ছোটবাবু রেগেই ছিলেন। বললেন—না গিয়ে তোমার আঁচল। ধরে বসে থাকবে, কেমন?
ছোটমা কিছু কথা বললেন না। ছোটবাবু বলতে লাগলেন বড়বাড়ির পুরুষমানুষদের তুমি তেমনি অপদার্থ ভাবব নাকি?
—কিন্তু তুমি তো মানুষ—তোমারও তো মনুষ্যত্ব…
ছোটবাবু এ-কথার আর জবাব দিলেন না আজ্ঞে, শুধু যেতে যেতে হেসে বললেন—বউ-এর কাছ থেকে যে মনুষ্যত্ব শেখে তার গলায় দড়ি ছোটবউ!
বংশী গল্প বলতে পারে বেশ। ভূতনাথ একমনে শুনছিল। কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। ছোটবৌঠানের এতটুকু যদি উপকারে আসতে পারা যেতো। হঠাৎ ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে আচ্ছা বংশী তোর ছোটমা সিঁদুর পরে কপালে?
—আজ্ঞে পরেন বৈকি, এতখানি জ্বলজ্বলে টিপ রোজ পরেন।
—তোর ছোটমা’কে বারণ করে দিস ও-সিঁদুর পরতে।
–কেন আজ্ঞে?
—তুই বারণ করে দিস, ও-সব বুজরুকি—আগে জানলে…বলেই ভূতনাথ ‘সতর্ক হয়ে গেল। বংশীর সঙ্গে অত কথা বলবার দরকার কী! আগে যদি সে জানতো তা হলে অমন করে ঠকাতো না ছোটবৌঠানকে। মিছিমিছি গোটাকতক টাকা নষ্ট হলো। হঠাৎ যেন রাগ হলে সুবিনয়বাবুর ওপর। রাগ হলো জবার ওপর। ওরা সব পারে। যাদের জাত নেই, তারা আবার ভগবানের কথা মুখে আনে! সব মিথ্যে কথা ওদের। ও-বাড়ির চাকরিটা যদি চলেও যায়, কোনো দুঃখ থাকবে না তার। আর একটা নতুন চাকরি যোগাড় করে নিতে হবে। শরীরটা একটু ভালো হলেই ঘুরবে চাকরির চেষ্টায়। ওই যুবক সঙ্ঘে’র নিবারণকে বলে একটা যা হয় কিছু চাকরি নেবে। ওরা কলতাতার লোক। জানে শোনে সব। ব্রজরাখাল যদি ফিরে আসে তাকেও ধরতে হবে। এন্ট্রান্স পাশ করেছে সে, চাকরির জন্য এত ভাবনা! ডালহাউসি স্কোয়ারের ওদিকটায় জাহাজ কোম্পানীর সব আপিস হয়েছে কয়েকটা। ওখানে ঘোরাঘুরি করতে হবে। ঘোরাঘুরি না করলে কে এসে সেধে চাকরি তুলে দেবে তার হাতে। নতুন রেল-লাইন খুলছে পুরীর দিকে, সেখানেও একবার চেষ্টা করতে হবে। রেলের চাকরি ভালো। ঢুকেই পনেরো টাকা মাইনে।
১৯. বিকেলবেলার দিকে ভূতনাথ
বিকেলবেলার দিকে ভূতনাথ বিছানা ছেড়ে ওঠে। একলা একলা শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না। মাসের পর মাস এই শুয়ে থাকা। আরো কত মাস শুয়ে থাকতে হবে কে জানে। প্রায় এক বছর হতে চললল তো। ঘরের বাইরেই একটা সরু চলাচলের পথ। লোক আসা যাওয়া করে না বড় একটা। দক্ষিণ দিকে গেলে রাস্তাটা সোজা নেমে গিয়েছে সিঁড়ি দিয়ে। তারপর বাগান, পুকুর, ধোপাদের বাড়ি, হীরু মেথরের ঘর। আর উত্তর বরাবর চলে গিয়েছে আর একটা পথ সোজা। সে পথটা গিয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে একটা দরজার সামনে। দরজাটা বন্ধই থাকে। খিল দেওয়া। ওর ও-পাশেই বুঝি বাড়ির বউদের কথাবার্তা শোনা যায়।
বোঝা যায় এ-জায়গাটা না-দোতলা, না-তেতলা, না-বারমহল, না-অন্দরমহল। কবে এ-বাড়ির খোদ মালিক অতীতে এইখানে এই চোরকুইরির মধ্যে তার কোন নৈশ-অভিযানের খোরাক এনে পুষে রেখে দিয়েছিলেন। রোজ রাত্রে বুঝি গোপনে সকলের দৃষ্টির আড়ালে চলতো তার অভিসার। আজো ভাঙা দেয়ালের গায়ে তাঁর স্মৃতি তাই জড়িয়ে আছে বুঝি।
বৈদূর্যমণি, হিরণ্যমণি আর কৌস্তুভমণিরা তখন ছোট তিন নাতি। নিমকমহলের বেনিয়ান হয়ে খোদ কর্তা ভূমিপতি চৌধুরী এখানে বাড়ি করেন। ইটালিয়ান সাহেব এসেছিল নতুন বাড়ির দেয়ালে-দেয়ালে ছবি আঁকতে। বর্ধমানের সুখচর মহকুমা থেকে তখন নতুন এসেছেন জমিদারবাবু। পাশের বস্তীতে কুলিরা থাকে— আর সারা দিন খাটে বাড়ির পেছনে। ইটালিয়ান সাহেব থাকে হেস্টিংস হাউসের কাছে খাড়ির ধারের বাগান বাড়িতে।
একদিন সন্ধ্যাবেলা কাজ সেরে বাড়িতে ফিরে গিয়ে সাহেব দেখে—মেমসাহেব একলা নয়, সামনে বসে কাছে ঘেঁষে গল্প করছেন ভূমিপতি চৌধুরী।
সাহেবের মেজাজ গেল বিগড়ে। কয়েকদিন থেকেই সন্দেহ হচ্ছিলো সাহেবের। মেমসাহেব যেন একটু বেশি সাজে, গুন্ গুন করে গান গায়। একটু অন্যমনস্ক ভাব। আজ হাতে হাতে ধরা পড়ে গেল দুজনেই।
মেমসাহেব সাহেবকে দেখেই চমকে উঠেছে। ভূমিপতি চৌধুরীও কম চমকাননি। এমন দিনে সাধারণতঃ সাহেব বাড়ি ফেরে না। বাড়ি ফেরবার কথা নয় আজকে।
দুজনের ভাব লক্ষ্য করে সাহেব আর থাকতে পারলো না। কোমর থেকে পিস্তলটা বার করে দুজনকে লক্ষ্য করেই গুলী ছুড়লো। ভূমিপতি বেঁচে গেলেন একটুর জন্যে, কিন্তু অব্যর্থ গুলী গিয়ে লাগলো মেমসাহেবের গায়ে। মেমসাহেব ঢলে পড়লো মাটিতে।
ভূমিপতি তখন সামলে নিয়েছেন নিজেকে। একমুহূর্তে উঠে খপ করে হাত ধরে ফেলেছেন সাহেবের।
ভয়ে সাহেবেরও বুঝি মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। বললে—লেট মি গো বাবুলেট মি গো-আমাকে ছেড়ে দাও।
কিন্তু ভূমিপতির বজ্রমুষ্টির চাপে বুঝি পালাতে পারেনি শেষ পর্যন্ত। ক্ষমা চেয়ে সাহেব তো ছাড়া পেল। কিন্তু পিস্তল কেড়ে নিলেন ভূমিপতি। বললেন—তুমি খুন করেছে তোমার বউকে, তোমাকে পুলিশে দেবো।
হাজার হাজার মাইল দূর থেকে শিল্পী এসেছিল জীবিকার জন্যে জলামাটির দেশে। রাস্তায় মেমসাহেবের সঙ্গে পরিচয় হয়ে জাহাজেই তাদের নাকি বিয়ে হয়ে যায়। তারপর ভাগ্যের ফেরে আজ এই অবস্থা। সাহেব খানিক পরে বললে—ফরগিভ মি বাবু, আমি কাউকে কিছু বলবো না। আমায় শান্তিতে দেশে ফিরে যেতে দাও। আমি আর কখনও তোমাদের দেশে আসবে না।
ভূমিপতি বিশ্বাস করে ছেড়ে দিলেন সাহেবকে। সেই রাত্রেই সাহেব কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। আর দেখা যায়নি তাকে। যে লোক এসেছিল এদেশে ছবি আঁকতে, কী ছবি সে একে নিয়ে গেল নিজের চিত্তপটে কে জানে!
