুঝি আলাদা। অন্য কোনো নিয়মে বুঝি একে বাঁধা যায় না। ইতিহাসের পাতায় এর মানুষগুলো বড় বেশি নড়ে চড়ে, কথাও বুঝি বেশি বলে—কিন্তু কিছুতেই বুঝতে দেয় না নিজেদের। ভূতনাথের মনে হলো পটেশ্বরী বৌঠান যেন সত্যিই ইস্কাপনের বিবির মতন—হাতে যদিই বা আসে সে শুধু হাতের বাইরে চলে যাবার জন্যে!
ভূতনাথ সন্ধ্যের অন্ধকারেই গেট পেরিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো।
২১. আজ এতদিন পরে ভাবতে যেন কেমন লাগে
আজ এতদিন পরে ভাবতে যেন কেমন লাগে। সে-মানুষগুলো, সে-দিনগুলো কোথায় গেল। সেই লঘুপক্ষ দিন আর রাত গুলো। উঠে বসে ধীরে সুস্থে চলা, ভাবা আর বাঁচা! দিন যেন আর ফুরোয় না, রাত যেন আর কাটে না। সূর্য উঠতে যেন বড় আস্তে আস্তে! ড়ুবতে যেন বড় দেরি করে। গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে সময়ের চাকা! হচ্ছে, হবে। অত তাড়া কিসের। তামাক খাও। আর একটু জিরোও। সমস্ত দিন তো পড়ে রয়েছে। কত কাজ করবে করো না!
