বংশী সেদিন শশব্যস্ত হয়ে ডাকতে এসেছিল।—আসুন শালাবাবু, মজা দেখবেন আসুন, গন্ধবাবা এসেছে।
—গন্ধবাবা?
-আজ্ঞে হ্যাঁ, বারবাড়িতে লোক আর ধরছে না, গন্ধবাবা এসেছে, যে-যা গন্ধ চাইছে তাই-ই দিচ্ছে।
ভূতনাথও ছুটলো। গাড়িবারান্দার নিচে পৈঁঠের ওপর বসে আছে এক সাধু। মাথায় জটা। কপালে সিঁদুরের প্রলেপ। বিকটাকার মূর্তি। চার পাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছে চাকর-বাকর লোকলস্কর সবাই। দাসু জমাদারের ছেলেমেয়েরাও এসে দূরে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। ইব্রাহিমের ছাদের ওপরেও লোক।
অনেক কষ্টে বংশী ভূতনাথকে নিয়ে ভেতরে গিয়ে ঢুকলো ঠেলে ফুলে।
লম্বা চওড়া চেহারা লোকটার। বলছে—বেহেস্ত কা হুরী আউর জাহান্নম্ কা কুত্তি ইয়ে সব ঘায়েল হোতি হ্যায়–হামারা ইয়ে পাথ দেওতা মহাদেওতানে আপনা হাতসে দিয়া হুয়া হ্যায়— ই পাঙ্খ দেখো-গরীবোকো রূপিয়া দেনেওয়ালা, মোকমামে সিদ্ধি দেনেওয়ালা-মাঙনেওয়ালোকো সব কুছ দেনেওয়ালাই পাথ দেখো—দেওতাকে জরিমানা পাঁচ পাঁচ আনা।
মধুসূদন ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বললে গন্ধবাবা, আমাকে পদ্মফুলের গন্ধ করে দাও দিকি হাতে-দেখি একবার।
গন্ধবাবা পাথরটা দিয়ে মধুসূদনের হাতের তেলোয় ঘষে দিলে।
মধুসূদন হাতের তেলোটা শুঁকে দেখে। সত্যিই তো! খাঁটি পদ্ম ফুলের গন্ধ।
—দেখি মধুসূদন কাকা, দেখি শুঁকে।
—দেখি, আমি শুঁকে দেখি।
সবাই শুঁকে পরীক্ষা করে দেখে ভুল নেই। কোনো ভুল নেই। পদ্মফুলই বা কোত্থেকে এল।
—গন্ধবাবা, আমার হাতে কোরোসিন তেলের গন্ধ করে দাও তো দেখি?
গন্ধবাবা পাথরটা তার হাতে ঘষে দিলে আবার। যে-হাতে পদ্মফুলের গন্ধ ছিল সেই হাতেই এখন কেরোসিন তেলের কড়া গন্ধ।
দেখি, শুঁকে দেখি—ওমা, কেরোসিনের গন্ধই তো বটেক— সবাই ঝুঁকে পড়ে। গন্ধবাবা আবার বক্তৃতা দেয়—বেহেস্ত কা হুরী আউর জাহান্নম্ কা কুত্তি ইসসে সব কুছ ঘায়েল হোতি হ্যায়— হামারা, ইয়ে পাথ দেওতা মহাদেওতানে আপনা হাতসে দিয়া হুয়া হ্যায়ই পাঙ্খল দেখো—গরীবোকো রূপিয়া দেনেওয়ালা, মকমামে সিদ্দি দেনেওয়ালা, মাঙনেওয়ালোকো সব কুছ দেনেওয়াল—দেওতাকো জরিমানা পাঁচ পাঁচ আনা…
পাঁচ আনার পূজো দিতে হবে। মাত্র পাঁচ আনাতেই মনস্কামনা পূর্ণ হবে। এমন সুযোগ বোধহয় কেউ ছাড়তে চাইলে না। বংশী চুপি চুপি বললে—শালাবাবু, ভাইটার চাকরির জন্যে পাঁচ আনা জরিমানা দেবো নাকি?
মধুসূদনেরও বুঝি কিছু মনস্কামনা ছিল। দেশের একটা ধানজমির ওপর বহুদিনের লোভ ওর। নিজের জমির লাগোয়া। দরে পোষাচ্ছিলো না। সে-ও পাঁচ আনা দিলে জরিমানা। হুড় হুড় করে আরো পয়সা পড়তে লাগলো।
গন্ধবাবা তখনও বক্তৃতা দিয়ে চলেছে—সব ইয়ে পাথকা খেল, মহাদেও মহদেওকী খে, ইয়ে পাথ…দুনিয়ামে যো কুছ মানা হ্যায় তো মাঙ লেও, ইয়ে পাথকে দৌলতমে সব কুছ মিলনেওয়াল হ্যায়, বেহেস্তকা হুরী আউর জাহান্নমকা কুত্তি ইসে সব ঘায়েল হোতি হ্যায়, হামারা ইয়ে পাথ—গরীবোকো রূপিয়া দেনেওয়ালা, মকদমামে সিদ্ধি দেনেওয়ালা মাঙনেওয়ালোকো সব কুছ মিলনেওয়ালা দেখতে দেখতে পঞ্চাশ ষাট টাকার খুচরো পয়সা জমে উঠলো গন্ধবাবার সামনে।
হঠাৎ ভূতনাথেরও মনে হলো যেন তারও কিছু মনস্কামনা আছে। নিজের চাকরি নয়। সংসারে কারোর কিছু নয়। কিন্তু অন্তত ছোটবৌঠানের জন্যে যেন পাঁচ আনা জরিমানা দিলে হয়। যেন সুখী হয় ছোটবৌঠান। যেন স্বামীসেবা করতে পারে ছোটবৌঠান। যেন মনস্কামনা সিদ্ধি হয় ছোটবৌঠানের। যেন ‘মোহিনী-সি দুরে’ যে-কাজ হয়নি তা সফল হয়।
গন্ধবাবা জিজ্ঞেস করলে তুলসীপাতা হ্যায় ইধার?
—আছে বাবা, আছে, তুলসীপাতা আছে।
গন্ধবাবা সবার হাতে গাঁজার কল্কে থেকে নিয়ে একটু করে পোড় তামাক দিলে। সেই পোড়া তামাক হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে তুলসীগাছকে প্রণাম করে এসে আবার হাতের মুঠো খুলতে হবে।
বংশী, মধুসূদন, লোচন, বেণী, দাসু জমাদার, ইব্রাহিম কোচোয়ান, ইয়াসিন সহিস, ব্রিজ সিং সবাই মনস্কামনা নিয়ে মহাদেবকে পাঁচ আনা জরিমানা দিয়েছে। সবাই হুকুম মতো কাজ করলো।
গন্ধবাবা এবার সকলের মুঠোর ওপর তার স্ফটিক পাথরটা ছুঁইয়ে দিলে। মনে মনে কোনো মন্ত্র পড়লে কিনা কে জানে। তারপর বললে—আভি মুঠি খোলল।
বংশী ভূতনাথের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বংশীও মুঠো খুললো।
ভূতনাথ দেখলে তার মুঠোর মধ্যে পোড় তামাকের বদলে একটা নীল কাগজ। নীল কাগজের ওপর একটা ত্রিভুজ আঁকা। সেই ত্রিভুজের ভেতর আরেকটা ত্রিভুজ।
সকলের হাতের মুঠোর মধ্যে ওই একই ব্যাপার।
গন্ধবাবা বললে—মাদুলী করে ওটা গলায় পরতে হবে। একমাস পরে গন্ধবাবা আবার আসবে এ-বাড়িতে, তখন যদি না মনস্কামনা পূর্ণ হয় তত সকলের পয়সা ফেরৎ দিয়ে যাবে।
বংশী বললে—শালাবাবু, আপনিও একটা জরিমানা দিন না আজ্ঞে।
ভূতনাথও সেই কথা ভাবছিল।
গন্ধবাবা তখন টাকাপয়সাগুলো কুড়োচ্ছে আর মুখে বক্তৃতা বেহেস্ত, কা হুরী, আউর জাহান্নমকা কুত্তি ইসে সব ঘায়েল হোতি হ্যায়–ই পাখ-মহাদেওনে দিয়া হুয়া হ্যায়—গরীবোকো রূপে দেনেওয়ালা, মকদ্মামে সিদ্ধি দেনেওয়ালা মাঙনে
ওয়ালোকো সব কুছ…
হঠাৎ এক কাণ্ড ঘটে গেল।
বদরিকাবাবু বুঝি গোলমাল শুনে বেরিয়ে এসেছেন। বললেনকী হচ্ছে রে? এত গোলমাল কীসের?
মস্ত বড় ভুঁড়ি। গায়ে তুলোর জামা। বরাবর বৈঠকখানা ঘরে শুয়েই থাকেন। বড় একটা লোকচক্ষুর সামনে বেরোন না। এই আজকের অস্বাভাবিক গোলমালে আকৃষ্ট হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন প্রথম।
