তা ননীলালকে চিনতে আমার আর বাকি নেই ভূতনাথবাবু। আর শুধু কি আমাকে! আমার মতন আরো কত বড়লোক আছে কলকাতায়। সারা কলকাতার লোকের কাছ থেকে ধার করেছে। ঠনঠনের ছেনি দত্তর ছেলে নটে দত্তর কাছ থেকেও নিয়েছে। একটু বড়লোক দেখলেই তার কাছ থেকে টাকা ধার করেছে। শোধ কাউকেই দেয়নি। শুধু কি একবার। বারবার আমার কাছে একটা-না-একটা ছুঁতে করে ধার চেয়েছে। ওর ওই একটা গুণ। ও চাইলে কেউ না বলতে পারে না। খানিক থেমে ছুটুকবাবু বললে—একটু চলবে নাকি আজ? একটুখানি?
ভূতনাথ ছুটুকবাবুর হাত দুটো চেপে ধরে বললে–মাপ করবেন ছুটুকবাবু। সেদিন তো খেয়েছিলাম—আজকে আর নয়…
ছুটুকবাবু বললে—তবে বলছেন যখন থাক, কিন্তু আমি একটু খেয়ে আসি-বলে পর্দার ভেতরে গিয়ে আবার মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। এসে বললে— সেই কথাই কাল থেকে ভাবছি, ননীটা বাহাদুর ছেলে বটে—কত ঘাটের যে জল খেয়েছে আর কত ঘাট যে পার হয়েছে তার শেষ নেই। অথচ একজামিনেও পাশ করলে, আর নেশা ধরে গেল আমাদেরই…
হঠাৎ সুযোগ বুঝে ভূতনাথ বললে—আপনার সেই শশী কোথায় গেল—শশীকে দেখছিনে।
–না ভাই, ও-সব চাকর আর রাখবো না ঠিক করেছি, পারা ঘা হয়েছিল সারা গায়ে।
–বংশীর একটা ভাই আছে, বংশী বলছিল ওর ভাইটাকে যদি…
কথাটা শুনে ছুটুকবাবু যেন চটে গেল। বললে—না ভাই ও-সব এক ঝাড়ের বাঁশ, ওদের কাউকেই আর বিশ্বাস নেই, বেটারা সবাই পাজিও সবাই যেন মালকোষের ধৈবত—যেখানেই থাকুক ঘুরে ফিরে ঠিক সেই ধৈবতে এসে দাঁড়াবে…তা এবার ভাবছি পরীক্ষাটা আবার দেবো—একটা মাস্টার ঠিক করেছি। হপ্তায় চারদিন লেখাপড়া আর তিনদিন গান-বাজনা আর এই নেশাভাঙটাও ছাড়তে হবে—বলে আবার উঠলে ছুটুকবাবু। উঠে পর্দার আড়াল থেকে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। বলে— আপনি বেশ ভালো আছেন স্যার—কোনো নেশাটেশার মধ্যে নেই–এ একবার ধরলে ছাড়ায় কোন শালা।
হঠাৎ বাইরে যেন কার ছায়া পড়লো।
ছুটুকবাবু চিৎকার করে উঠলো—কে রে, কে ওখানে? কে?
-আমি বংশী আজ্ঞে।
—তা বাইরে কেন? ভেতরে আয়-কী দরকার?
বংশী বললে—আমি শালাবাবুকে একবার ডাকছিলাম।
–ও–বলে ভূতনাথ উঠে বাইরে এল।
ভূতনাথ বাইরে আসতেই বংশী গলা নিচু করে বললে—কই, ছোটমা’র কাছে যাবেন বলেছিলেন—যাবেন না?
ভূতনাথ বললে–ছোটবাবু আছেন, না চলে গিয়েছেন?
বংশী বললে–ছোটবাবুর তো অসুখ খুব—পেটে যন্তরণা হচ্ছে কতদিন থেকে বাড়িতেই থাকেন।
-তাহলে?
–আমি ছোটমা’কে বাইরে ডেকে আনবো’খন, আপনি কথা বলবেন—তাতে কি—ছোটমাও যে আপনার কথা বলছিলেন আজ্ঞে।
—তবে চল। ছুটুকবাবুর ঘরে ঢুকে ভূতনাথ বললে—তাহলে আজ আসি ছুটুকবাবু, আর একদিন আসবো। বাইরে বেরিয়ে ভূতনাথ বললে—কোন্ দিক দিয়ে যাবি বংশী?
বংশী বললে—কেন আপনার সেই চোরকুইরির সরু বারান্দা দিয়ে?
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। ইটবাঁধানো উঠোনের ওপর তখন ইব্রাহিমের ছাদের আলোটা থেকে একফালি আলো এসে পড়েছে। ওদিকে খাজাঞ্চীখানার দরজায় তালা পড়ে গিয়েছে। দক্ষিণের বাগানের কোণ থেকে দাসু মেথরের ছেলেটা বাঁশীতে বিমঙ্গলের সুর ভাঁজছে—“ওঠা নাবা প্রেমের তুফানে’— আস্তাবলের ভেতর ছোটবাবুর শাদা ওয়েলার জোড়া অন্ধকারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঠকাঠক পা ঠুকে চলেছে। আস্তাবলের ওপর দোতলায় ব্ৰজরাখালের ঘরটা তেমনি অন্ধকার। তার পাশে ব্রিজ সিং-এর ঘরে টিম টিম আলো জ্বলছে। বোধ হয়, আটা মাখছে এখন। থপ থপ শব্দ আসছে সে-ঘর থেকে। তার পেছনে তোষাখানায় চাকরদের ঘরে এখন তাস-পাশা চলছে। সন্ধ্যেবেলা কাজ কম। বাবুরা বেরিয়ে গিয়েছেন বেড়াতে।
ভূতনাথ আস্তাবল বাড়ির পাশ দিয়ে একেবারে বাগানের কাছে এল। বংশী আগে আগে চলেছে। মনে হলো—প্রথমে গিয়ে কী কথা বলবে। বহুদিন থেকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিলো ছোটবৌঠানকে। গিয়ে বলতে হবে–“মোহিনী-সিঁদুর আগাগোড়া সব মিথ্যে কথা! সব বুজরুকী! ছোটবৌঠান যেন ‘মোহিনী-সিঁদুর’ না পরে। আগে যদি জানতো ভূতনাথ ‘মোহিনী-সিঁদুর’ দিতে কখনও।
বংশী এবার ডাকলে—চলে আসুন শালাবাবু।
-এ আবার কোন্ রাস্তা বংশী?
চোরকুঠুরির ঠিক সামনাসামনি একটা দরজা। এতদিন নজরে পড়েনি তো! সেই ইটালিয়ান সাহেবের মেমসাহেব! এখান দিয়ে এই গুপ্ত পথে বুঝি অভিসারের আয়োজন হতো। ভূমিপতি চৌধুরী বুঝি এই দরজা খুলে দিতেন মধ্যরাত্রে। নিমক মহলের বেনিয়ানের হৃদয় নিয়ে লেনদেন চলতে বুঝি এইখানে। এই লোকচক্ষুর অন্তরালে!!
বংশী বললে—এই রাস্তা দিয়েই ছোটমা আনতে বলছেন আপনাকে আজ্ঞে।
অতি নিঃশব্দে দরজা খুলে গেল। ভূতনাথের মনে হলোভূমিপতি চৌধুরীর পর এ-দরজা এই প্রথমবার বুঝি আবার খোলা হলে এতদিন পরে। নিঃশব্দে সে বুঝি পেরিয়ে চলে এসেছে সপ্তদশ শতাব্দীর একেবারে শেষ পর্যায়ে। সেদিনটা এই বারান্দার মতোই বুঝি অন্ধকারাচ্ছন্ন। কলিকাতা শহর তখন সবে গড়ে উঠছে।’ সূতানুটীতে তখন কেবল হোগর জঙ্গল। সেই হোগর জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে আর্মেনিয়ানরা মেয়েমানুষের ব্যবসা করে আর ডাকাতরা টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে পথিকদের খুন করে ফেলে দেয় গঙ্গার জলে। মানুষ বলি দেয় কালীঘাটের কালীর সামনে। তারপর জব চার্নকের আমল থেকে শুরু হয়ে শহর যখন ওয়ারেন হেস্টিংস-এর আমলে এসে প্রথম এক মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়ালো, তখন এল স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস আর এক মাদাম গ্র্যাণ্ড! পৃথিবীর সেরা প্রেমের কাহিনী। সেদিন সেই রাত্রে যখন মাদাম গ্র্যাণ্ডের শোবার ঘরে প্রথম ধরা পড়লে ফ্রান্সিস সাহেব তখন ভূমিপতি চৌধুরীরও জন্ম হয়নি। কিন্তু মাদাম গ্র্যাণ্ড বুঝি বার-বার বিভিন্ন রূপ নিয়ে জন্মেছে সংসারে। কখনও ফ্রান্সিস সাহেবকে, কখনও ভূমিপতি চৌধুরীকে, আবার কখনও জবার রূপ নিয়ে ছলনা করেছে পুরুষ জাতকে। এই অসময়ে ছোটবৌঠানের আকর্ষণের পেছনেও যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির যোগাযোগ রয়েছে। রয়েছে এক মহা-অপরাধের পূর্বাভাষ। নইলে এত আকর্যণ কেন? ব্রজরাখাল তো বারবার বলেছিল–কাজটা ভালো করোনি বডোকুটুম—ওরা হলো সাহেব-বিবির জাত—আর আমরা হলাম গিয়ে গোলাম—ওদের সঙ্গে অত দহরম-মহরম ভালো নয়।
