ননী গিয়ে মেয়েটার কানে কানে চুপি চুপি কী বললো কে জানে! মেয়েটা আমার দিকে দু হাত তুলে সেলাম করে বললে— আপনার বহুত, মেহেরবানি—কী গান গাইবো ফরমাশ করুন?
তা বুঝলেন, তখন আমার বুক কাপছে, বয়েসও কম, গোঁফও ওঠেনি বলতে গেলে, তা ছাড়া ওসব জায়গায় কখনও যাই নি আগে, আমি কিছু কথাই বলতে পারলুম না। গান-বাজনা শোনা অবশ্য অভ্যেস ছিল আমার, বাড়িতে এসে কত বাঈজী গান গেয়ে গিয়েছে, নজরানা নিয়ে গিয়েছে, নাচ দেখেছি, সে-সব অন্য রকম। নাচঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি আমরা, বাড়ির চাকর-বাকর সবার কাছে কত কিছু শুনেছি, কাকামশাইরা বাঈজীদের সঙ্গে সারারাত ধরে ফুর্তি করেছে। খাওয়া দাওয়া হয়েছে, নেশা-টেশাও চলেছে, তোষাখানায় যখন গিয়েছি চাকরদের মুখে বাবুদের কীর্তিকলাপ শুনেছি। বড় ছোট মাঝারি নানান মাপের রঙ বেরঙের বোতলের চেহারা দেখেছি, কিন্তু আমরা মানুষ হয়েছি ও-সব আওতার বাইরে। ওসব চলতো আমাদের চোখের আড়ালে। কিছু আমাদের জানতে পারবার কথা নয়! মা’র কাছে গিয়ে বাবামশাই-এর অন্য চেহারা দেখতুম! বড় ভয় করতাম কিনা কর্তাদের—কিন্তু এমন করে বাঈজীর মুখখামুখি হই নি কখনো। ননী মেয়েটাকে বললে—কিছু খাওয়াও ভাই আমাদের—আমার বন্ধু আজ এই প্রথম এল এ-সব জায়গায়।
আমার দিকে চেয়ে বললে—কী রে চূড়ো—খিদে পেয়েছে— কী খাবি বল? তোর তো আজ বিকেলের বরাদ্দ দুধ খাওয়া হয়নি।
আমার তখন ভাই ঘাম ঝরছে—খাবো কি মাইরি, খেতেই ইচ্ছে করছে না। ননী জানতে বিকেলবেলা এক গেলাশ দুধ আর ফল খাওয়া অভ্যেস আমার। কতদিন কলেজের পরে আমাদের বাড়িতে এসে আমার সঙ্গে ও ফলটল খেয়ে গিয়েছে। কিন্তু তখন কে আমার কথা শোনে ভাই! মেয়েটা কাকে যেন কী বললে। আর খানিক পরেই এল সব খাবার। ফলও এল, মিষ্টিও এল। আর আমার জন্যে দুধও এল। মেয়েটা আমাকে বললে—আপনার বড় লজ্জা বুঝি।
কিন্তু ননীটা কী বদমাইশ জানেন! মেয়েটাকে বললে—তুমি তো লজ্জাহারিণী ভাই—ওর লজ্জা আজ ভাঙতে পারবে না?
মেয়েটা জিব কেটে বললে—তেমন অহঙ্কার আমার নেই ননীবাবু, আপনাদের মতন ভদ্রলোকের পায়ের ধুলো পড়ে আমার কুঁড়ে ঘরে, তাইতেই আমি ধন্য।
ননী বললে—বাজে কথা থাক, খাবার দিলে, আর মুখশুদ্ধি দিলে না, এ কী রকম! তেষ্টা পাচ্ছে যে।
মেয়েটা ঝলমল করে উঠে পড়লো। বললে—ছি ছি আগে বলতে হয়।
বেনারসী ওড়নার ঘোমটা সরিয়ে খস্ খস্ শব্দ করতে করতে গিয়ে এবার দাঁড়িয়ে দেরাজ খুলে পেছন ফিরে তাকালে আমার দিকে। বললে—কড়া জিনিষ চলবে আপনার?
তখন কড়া মিঠে কিছুই জানিনে। কখনও খাইনি ওসব। কিন্তু খেলাম। কড়া খেলাম কি মিঠে খেলাম জানি না ভাই কিন্তু খেলাম! সেদিন কী আদর আমার! আমাকে তোয়াজ করাই একমাত্র কাজ হলো বাড়িসুদ্ধ লোকের।
তারপর গান চলতে লাগলো। মতিয়ার মুখেই ওই গানটা প্রথম শুনি। এখনও মনে আছে সেটা—’জখমী দিলকো না মেরে দুখায়া করো’–
একে গজল তায় মতিয়ার গলা, সঙ্গে সারেঙ্গী আর পেশাদারী হাতের সঙ্গত্। তার ওপর আবার একটু অমৃত পেটে গিয়েছে। কখন যে কোথা দিয়ে সময় চলেছে টের পাবার কথা নয়। তখন বাড়ির কথাও আর মনে নেই, কারোর কথাই মনে নেই। তখন মতিয়াকে নাকি আমি কেবল বলেছি নেশার ঘোরে-তোমায় বিয়ে করবো আমি—তোমায় ছাড়বো না আমি।
ভোর বেলা যখন ঘুম ভেঙেছে নেশা কেটেছে তখন ননী এল।
এসেই গালাগালি। বললে—ছি ছি চূড়া তোর একটা জ্ঞানগম্যি নেই, সারা রাত বাঈজীর বাড়ি কাটালি এত বড় বংশের ছেলে হয়ে।
আমি তো অবাক। বলে কী। আমাকে ওই-ই নিয়ে এল আর এখন কিনা আমাকেই গালাগালি!
আড়ালে নিয়ে এসে চুপি চুপি বললে—আমরা ভদ্দরলোকের ছেলে—একটু ফুর্তিটুতি করে চলে যাবো নিজের বাড়ি, তা না রাত কাটাবো এখানে? কত বললুম—চল চূড়ো চল, চল—তুই কিছুতেই শুনলি না। ছি ছি—এখানে কি রাত কাটাতে আছে?
তখন আমরে। তাই মনে হচ্ছিলো মাইরি। এ কী করলুম! আমি তো ভদ্রলোক! আমি বড়বাড়ির ছেলে—আমি নিমক মহলের বেনিয়ান ভূমিপতি চৌধুরীর প্রপৌত্র। সূর্যমণি চৌধুরীর নাতি, বৈদূর্যমণি চৌধুরীর ছেলে—আমার এ কী পরিণাম। বললাম
—চল বাড়ি চল।
ননীলাল বললে—সে কি? বাড়ি যাবি কী রে?
আবার কী দোষ হলে বুঝতে পারলাম না! বললাম—কেন?
—ওকে কিছু দে-মতিয়ার তত এটা ব্যবসা–ও এত কষ্ট করলো-সারা রাত জাগলো।
তাও তো বটে! কিন্তু সঙ্গে তো কিছু আনিনি।
ননী বললে—বাড়ি থেকে আনিয়ে দে—কিছু না দিলে খারাপ দেখাবে যে—তোদের বংশের মুখে চুনকালি পড়বে যে।
বললাম—কত দিতে হবে??
–তোর যা খুশি, মতিয়া কিছু চাইবে না, ও তেমন মেয়ে নয়, তা হলে আর তোকে এখানে আনতুম না, অন্য মেয়ে হলে অবশ্যি হাজার টাকা চেয়ে বসতো, তা ছাড়া তুই তো কিছু বলিসনি, আমিই এনেছি তোকে দায়িত্বটা তো আমারই। তবে ওর তো এটা ব্যবসা, ওরই বা চলে কিসে—আর তোদর বংশের নামডাক আছে—দেখিস যেন বদনাম না হয়।
—কত দেবো তুই বল।
ননী গলা নিচু করে বললে—নবাবী করে যেন আবার বেশি দিতে যাসনি তুই। আসলে তো ওরা বাঈজী—পাঁচ শ’ টাকা দিয়ে নমো নমো করে সেরে দে এ-যাত্রা।
তা এই হলো ননীলাল! আপনি ভেবেছেন ননী সেই পাঁচ শ’ টাকার সবটা দিয়েছে মতিয়াকে? নিশ্চয়ই অর্ধেক নিজে মেরে দিয়েছে। তারপর যখন আবার পরে একদিন মতিয়ার কাছে গেলুম-জিজ্ঞেস করলুম।
মতিয়া বললে সে কি, আমাকে একটা পয়সাও তো দেয়নি সেদিন?
