—কেয়া হুয়া, কেয়া হুয়া? গন্ধবাবার সামনে এসে বললেন–কেয়া হুয়া? কোন্ হ্যায় তুম্?
বংশী বললে—উনি গন্ধবাবা।
আরো অনেকে বললে—যা গন্ধ চান, উনি করে দেবেন আজ্ঞে।
সব শুনলেন বদরিকাবাবু। বললেন—দাও দিকি আমার হাতে গন্ধ করে—ফুলের গন্ধ করে দাও–নিমফুলের গন্ধ।
নিমফুল! তাই সই।
গন্ধবাবা স্ফটিক পাথরটি একবার হাতে ঘষে দিলে বদরিকাবাবুর। তারপর আওড়াতে লাগলো-বেহেস্তকা হুরী ওউর জাহান্নমকা কুত্তি ইসে সব ঘায়েল হেতি হ্যায়…কেয়া বাবুজি মিলা?
বদরিকাবাবু বার-বার নিজের হাতটা শুকতে লাগলেন। যেন অবাক হয়েছেন একটু। বললেন—কী করে করলে বলো দেখি বাপধন?
—ইয়ে পাথষ্কা খেল হ্যায় বাবুজি, মহাদেওতানে দিয়া হুয়া হ্যায়।
—দেখি বাবা তোমার পাথরখানা—ছোট স্ফটিকখানা নিয়ে বার বার দেখতে লাগলেন বদবিকাবাবু। সামান্য এক টুকরো পাথরের কারসাজি! অবিশ্বাসের বিদ্রূপ ফুটে উঠলে ভাব-ভঙ্গীতে। ছোট ছেলে যেমন রসগোল্লা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে! মুর্শিদকুলী খা’র কানুনগো দর্পনারায়ণের শেষ বংশধরও সহজে বিচলিত হবার লোক নন। কত রাজা মহরাজাকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন তুড়ি দিয়ে। ইতিহাসের বিলুপ্তপ্রায় অধ্যায়ের এক টুকরো ফসিল যেন হাতে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে বসেছেন। বললেন—কী হয় এতে বাপধন?
গন্ধবাবা বললে—সব কুছ হো স্যাক্তা হ্যায় বাবুজি—মহাদেওকা কিরপা মে…
–অমর হওয়া যাবে?
—জী হাঁ, অমর ভি হোস্যাক্তা হ্যায়।
—তবে অমরই হয়ে যাই—বলে বলা-নেই, কওয়া-নেই বদরিকাবাবু পাথরটা নিয়ে টপ করে মুখে পুরে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে গন্ধবাবা চিৎকার করে উঠলো—সত্যনাশ হো গয়া, সত্যনাশ হো গয়া…
—আরে রাখ তোর সর্বনাশ, সর্বনাশের মাথায় বলে বদরিকাবাবু যেন কেমন নিশ্চিন্ত হবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু যেন কিছু অস্বস্তি বোধ করছেন। বললেন—লোচন এক গ্লাশ জল দে তো।
গন্ধবাবা বলেন—বাবুজী ম যাইয়ে গা।
কিছুক্ষণ পরেই মনে হলো যেন বদরিকাবাবুর দম আটকে আসছে। আইঢাই করতে লাগলো সারা শরীর। চোখ দুটো উল্টে এলো। গেলাশ গেলাশ জল খেলেন। মস্ত বড় ভুঁড়ি আরো ফুলে উঠলে দেখতে দেখতে। সাক্ষাৎ মহাদেবের দেওয়া স্ফটিক যে!
গন্ধবাবা চলে গেল এক ফাঁকে। যাবার সময় বলে গেল বাবুজী মহাবীর হ্যায়—লেকিন্ হরগীজ মর যায়গা।
মধুসূদন ভয় পেয়ে গেল—কী সর্বনেশে কাণ্ড!
লোচনও ভয়ে জায়গা ছেড়ে চলে গিয়েছে। কী জানি কী কাণ্ড বাধিয়ে বসবে। বদরিকাবাবু যদি মারাই যায়, সাক্ষীসাবুদ, পুলিশআদালত নানান হ্যাঙ্গাম পোয়াও। মেজবাবু যদি টের পায়, কানে যদি যায় কোনোরকমে। মেজবাবুর যা মেজাজ, জরিমানা হবে সকলের।
বদরিকাবাবু গাড়িবারান্দার তলায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে হাঁসাস করছেন।
বংশী বললে—চলে আসুন শালাবাবু ওখান থেকে—কাজ কী এসব হ্যাঙ্গামে।
হ্যাঙ্গাম দেখে সত্যিই তখন সবাই সরে পড়েছে একে একে। ভূতনাথ চেয়ে দেখলে জায়গটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে।
বংশী আবার কামিজটা ধরে টানলে চলে আসুন শালাবাবু, কাজ কি ছেড়া ঝঞ্চাটে—আমার আবার ওদিকে কাজ পড়ে রয়েছে।
ভূতনাথবাবু বললে—তুই বরং যা বংশী, ছোটবাবু জানতে পারলে আবার।
—তাই যাই—বলে বংশীও চলে গেল।
ভূতনাথ নিচু হয়ে বদরিকাবাবুর মাথায় হাত দিলে। মুর্শিদকুলী খাঁ’র কানুনগোর শেষ বংশধর। এখানে এই বেঘরেই বুঝি গেলএবার।
হঠাৎ যেন অস্পষ্ট শব্দ বেরোলো। বদরিকাবাবু কথা বলছেন— বেটা গিয়েছে নাকি হে ছোকরা?
ভূতনাথও কম অবাক হয়নি। বললে—কেমন আছেন?
চোখ মিট মিট করতে করতে বদরিকাবাবু বললেন—বেটা গিয়েছে নাকি হে ছোকরা?
—চলে গিয়েছে—কিন্তু আপনি কেমন আছেন?
বদরিকাবাবু এবার উঠে বসলেন। নিজের জামা-কাপড় সামলাতে সামলাতে বললেন—আমার হয়েছে কি যে কেমন থাকবে—বলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর নিজের বৈঠকখানার দিকে চলতে লাগলেন।
ভূতনাথও সঙ্গে সঙ্গে গেল। বদরিকাবাবু ঘরে ঢুকে শেতলপাটি বিছানো তক্তপোশের ওপর আবার চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়ে একবার টক ঘড়িটা বার করে সময় দেখে নিলেন।
ভূতনাথের যেন ভারি অবাক লাগছিল সমস্ত ঘটনাটা ভেবে। বললে—আপনি শুধু শুধু কেন খেতে গেলেন পাথরটা—সাধুসন্ন্যাসীদের পাথর।
—খেতে যাবো কেন,-“খাইনি তো-বদরিকাবাবু বিস্মিতের মতো চাইলেন। আমার আর কাজ-কম্ম নেই, আমি ওই পাথর গিলতে যাবো। বলে কি ছোকরা, ‘এই দেখো-বলে আর এক টাক থেকে স্ফটিক পাথরটা বার করলেন—এই দেখো।
—তাজ্জব ব্যাপারই বটে।
–নবাবের আমলের পুরোনো বংশ আমাদের হে, আমি সেই বংশের শেষ বংশধর বটে, তা আমি গলায় পাথর আটকে মরতে যাবো কেন শুনি? এতদিন ধরে ঘড়ি ধরে বসে আছি অপঘাতে মরবো বলে? সব দেখতে হবে না! ইতিহাস কি মিথ্যে হবে নাকি? সব লাল হয়ে যাবে না। রণজিৎ সিং তো মিথ্যে বলবার লোক নয়, নাজির আহমদ রইল না, রইল না রেজা খাঁ, বলে মধুমতীর তীরের সীতারাম আর ফৌজদার আবুতোরাব—তারাই রইল না! কোথায় গেল পীর খাঁ, কোথায় গেল তোর বক্স আলী-এক পুরুষের পর আর এক পুরুষ উঠেছে আবার নামছে—চৌধুরীরাও নামবে—এই বড়বাড়িও ভাঙবে একদিন, রাজসাপ যখন কামড়েছে, একেবারে ভিটেমাটি উচ্ছন্ন করবে না! এখনও যে দর্পনারায়ণের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া হয়নি রে।
কী কথায় কী কথা উঠে গেল।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু গন্ধবাবা কি দোষ করলো?
-আরে, এটা যে গন্ধবাবার যুগ রে, গন্ধবাবারাই তো আজ রাজা হয়ে বসেছে—ওদের তাড়াতে হবে না? এই আমাদের মেজবাবু, ছোটবাবু, তোর এই ‘মোহিনী-সিঁদুর’ সব যে গন্ধবাবার দল।
