-কখন?
–সন্ধ্যেবেলা।
বাড়ির চারদিকে রাজমিস্ত্রী খাটছে। ছুটুকবাবুর বিয়ের জন্যে তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে।
সেই লোচন আবার দেখতে পেয়ে ডাকলে একদিন।—আসুন শালাবাবু।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—এ-সব কী হচ্ছে লোচন?
এ-ঘরেরও অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। ঘর বোয়া মোছ। চলছে। হুঁকো নল ফরসি সব সাজিয়ে গুছিয়ে রাখছে লোচন। বললে—ছুটুকবাবুর বিয়ের তোড়জোড় হচ্ছে হুজুর। নতুন ফরসি এসেছে সব, নতুন তামাক এসেছে গয়া থেকে, খেয়ে দেখবেন নাকি?
ভূতনাথ বললে—না, এখনও খাইনে।
—বড় ভালো জিনিষ ছিল আজ্ঞে, ন’ সিকে ভরির জিনিষ, এখানে বসে খেলে এ-বৌবাজার অঞ্চলটা একেবারে খোশবায় হয়ে যাবে, মেজবাবু ফরমাশ দিয়ে আনিয়েছে হুজুর, ছোটবাবুর বিয়ের সময় একবার এসেছিল। খাস নবাবী মাল কিনা তা আধলা না-হয় নাই দিলেন, কে আর জানতে পারছে।
আতরের শিশি নিয়ে ঢেলে তামাক মাখতে বসলে লোচন।
তাড়াতাড়ি লোচনকে এড়িয়ে ভিস্তিখানায় জল নিয়ে স্নান সেরে নিলে ভূতনাথ। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে ভাবলে, একবার ব্রজরাখালের ঘরটায় গিয়ে দেখলে হয়। কোনো চিঠিপত্র এসেছে কিনা। কেমন ধারা লোক ব্ৰজরাখাল! একটা খবর পর্যন্ত দিলে না। কোথায় গেল! কেমন আছে সেখানে। কিন্তু ব্ৰজরাখালের ঘর তেমনি তালাবন্ধই পড়ে আছে।
পাশের ঘরে ব্রিজ সিং আটা মাখছিল। বললে-মাস্টার সাব তো নেহি হ্যায় শালাবাবু।
—কোথায় গিয়েছেন জানো ব্রিজ সিৎ?
—কেয়া মালুম বাবু, রোজ রোজ হামেশা দশ বিশঠো আদমি এসে পুছে—লেকিন মাস্টার সাব তো পাত্তা ভেজলো না।
দুপুরবেলাটাও কাটতে চায় না তার। সেই কর্কশ এক-একটা চিলের ডাক বাতাসে ভেসে আসে। এখানে বসে ফতেপুরের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে ‘কুয়োর ঘটি তোলা— আ—আ’ শব্দ করতে করতে যায়। কখনও যায় মুশকিল আসান। তখন অন্দরে বেশ গুলজার চলে। দরজাটার কাছে গিয়ে কান পাতলে বিচিত্র কথা শোনা যায়।
মেজবৌ প্রশ্ন করো বড়দি,, সিন্ধু যে তোমায় খাইয়ে দিচ্ছে বড়!
সত্যি সত্যি বড়বৌ-এর ঝি সিন্ধুই ভাত খাইয়ে দিচ্ছে আজ।
—ওমা একি! গিরিও এসে পাশে দাঁড়িয়ে গালে হাত দেয়।
শুচিবায়ুগ্রস্ত বড়বৌ-এর বিচিত্র কাণ্ড দেখে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছে।
সিন্ধু বলে—বড়মা’র দুটো হাতই অশুদ্ধ হয়ে গিয়েছে আজ।
মেজবৌ হাসতে হাসতে বলে—এরকম অশুদ্ধ হলে কী করে বড়দি?
বড়বৌ হাসেন না। বলেন—কাপড় শুকোবার দড়িতে হাত দিয়েছিলুম মরতে আর ওমনি পোড়ারমুখো একটা কাক কোত্থেকে এসে বসলো দড়িতে।
হাসি চাপতে পারে না গিরি।
মেজবৌ আবার জিজ্ঞেস করে-তা এমন অশুদ্ধ, ক’দ্দিন চলবে তোমার?
বড়বৌ বুঝি রাগ করেন। বলেন—হাসিস নে মেজবৌ, হাসতে নেই-হাসলে তোরও হবে।
মেজবৌ বলে—রক্ষে করো মা, আমার হয়ে কাজ নেই, সাত জন্মে অমন রোগ আমার যেন না হয়। আমার ভাতার আছে, আমার কেন হতে যাবে।
বড়বৌ মেজবৌকে কিছু বলেন না। বলেন সিন্ধুকে—শুনলি লো সিন্ধু, তবু যদি ওর ভাতার ঘরে শুতে।
মেজবৌ কিন্তু রাগে না কথা শুনে। খিল খিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ে। হাসির দমকে হাতের চুড়ি গায়ের গয়না টুংটাং করে বেজে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে—আর ভাসুর ঠাকুর কা’র ঘরে শুতে বলবো বড়দি—বলে দেবো?
কথা শুনতে শুনতে ভূতনাথের একবার কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করে। এত বড় বাড়ির বউ সব—এরা কী ভাষায় কথা বলে!
বড়বৌ একবার চিৎকার করে ডাকেন—ছোটও ছোট–ও ছোটবউ—ছুটি—
চিন্তা খর খর করে এগিয়ে আসে—ছোটমাকে ডাকছো নাকি বড়মা?
—ডাকতো একবার ছোটমাকে তোর—এসে কাণ্ড দেখে যাক।
—কী হলো বড়দি?
ছোটবৌঠান বুঝি এতক্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বলে–আবার বুঝি তুমি বড়দিকে কিছু বলেছে মেজদি।
—দেখো না ভাই—সারা দিনমান উনি ন্যাংটো হয়ে ঘোরাঘুরি করবেন, কিছু বললেই দোষ, আমরাও গা খুলে বেড়াই, কিন্তু পরনের কাপড়টা পর্যন্ত…
—ওর না হয় রোগ হয়েছে মেজদি, কিন্তু তোমাকেও তো দেখেছি, তুমিই বা কম যাও কিসে?
তুই আর বলিসনি ছোট, তোর আবার বড় বাড়াবাড়ি, কে আছে শুনি দশটা চোখ মেলে? অত জামা কাপড়ের বাহার কেন শুনি, ঘরের মানুষেরা তো ফিরেও চায় না!
ছোটবৌঠান কী জবাব দেবে বুঝি ভেবে পেলে না। তারপর বললে—তুমি কি সত্যিই চাও মেজদি যে, ঘরের মানুষ ঘরে থাকুক।
—তুই আর কথা বাড়াসনে ছোট, বড়ঘরের পুরুষমানুষেরা কবে আর ঘরে কাটিয়েছে শুনি, আমার বাপের বাড়িতেও দেখেছি, এ-বাড়িতেও দেখছি। তোর বাপের বাড়ির কথা অবিশ্যি আলাদা।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। নাপতিনী আসে আলতা পরাতে। মেজবৌ আলতা পরে, নখ চাঁছে, পায়ে ঝামা ঘষে। গল্প করে ইনিয়ে বিনিয়ে। সাদা-সাদা পা বাড়িয়ে দিয়ে মেজবৌ গল্প করে— হ্যাঁ রে রঙ্গ, কাল রাত্তিরে তোদের পাড়ায় শাঁখ বাজছিল কেন রে?
নাপিতবৌ বলে—ধোপাবৌ-এর ছেলে হয়েছে যে মেজমা শোননি?
—ওমা, এই সেদিন যে মেয়ে হলো রে একটা–বছর বিয়ুনি নাকি? খুব ভাগ্যি ভালো তো ধোপাবৌ-এর।
হঠাৎ তেতলার সিঁড়ি দিয়ে বংশী উঠে আসে। বলে— ছোটবাবু আসছে মা।
নাপতিনী সন্ত্রস্ত হয়ে এক মাথা ঘোমটা টেনে দেয়। মেজবৌ গায়ের কাপড়টা টেনে দেয়। গিরি লম্বা করে ঘোমটা টেনে আড়াল হয়ে দাঁড়ালো।
মেজবৌ বলে—ওমা, ছোট দেওর যে…কী ভাগ্যি?
ছোটবাবু তর তর করে উঠে আসে তেতলায়। বাতাসে একটা মৃদু গন্ধ। চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায় এক মুহূর্তে।
প্রতিদিন এই দৃশ্যেরই রকম-ফের অন্দরের বউ-মহলে। ভূতনাথের মনে হলো এত বড় বাড়ির বৌ সব—এরাও তত আর পাঁচ বাড়ির বৌদের মতনই সাধারণ। অতি সাধারণ। শুধু দূর থেকেই বুঝি একটা রহস্যের আবরণ থাকে। অন্দরমহলের ভেতরে যখন এই দৃশ্য, বাইরের মহলেও ওমনি সাধারণ ঘটনাই ঘটে সব।
