আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না ভূতনাথ। ঘর থেকে বেরিয়ে এল হঠাৎ। ও-কথার তো আর শেষ নেই। সব কথার মানেও বোঝা যায় না বদরিকাবাবুর। সেদিন সুবিনয়বাবুও বললেন, ‘মোহিনী-সিঁদুর’ বুজরুকি। এই এত ঐশ্বর্য, গাড়ি, বাড়ি, লোকজন, চাকর-বাকর সব উচ্ছন্নে যাবে! কী অদ্ভুত যুক্তি, কী অদ্ভুত হেঁয়ালী!
সন্ধ্যেবেলা ছুটুকবাবুর ঘরে গিয়ে ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে আজ এখনও কেউ আসেনি?
ছুটুকবাবু আসর সাজিয়ে বসেছিলো। বললে—এই আপনার কথাই ভাবছিলাম, কোথায় ছিলেন এ্যাদ্দিন, ননীলাল খুঁজছিল?
-ননীলাল? গঞ্জের ডাক্তারবাবুর ছেলে সেই ননীলাল? নামটার সঙ্গে যেন অনেক রোমাঞ্চ, অনেক স্মৃতি জড়ানো আছে। অনেক সমারোহ, অনেক সৌরভ। ননীলালের নামটা মনে পড়লেই যেন সমস্ত ছেলে-বেলাটা আবার সজীব হয়ে ওঠে। তার সেই চিঠি। সেই চিঠিটা আজো সযত্নে টিনের বাক্সের মধ্যে যে রেখে দিয়েছে সে। ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—আমার খোঁজ করছিল কেন?
—ওর বিয়ে হলো কি না? আপনাকে নেমন্তন্ন করতে চেয়েছিল।
—বিয়ে? হয়ে গিয়েছে?
ছুটুকবাবু বললে–হ্যাঁ, হয়ে গেল বিয়েটা। ননীটা যা হোক খুব দাও মেরেছে বিয়েতে। তিনখানা বাড়ি-সাত লক্ষ টাকা।
সেকি? ভূতনাথও কেমন যেন অবাক হয়ে গেল। এই সেদিন যে সে টাকা ধার করতে এসেছিল ছুটুকবাবুর কাছে। এরই মধ্যে এত টাকার মালিক হয়ে গেল সে!
ছুটুকবাবু আবার বললে—এ যাত্রায় খুব বেঁচে গেল ননীটা, বরাবর জানতুম ও একটা সোজা ছেলে নয়। আমাদের টাকায় বরাবর বাবুয়ানি করে আমাদের ওপরই টেক্কা মেরেছে—তা বাহাদুরি আছে ননীর, কোত্থেকে কার সঙ্গে ভাব জমিয়ে শেষ পর্যন্ত কী যে করে বসলো—
—কী করে কী হলো ছুটুকবাবু?
ননীলাল অবশ্য তার কল্পনায় চিরকালই উচু ছিল। ছোটবেলা থেকে ননীই ছিল ভূতনাথের আদর্শ। অমন চমৎকার সুন্দর চেহারা। রূপবানই বলা যায়। কিন্তু মাঝখানে যেদিন দেখা হয় ওর সঙ্গে, সেইদিনই কেমন আঘাত পেয়েছিল ভূতনাথ মনে মনে। তার সেই আগেকার চেহারা যেন আর নেই। সেই লাবণ্য মুছে গিয়েছে মুখ থেকে। তার সেই ঘন ঘন সিগারেট খাওয়া। সেই কোঠরগত চোখ। আর সেই অশ্লীল প্রসঙ্গ আলোচনা। যে-মানুষ এত নিচে নামতে পারে, চরিত্রহীনতার একেবারে শেষ ধাপে, সে কেমন করে জীবনে আবার প্রতিষ্ঠিত হবে! কেমন করে সে সাত লক্ষ টাকার মালিক হবে—তিনখানা বাড়ির স্বত্ত্বাধিকারী হবে।
ছুটুকবাবু বলতে লাগলো–হেন রোগ নেই, যা ওর হয়নি ভূতনাথবাবু, আমরা কত বারণ করেছি এ-পথে আর যাসনি—কিন্তু ননী বলতো’ও-সব তোদের কুসংস্কার,—এটা আর কুলমর্যাদার যুগ নয় রে—এটা টাকার যুগ’ বলতো’টাকা স্বর্গ, টাকা ধর্ম, টাকা বংশ, টাকা গোত্র—টাকাই জপ-তপ-ধ্যান—সবার চাইতে বড় কুলীন টাকা, শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ টাকা’ বলতাম—তোর স্বাস্থ্য গেলে টাকা কে খাবে?
ননী বলতো—টাকা না থাকলে এ স্বাস্থ্য নিয়ে কী হবে? কখনও বলতো—এ যুগের খৃস্ট, বুদ্ধ আর চৈতন্যদেব কে জানিস? আমরা প্রশ্ন শুনে হতবুদ্ধি হয়ে যেতাম–খৃস্ট, বুদ্ধ আর চৈতন্যদেব—ওরা আবার যুগে যুগে বদলায় নাকি?
ননীলাল বলতে-বলতে পারলিনে? এ যুগের অবতার হলেন শেঠ-শীল আর মল্লিক।
ছুটুকবাবু কথা বলতে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়লো। হাসির চোটে ভুঁড়ির মাংস থল থল করে নেচে ওঠে। যেন একটা কৌতুক করবার দারুণ বিষয় পাওয়া গিয়েছে।
আমাদের কলেজের ভেতর ঢুকতে মস্ত বড় সদর-দরজার ওপর লেখা ছিল—“God is Good”। একদিন কলেজে মহা সোর গোল বেধে গেল। হৈ-চৈ কাণ্ড। কী সর্বনাশ ব্যাপার! দেখা গেল কে যেন বড় বড় হরফে সেখানে লিখে রেখেছে—“God is Money”। আমরা তো অবাক সবাই। সেকালে রসিকলাল মল্লিক আদালতে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যখন বলেছিল-“I do not believe in the holiness of the Ganges’ তখনও হিন্দুসমাজ এত চমকায়নি—ত সেই ননীলাল শেষ পর্যন্ত…
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে–বউ কেমন হয়েছে?
-বউটাও রূপসী ভূতনাথবাবু, তাই তো বলছি— ওর কপালটা ভালো, কাল নেমন্তন্ন খেয়ে এসে পর্যন্ত ওই কথাই তো ভাবছি। শালাটা করলে কী? আজ এসেছিল সবাই গান-বাজনা করতে মন বসলো না। পাঁচ শ’ টাকা ধার নিয়ে গিয়েছে ননী এই সেদিন–এখনো শোধ করেনি। তার কাছে পাঁচ শ’ টাকা চাইতেই এখন লজ্জা করবে আমার। পাঁচ শ টাকার জন্যে নয়, পাঁচ হাজার টাকা গেলেও কিছু ভাবতম না। ননী আমার কাছ থেকে অমন অনেক টাকা নিয়েছে—হিসেব রাখিনি কখনও-কিন্তু এমনভাবে ননী আমাকে টেক্কা দিয়ে যাবে ভাবিনি তা কখনও।
ছুটুকবাবু যেন কেমন মুষড়ে পড়েছে। বলতে লাগলো— এই যে সব নেশা-টেশা দেখছেন এ-সব ও-ই আমাকে প্রথম শেখায়, এই যে গান-বাজনার সখ—এ-ও ওরই কাছ থেকে প্রথম শিখি—তখন কলেজে সবে ঢুকেছি। চাকরের সঙ্গে গাড়িতে যাই আর গাড়ি করে ফিরে আসি। একদিন হঠাৎ দুপুরবেলা কলেজ ছুটি হয়ে গেল—দুজনে একসঙ্গে বেরোলাম রাস্তায়। কোন রাস্তা দিয়ে ঢুকে কোন রাস্তায় বেরিয়ে শেষে এক গলির মধ্যে নিয়ে গেল ননী, সেখানে একটা বাড়িতে গান-বাজনা হচ্ছিলো। আমাকে বললে—পেছন পেছন চলে আয় চূড়োবলে নিজেই আগে ঢুকে পড়লো।
আমিও গেলাম। গিয়ে দেখি দোতলার ওপর গানের আসর বসেছে গান গাইছে একটা মেয়ে, নাকে একটা প্রকাণ্ড নথ।
ননী একপাশে তাকিয়া হেলান দিয়ে বসে পড়লো। আমাকেও টেনে পাশে বসালো।
গান থামলো। সারেঙ্গী বাজাচ্ছিলো যে সে-ও থামলো। তবলচিও থামলো।
