কিন্তু মেমসাহেব বুঝি সত্যি সত্যিই মরেনি। একটু জ্ঞান ছিল তখনও। সাহেবের বাড়ির চাকরবাকরদের টাকাপয়সা দিয়ে মুখবন্ধ করে ভূমিপতি সেই রাত্রেই নিজের পাল্কিতে করে তুলে নিয়ে এসেছিলেন মেমসাহেবকে। নিজের বাড়িতে একেবারে। এনে তুলেছিলেন এই চোরকুঠুরিতে। বাড়ির পুরোনো কবিরাজ এসেছিল। দেখে গেল। নাড়ি টিপে বললে—প্রাণ আছে এখনও—বাঁচবে এ রোগী।
সত্যি সত্যি মেমসাহেব বেঁচেও উঠলো একদিন। ঘা শুকিয়ে গেল হাতের। নতুন করে যেন নবজন্ম হলো মেমসাহেবের। নতুন ঘোড়ার গাড়ি কেনা হলো মেমসাহেবের জন্যে। মেমসাহেব ঘরের বৌ হয়ে গেল তারপর থেকে। পান খেতো, তামাক খেতে, শুক্ত, চচ্চড়ি, কুলের অম্বল খেতে। কিন্তু তবু বাড়ির মেয়েরা ছুতো না কেউ তাকে। বলতেও গরু খেয়েছে, ও মেলেচ্ছে–ওর জল চল্ নয় বাছা হিদুর বাড়িতে।
মেমসাহেব ওই ঘরে থাকতো আর এক আয়া ছিল তার কাজ করবার জন্যে।
সারা বাড়ির মধ্যে তাকে ছুঁতেন শুধু ভূমিপতি। বাড়ির মালিক। তা-ও রাত্রে। দেওয়ানি কাজের ঝঞ্চাট এড়িয়ে যখন রাত্রে চোখে তার লাল-নেশা ধরতো। ছেলে—একমাত্র ছেলে—সূর্যমণি চৌধুরী তখন রীতিমতো সাবালক হয়েছে। ওদিকে মেমসাহেবেরও ছেলে হয়েছে একটি। এমন সময় ভূমিপতি মারা গেলেন হঠাৎ। ধুমধাম করে শ্রাদ্ধ হলো জবর। কিন্তু মেমসাহেব তারপর আর এ-বাড়িতে থাকতে চাইলে না। নিজের আর ছেলের আজীবনের ভরণপোষণের মতো নগদ টাকা নিয়ে চলে গেল স্বদেশে। ভূমিপতি তার উইলে সে-ব্যবস্থা করে যেতে ভোলেননি নাকি!
বড়বাড়ির চারপুরুষ আগের ইতিহাস এ-সব। বাড়ির চাকর থেকে আরম্ভ করে নায়েব গোমস্তা, বদরিকাবাবু সবাই এ-ইতিহাস জানে। তার চাক্ষুষ সাক্ষী আজকের এই চোরকুঠুরির লাগোয়া এই এক ফালি বারান্দা।
রোজ সকালে জানালাটা দিয়ে দেখা যায়—সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের মাঝখানের সময়টা কেমন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় দিনের পর দিন। ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে আসে সমস্ত মন। কেবল ওষুধ আর পথ্য। বিশ্রাম আর ঘুম। একঘেয়ে ক্লান্তিকর দিনগুলো যেন আর কাটতে চায় না ভূতনাথের!
কিন্তু ভূতনাথের সেদিন যে কী খেয়াল হলো। উত্তরদিকের দরজাটা খোলা যায় কিনা দেখতে ইচ্ছে হলো একবার! এই দরজা দিয়েই অন্দরমহল পেরিয়ে রাত্রে আসতেন বুঝি ভূমিপতি মেমসাহেবের ঘরে!
একটি দরজা শুধু। কিন্তু ভূতনাথ জানতে কি অন্দরমহলের এত ঘনিষ্ঠ এই একটি মাত্র দরজা তাকে ছোটবৌঠানের এত কাছাকাছি পৌঁছিয়ে দেবে।
কেন যে এ-ঘরে তার থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল কে জানে! হয় তো এ-ঘরটা একটু নিরিবিলি বলে। চাকর-দারোয়ান-গাড়িঘোড়া, রান্নাবাড়ি, সমস্ত গোলমাল হট্টগোল থেকে দূরে থাকলে রোগীর পক্ষে সেটা ভালোই। কিন্তু দরজাটা খুলতে গিয়ে যেন রোমাঞ্চ হলো সারা শরীরে। এ যেন নিষিদ্ধ দরজা। তার এলাকার বাইরে সে যাচ্ছে। অধিকার-বোধের চৌকাঠ পেরিয়ে তার নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করছে।
ওপার থেকে যেন সিন্ধুর গলা শোনা গেল–ও লো ও গিরিওখান থেকে সরে যা তো।
গিরি বললে-থাম বাছা, সবুর কর একটু-হাতের কাজটা গুছিয়ে নি।
সিন্ধুও ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে—তোর হাতের কাজটাই বড় হলে লা, ওদিকে বড়মা সাজাঘরে যাবে, তোর জন্যে বসে থাকবে নাকি। সর শীগগির, চোখের আড়াল হ’।
মেজবউ-এর গলা কানে আসে। খিল খিল করে হাসতে হাসতে বলে-ও গিরি তোর সুপুরি কাটা রাখ বাপু–শুনছিস বড়দি সাজাঘরে যাবে।
গিরি গজ গজ করতে করতে বলে—আমি তো আর পুরুষ। মানুষ নই মা যে আমাকে না। সাতজন্মে যেন ছুচিবাই না হয় মানষের—-ছিঃ।
ভেতর থেকে হুড়কো সরাতেই দরজাটা একটু ফাঁক হলো। ভূতনাথ স্পষ্ট দেখতে পেলে সব। বিকেলের ছায়া-ছায়া আলো চারদিকে। একেবারে মাথার ওপরেই অন্দরমহলের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সে।
সিন্ধু চিৎকার করে উঠলো—তোর কাপড়টা সরিয়ে নিলিনে গিরি, বড়মা’র ছোঁয়া লেগে যাবে যে, ছুঁয়ে শেষে কি নোংরা হবে নাকি মানুষ।
—হলো, এই নিলাম সরিয়ে—হলো? বলে গিরি দড়ির ওপর থেকে কাপড়খানা সরিয়ে নিলে।
আর চোখের সামনে…আর ভূতনাথের চোখের সামনে এক কাণ্ড ঘটে গেল সেই মুহূর্তে!
বোধহয় এ-বাড়ির বড়বউ। বিধবা বড়বউ। সম্পূর্ণ নিরাবরণ নিরাভরণ অবস্থা। ত্বরিত গতিতে নিজের শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঢুকলেন গিয়ে সাজঘরে। পেছন পেছন চললো সিন্ধু গামছা সাবান নিয়ে।
কাণ্ডটা ঘটলো এক নিমেষের মধ্যে। কিন্তু সমস্তটা দেখবার আগেই ভূতনাথ নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে! ছি-ছি! ছি!!
» ২০. সেদিন ছোটবৌঠান ডেকে পাঠালেন
সেদিন ছোটবৌঠান ডেকে পাঠালেন।
বংশী বললে—অত ঘুরে যাবার দরকার কী শালাবাবু—এই তো সামনেই দরজা।
কী জানি কেমন যেন সঙ্কোচ হলো ভূতনাথের। সেদিন দরজার ফাঁক দিয়ে অন্দরমহলের যে নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখেছে তারপর ওটা খুলতে আর সাহস হয়নি তার। এ ক’দিন একটু একটু বাগানে গিয়ে বেড়িয়েছে। পুকুরের পাড়ে গিয়ে হাওয়া খেয়েছে।
ছুটুকবাবু দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল—কী খবর ভূতনাথবাবু, দেখাই পাওয়া যায় না যে আপনার। সেদিন ওস্তাদ ছোট্ট, খ এসেছিল, আহা, পুরিয়ার খেয়াল যা শোনালে ভাই-কানা বাদল খাঁ’র পরে অমন পুরিয়া আর শুনিনি মাইরি।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—আজকে আসর বসবে নাকি?
—আর আসর—আসরই বোধহয় ভেঙে দিতে হবে। এখন যাত্রা-থিয়েটারের গানেরই আদর বেশি দেখছি—ওস্তাদী গানের আর কদর কই—তেমন ওস্তাদও আর জন্মাচ্ছে না—তা আসুন আজকে আপনি।
